ads

আবদুল হাকিম স্যার

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

জীবনে এমন কিছু মানুষ সান্নিধ্যে আসেন, যাদের অমোঘ উপস্থিতি আমাদের প্রত্যেকের জীবনে সুদূরপ্রসারী ছাপ ফেলে যায়। কোনো-না-কোনোভাবে একটি সুন্দর ও স্বপ্নিল জীবন বিনির্মাণে তারা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকেন। এমনকি সত্য ও ন্যায়নিষ্ঠ আলোর পথে এগিয়ে যেতে সেসব মানুষ দক্ষ অভিযাত্রীর মতো অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুঠো মুঠো সর্বস্তরে বিলি করে যান আদর্শিক জ্ঞানের আলো। সমাজ ও জনপদ থেকে যাবতীয় অন্ধকার দূর করে আলোর রোশনাই দিয়ে সর্বত্র বিকশিত করে তোলেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় আবদুল হাকিম বিএসসি স্যার তাদের অন্যতম একজন। সৌভাগ্যবশত সেই নব্বইয়ের দশকের পুরোটা সময় তাকে আমরা খুব কাছে থেকে পেয়েছি। তাকে ঘিরে রয়েছে আমাদের জীবনের হাসি-আনন্দমাখা অনেক সুখময় স্মৃতিÑ যা স্মৃতির ক্যানভাসে বারবার ভেসে উঠে চোখকে একপশলা বৃষ্টির মতো ভিজে দিয়ে যায়। এই তো বছর দুয়েক আগের কথাÑ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত আমার একটি আর্টিকেল পড়ে স্যার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। জরুরি তলব পড়ে স্যারের সাথে দেখা করার। সাগ্রহে জানতে চান, লেখালেখি কবে থেকে? সেদিন অনেক কথাই স্যারকে বলেছিলাম। নবম-দশম শ্রেণীতে স্যার আমাদের জীববিজ্ঞান পড়াতেন। মানবদেহের জটিল ও কঠিন বিষয়গুলো খুব সহজে বুঝিয়ে দিতেন। ফলে নিমেষে আলোচ্য বিষয়টির প্রতি আমাদের যাবতীয় ভয়শঙ্কা কেটে যেত। স্যারের বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা ও হাস্যরসে কখন যে সময় কেটে যেত, টেরই পেতাম না। ফলে স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি বেড়ে যেত দ্বিগুণ হারে। পাশাপাশি বিজ্ঞানের বাইরেও জাগতিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রাঞ্জল আলোচনায় অনেক অজানা গুরুত্বপূর্ণ দিক জানতে পারতাম। পাঠদানের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে নির্মল হাসি, আনন্দ ও মিষ্টি দুষ্টুমিতে মেতে উঠতেন। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা শুধু নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে কিংবা স্বার্থান্ধে অন্যকে কাঁদাতে পারে। ভুলে যেতে পারে অতীতের সব কিছু। পাশাপাশি কিছু মানুষ এমনও রয়েছেন যারা নিজেরা কেঁদেও অন্যকে সুখী করার সদা চেষ্টা চালিয়ে যান। শ্রদ্ধেয় আবদুল হাকিম বিএসসি স্যার তেমনি একজন মানুষ। কিন্তু যখন দেখা যায়, স্যারের সাহচর্যে থেকেও কেউ কেউ নিজেদের সামান্যতম শোধরাতে পারেনি, তাদের জন্য করুণার পাশাপাশি দুঃখও হয়। অথচ প্রিয় মানুষটি নিজের দুঃখ-কষ্টকে চিরকালই আড়াল রেখে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আনন্দমুখর আবহে হাসিমুখে কথা বলে গেছেন। শুধু তা-ই নয়, অনেক গরিব-অভাবী ছাত্র-ছাত্রীর সাহায্যার্থে তাদের পাশে স্যারকে দাঁড়াতে দেখা গেছে। যাদের অনেকেই আজ জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। জীবন চলার পথে কোনো সমালোচনা, দুঃখ-কষ্ট কিংবা গ্লানি কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। নিজের কাজে ও কর্মে সদা-সর্বক্ষণ অবিচল ও পাহাড়ের মতো অটল থেকেছেন। হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন সব কিছু। তার মুখেই শুনেছি জীবনের অনেক অজানা অধ্যায়ের কথা। কোনো এক দিন এক প্রশ্নের জবাবে উঠে এসেছে, শৈশবের স্মৃতিময় সরস আলোচনা ও কথা।
শৈশব থেকেই পড়ালেখায় ছিলেন অসম্ভব মেধাবী। কোনো বিষয় একবার পড়লে দ্বিতীয়বার পড়ার প্রয়োজন হতো না। তার পিতা আদর করে নাম রাখেন আবদুল হাকিম। পেশাগত জীবনে তিনি যদিও একজন আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ পিতাও বটে। তার ছোট সন্তান অনেক আগেই মারা গেছে। বর্তমানে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলার সময়, স্যারের বড় ছেলে শাহাদাত হোসেন (বাবু) বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন পাহাড়ের মতো দৃঢ় ও অবিচল। সৎ ও আদর্শবান। আমার সাথে সম্পর্ক ছিল বরাবরই একজন নিরেট বন্ধুর মতো। তিনি আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষও।’
আবদুল হাকিম বিএসসি একজন আলোর ফেরিওয়ালা। একজন স্বপ্নবাজ অভিযাত্রী। ১৯৫৩ সালের ১ এপ্রিলের এক আলো ঝলমল প্রত্যুষে লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের মোস্তফাপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা কুর্মিটোলা বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতার অধ্যায় শুরু হলেও জীবনের ৩০-৩৫টি বছর নিয়মনিষ্ঠ ও অধ্যবসায়ের সাথে শিক্ষকতা করে গেছেন আমাদের প্রাণপ্রিয় বিদ্যাপীঠ ঐতিহ্যবাহী ছোট শরীফপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে। এখানে তিনি জীবনের শেষতক পর্যন্ত নিরলসভাবে শিক্ষকতা করে গেছেন।

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.