ads

সহিংসতা ও শান্তির পক্ষে পরস্পরবিরোধী কণ্ঠস্বর

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা
রিফাত হাসান

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় দু’টি পরস্পরবিরোধী বার্তা দারুণভাবে সবার নজর কেড়েছে। এর একটি হচ্ছে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সহিংসতার পক্ষে বা মুসলিমবিরোধী উসকানিমূলক কথাবার্তা। আর অন্যটি হচ্ছে সহিংসতায় নিজের কিশোর সন্তান হারানোর পরও স্থানীয় মসজিদের একজন ইমামের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান।
হিন্দুদের দেবতা রামের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠান রামনবমীতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হিন্দুরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিছিল করে থাকে। এসব মিছিল হয় সশস্ত্র। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ভারতে ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ঘটেছে। রামনবমীর সশস্ত্র মিছিল তারই অংশ।
এবারো পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রামনবমীতে হিন্দুরা খোলা তলোয়ার ও অন্যান্য অস্ত্র হাতে মিছিল করেছে। এসব মিছিল থেকে মুসলিমবিরোধী উসকানিমূলক সেøাগান দেয়। এ থেকেই শুরু হয় সঙ্ঘাত। পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল ও রানীনগরে মার্চের শেষ সপ্তাহে রামনবমীর এই মিছিল চলাকালেই হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় নরেন্দ্র মোদি সরকারের ভারী শিল্পবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও আসানসোল থেকে নির্বাচিত বিজেপির এমপি বাবুল সুপ্রিয় তার টুইটার অ্যাকাউন্টে এমন সব মন্তব্য করেন, যা হিন্দুদের আরো উসকে দেয়। এতে মুসলমানদের ওপর হামলার ঘটনা আরো বেড়ে যায়। এতে পাঁচজন নিহত হন। নিহতদের একজন হলো আসানসোলের চেতলাভাঙ্গা নদীপার এলাকার নূরানি মসজিদের ইমাম মাওলানা ইমদাদুল্লাহ রশিদির ১৬ বছরের ছেলে সিবতুল্লাহ রশিদি। তার এবার দশম শ্রেণীতে বোর্ড পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল।
গত ২৭ মার্চ মঙ্গলবার যখন বাড়ির পাশ দিয়ে হিন্দুদের রামনবমীর মিছিল যাচ্ছিল, তখন কৌতূহলবশত মিছিলটি দেখতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে সিবতুল্লাহ। এরপর থেকেই তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বুধবার গভীর রাতে ইমামের বাড়িতে খবর আসে, স্থানীয় হাসপাতালে একটি লাশ পড়ে আছে। ইমাম গিয়ে ছেলের ক্ষতবিক্ষত লাশ শনাক্ত করেন। দেখতে পান, তার ছেলেকে খুবই কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নখগুলো তুলে ফেলা হয়েছে। ঘাড় ও শরীরে শুধু কোপের চিহ্ন। লাশটি পুড়িয়ে ফেলারও চেষ্টা করা হয়েছিল।
লাশ এনে জানাজা পড়ার সময় স্থানীয় মুসলমানেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা এই ছোট্ট ছেলেটিকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের অঙ্গীকার করেন। কিন্তু এতে বাধা দেন ইমাম। তিনি উপস্থিত লোকজনকে বলেন, আমি আমার সন্তান হারিয়েছি। কিন্তু আমি চাই না আর কোনো পরিবার তার প্রিয়জনকে হারাক। আমি শান্তি চাই। আর কোনো সঙ্ঘাত, হানাহানি, অগ্নিসংযোগ আমি দেখতে চাই না। আমি ৩০ বছর ধরে এখানে ইমামতি করছি। আপনারা যদি আমাকে ভালোবাসেন, তাহলে কেউ আর একটা আঙুলও কারো দিকে তুলবেন না। আপনারা আমার কথা না শুনলে আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাবো। এর পরই লোকজন শান্ত হয়ে যান।
শুধু এটুকু বলেই থেমে থাকেননি ইমাম রশিদি। তিনি একটি হ্যান্ডমাইক নিয়ে মহল্লার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তার এই কাজ দেখে এলাকার হিন্দু-মুসলিম সবাই শান্তির পথে চলে আসেন। ফলে পুরো এলাকায়ই উত্তেজনা থেমে যায়।
অন্য দিকে বিপরীত চিত্রই তুলে ধরেছেন নরেন্দ্র মোদি সরকারের মন্ত্রী ও আসানসোলের এমপি বাবুল সুপ্রিয়। সহিংসতা শুরুর পর থেকেই তিনি তার টুইটার অ্যাকাউন্টে বারবার হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি তিনি চামড়া তুলে ফেলারও হুমকি দিয়েছেন যা মুসলমানদের লক্ষ করেই দেয়া হয়েছে বলে অনেকেই অভিযোগ করেছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাবুল সুপ্রিয় অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সহিংসতা শুরুর পর তিনি তার নির্বাচনী এলাকা আসানসোলে গিয়েছিলেন ভুক্তভোগীদের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু স্থানীয় পুলিশ তাকে বাধা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘কিছু দুর্বৃত্ত’ তার বিরুদ্ধে সেøাগান দিয়েছে। তিনি ওই ‘দুর্বৃত্তদের’ চামড়া তোলার কথা বলেছেন। কারণ তৃণমূলের ওই ‘দুর্বৃত্তরা’ এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের ধরার পরিবর্তে আমাকে দুর্গত এলাকায় যেতে বাধা দেয়। রাজ্যের তৃণমূল সরকারের ইঙ্গিতেই পুলিশ এসব করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন এই বিজেপি নেতা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছেÑ তার উসকানিমূলক নানা বক্তব্য যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা যে আরো উসকে দিয়েছে তা ভারতের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনেই পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।

সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি পরিকল্পিত?

ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতজুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে গত তিন বছরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। আর এ কাজে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠতে শুরু করেছে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবরেও বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টিতে পরিকল্পিতভাবে রামনবমীর মিছিলকে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতি বছরই বিজেপির এ ধরনের মিছিলের সংখ্যা বাড়ছে এবং এসব মিছিল থেকে নানা ধরনের উসকানিমূলক সেøাগান দেয়া হচ্ছে।
ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছেÑ ২০১৫ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। রামনবমীর মিছিলের পর এই উত্তেজনা আরো বেড়েছে। বিহারে রামনবমীর সশস্ত্র মিছিলে নেতৃত্ব দেন মোদি সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অশ্বিনা কুমার চৌবের ছেলে অরিজিত শাশ্বত। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় অরিজিতের উসকানিমূলক বক্তব্যের পর উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ অভিযোগ অরিজিতের বিরুদ্ধে এফআইআর হওয়ার পর তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে জেলে পাঠানো হয়। একই অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে আরো ১২০ বিজেপি নেতাকে।
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সংখ্যা ছিল ১৫৫টি। কিন্তু ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৫টিতে। এভাবে বিভিন্ন রাজ্যেই সাম্প্রদায়িক হানাহানি বাড়ছে। বিজেপির উসকানিতেই সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাচ্ছে। এমনকি রামনবমীর মিছিলগুলোতে শিশুদেরও অস্ত্র হাতে নামানো হচ্ছে। এভাবে কোমলমতি শিশুদেরও হিংস্র করে তোলা হচ্ছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে হিন্দুদের বিজেপির পতাকা তুলে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়েই মোদি ও অমিত শাহরা বিভিন্ন ধর্মীয় ইস্যুকে সামনে এনে সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত সৃষ্টির কৌশল নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এখানে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটাররা ঐক্যবদ্ধ নন। তারা ধর্মে ভিত্তিতে নয়, আদর্শের ভিত্তিতে নির্বাচনে ভোট দেন। অন্য দিকে এ রাজ্যে মুসলিম ভোটার ৩৩ শতাংশ, যাদের ভোট বিজেপি পায় না। ফলে এ রাজ্যে ক্ষমতায় যেতে পারছে না বিজেপি। সে কারণে ধর্মীয় ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে এবং হিন্দুত্ববাদকে উসকে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে এ রাজ্যে ক্ষমতা দখল করার নীলনকশা করেছে বিজেপি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তারই অংশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

 

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.