ads

পুরনো বইয়ের সন্ধানে

আরাফাত শাহীন

ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার অভ্যাস। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নানা ধরনের সৃজনশীল বই পড়ার অভ্যাসটি অত্যন্ত যতেœর সাথে লালন করে এসেছি। বাড়িতে থাকাকালে বড়ভাইদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে পড়তাম। পড়া শেষে আবার বইটি ফেরত দিয়ে আসতে হতো। মাঝে মধ্যে দু-একটি বই যে কিনে পড়তাম না তা নয়। প্রতি মাসেই খরচের টাকা থেকে বেঁচে যাওয়া টাকা দিয়ে কিছু বই ঠিকই কিনে ফেলতাম। পঠিত বইটি নিজের কাছে রাখতে না পারলে আর সার্থকতা কোথায়!
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করার পর বই পড়ার ক্ষুধা আগের চেয়ে বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সে জন্য প্রথম দিকে এসেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সাথে সংযুক্ত হয়েছিলাম। সেখান থেকে প্রতি সপ্তাহে বই নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে। কিন্তু পঠিত বইটি পরের সপ্তাহে আবার ফেরত দিয়ে দিতে হতো। বইটি নিজের কাছে রাখার কোনো উপায় যে নেই! তা ছাড়া সপ্তাহে একটি বই পড়ে কেমন যেন পোষাতো না। আরো বেশি পড়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়তাম।
বাড়িতে থাকাকালে প্রতি মাসেই কিছু বই কেনা হতো। এখানে এসেও বই কেনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকি। কিন্তু বাড়িতে থাকাকালে যে কাজটি অনেক সহজে করতে পারতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই কাজটিই বড় কঠিন হয়ে দাঁড়াল। আমাকে বাড়ি থেকে যে টাকা পাঠানো হয় মাস শেষে তার থেকে খুব বেশি টাকা জমানো সম্ভব হয় না। তার পরও কিছু টাকা অবশ্যই জমিয়ে রাখতে সক্ষম হই। এই টাকা দিয়ে বাজার থেকে বেশ কিছু বই কিনেছিও। কিন্তু কেমন যেন শান্তি পাচ্ছিলাম না। নতুন বইয়ের দাম একটু বেশি কি না! চিন্তা করলাম, এই টাকা দিয়ে যদি পুরনো বই কিনতে পারি তাহলে অনেকগুলো বই কেনা সম্ভব হবে। খুলনায় থাকাকালে এভাবে অনেক পুরনো বই কিনেছি। কিন্তু রাজশাহীতে আমি পুরনো বই কোথায় পাবো? কে আমাকে পুরনো বইয়ের সন্ধান দেবে?
মনের কষ্টের কথাটি একদিন খুব কাছের একজন বন্ধুর কাছে বললাম। বন্ধু আমার কথা শুনে অবাক। প্রশ্ন করল, তুই পুরনো বই কোথাও খুঁজে পাচ্ছিস না?
বন্ধুর পাল্টা প্রশ্ন শুনে আমি বেশ সঙ্কোচের সাথে বললাম, না তো! তুই কোনো খোঁজ জানিস নাকি?
বন্ধু হাসতে হাসতে বলল, আরে গাধা আমাদের ক্যাম্পাসেই তো পুরনো বই কিনতে পাওয়া যায়!
বন্ধুর কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করলাম সে আমার সাথে মজা করছে কি না। ক্যাম্পাসে পুরনো বই বিক্রি হয় অথচ আমার চোখে পড়ল না কেন?
ক্যাম্পাসটা তখন খুব বেশি চেনা-পরিচিত হয়নি। ৭৫৩ একর জায়গার বিশাল এ ক্যাম্পাসের কোথায় কী হয় তার সবটা জানা মুশকিল। সুতরাং নিজেকে খুব একটা দোষী ভাবার সুযোগ নেই। আর ক্যাম্পাসে তখন আমি নতুন। সব খোঁজখবর জানা সম্ভবও নয়। বন্ধুকে নিয়ে পুরনো বইয়ের সন্ধানে তখনই বেরিয়ে পড়লাম। যত তাড়াতাড়ি গিয়ে পৌঁছানো যায় ততই মঙ্গল। আমার আগে এসে যদি কেউ প্রিয় বইগুলোর দখল নিয়ে নেয়!
বন্ধু আমাকে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সামনে নিয়ে এলো। সামনে তাকিয়ে দেখি, বেশ বয়সী একজন লোক পুরনো বইয়ের বেশ বড়সড় এক ভাণ্ডার নিয়ে বসে আছেন। ক্রেতার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আমি এই পথ দিয়ে এর আগে বহুবার যাতায়াত করেছি অথচ বিষয়টা কিভাবে যেন আমার নজর এড়িয়ে গিয়েছে। হয়তো খোঁজার প্রয়োজন মনে করিনি বলে।
হরেক রকমের পুরাতন বইয়ের বান্ডিল নিয়ে লোকটি বসে আছেন। ক্রেতাদের সাথে দর কষাকষিও করছেন। চাকরির বই থেকে শুরু করে সাহিত্যÑ এমনকি ধর্মীয় বইপুস্তকও চাচার ভাণ্ডারে রয়েছে। আমি তখনই বেশ কিছু সাহিত্যের বই বগলদাবা করলাম। এগুলো আমাকে নিতেই হবে। পরে এসে যদি আর না পাই! বইগুলো বেশ সস্তায়ই কিনলাম। নতুন বই কিনতে গেলে যা খরচ হত তার চেয়ে যদি তিন ভাগের এক ভাগ দামে পাওয়া যায় তাতে মন্দ কী!
সে দিন থেকে পুরনো বই বিক্রির দোকানো আমার নিয়মিত যাতায়াত শুরু হয়। বইগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে দেখি। যেগুলো পছন্দ হয় তখনই নিয়ে নিই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরাতন বই বিক্রির দোকান আরো কয়েকটি আছে। পরে ধীরে ধীরে সেগুলোও খুঁজে বের করেছি। রাজশাহী শহরেও বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। মাঝে মধ্যেই আমি সেখানে গিয়ে ঢুঁ মেরে আসি। পুরনো বই দামাদামি করে কেনার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। আমি সেই আনন্দটা উপভোগ করতে বড্ড ভালোবাসি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.