ads

বাড়ছে মামলাজট : নিষ্পত্তিতে লাগছে বছরের পর বছর

চট্টগ্রামে ভারপ্রাপ্ত জজ দিয়ে চলছে পারিবারিক আদালতে
চট্টগ্রাম ব্যুরো

স্বতন্ত্র পারিবারিক আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার সম্পন্ন নির্দিষ্ট বিচারক ছাড়াই অন্য আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়ে চলছে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালত। এতে মামলা জট বাড়ছে।
৩৩ বছর আগে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আদালতগুলোতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আলাদা পারিবারিক আদালত। চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের ৩২টি থানা এলাকার বিচারকাজ পরিচালনার জন্য মাত্র দু’টি পারিবারিক আদালত রয়েছে। কিন্তু এই দু’টি পারিবারিক আদালতের নিয়মিত/নিজস্ব বিচারক নিয়োগ না দেয়ায় অতিরিক্ত সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ১ম ও ২য় আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিয়েই পারিবারিক আদালত পরিচালনা করা হয়। সরাসরি পারিবারিক আদালতে মামলা দায়েরের ব্যবস্থা না থাকায় সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়েরের পর তা পারিবারিক আদালতের আলাদা নম্বর দিয়ে ট্র্যান্সফার করা হয়। এতে বিচার বিলম্বিত বা কালক্ষেপণ হওয়া ছাড়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বিচারকাজ।
পারিবারিক ১ম ও ২য় আদালতে জমে আছে যথাক্রমে প্রায় ৩০০০ ও ১৭০০টি পারিবারিক মামলা। সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রায় ৫০-১০০টি পারিবারিক আপিল মামলার কার্যক্রমও জমে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে এসব তথ্য।
আদালত সংশ্লিষ্টদের মতে এই আদালতগুলোতে দ্রুত নিয়মিত বিচারক দিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং একই সাথে আপিল মামলা নিষ্পত্তির জন্য স্বতন্ত্র একটি পারিবারিক আপিল আদালত গঠন করা হলে বিচার প্রার্থী জনগণ এক্ষেত্রে মামলার দীর্ঘসূত্রতার হয়রানি থেকে রেহাই পেতে পারেন।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ-এর পরিচালক (অর্গানাইজিং) মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহ্সানের তত্ত্বাবধানে পাঁচ সদস্যের একটি মানবাধিকার তথ্যানুসন্ধান টিম সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এই প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মোহরানা, খোরপোষ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, বিবাহ বিচ্ছেদ এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতের মতো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিচার নিষ্পত্তির জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বতন্ত্র পারিবারিক আদালত। ১৯৮৫ সালের পরিবার আদালত অধ্যাদেশের মাধ্যমে সারা দেশের পারিবারিক আদালতগুলোর মতো চট্টগ্রামেও প্রতিষ্ঠা করা হয় আলাদা দু’টি পারিবারিক আদালতের। আইনটি নিজস্ব বিচারক নিয়োগের বিধান না রেখে সিনিয়র সহকারী জজ দিয়ে বিচারকার্য চালানোর কথা বলা হয়। চট্টগ্রামে পারিবারিক আদালতে (১টিতে) প্রথম বিচারক হিসেবে তখন বিচারকাজ শুরু করেন সিনিয়র সহকারী জজ আবদুল মান্নান। বর্তমানে দু’টি পারিবারিক আদালতে ১ম কোর্টের বিচারক নেই দীর্ঘ প্রায় ১ বছর। ২য় পারিবারিক আদালতে বিচারক আছেন আশরাফুল নাহার রিটা; কিন্তু ১ম পারিবারিক আদালতে বিচারক সঙ্কটের কারণে ১ম পারিবারিক আদালতের মামলাগুলো ৩য় সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে চার্জ কোর্ট হিসেবে ফাতেমা আক্তার মুক্তার আদালতে চালানো হচ্ছে। তিনি নিজের দায়িত্বের বাইরে ভারপ্রাপ্ত আদালতের দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ দাম্পত্য অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে অভিজ্ঞ স্বতন্ত্র বিচারক আবশ্যক। এ ধরনের মামলার সংখ্যাও অনেক বেশি। জানা গেছে, ঢাকা জেলায় একাধিক স্বতন্ত্র পারিবারিক আদালত এবং এসব আদালতে নিয়মিত বিচারক তাদের বিচারকাজ পরিচালনা করে এলেও এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম আদালত ব্যতিক্রম।
গত কয়েক বছর ধরে ১ম অতিরিক্ত পারিবারিক আদালতে জজ থাকলে ২য় অতিরিক্ত পারিবারিক আদালতের জজ থাকেন না, আবার ২য় অতিরিক্ত পারিবারিক আদালতে জজ থাকলে ১ম পারিবারিক আদালত স্থায়ীভাবে থাকতে পারেন না। আগে অতিরিক্ত ২য় পারিবারিক আদালত না থাকলে ১ম অতিরিক্ত আদালতকে উভয় আদালতের মামলাগুলো পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হতো। প্রায় ১ বছর ধরে ১ম অতিরিক্ত পারিবারিক আদালতের জজ আসা-যাওয়ার মাধ্যমে মামলার বিচারকার্য চালালেও স্থায়ীভাবে বিচারকার্য সম্পন্ন করতে পারেননি। প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত এতে অবর্ণনীয় দুর্দশা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিচারপ্রার্থী জনগণ। প্রায় সময় পারিবারিক আদালতে নিয়মিত বিচারক না থাকায় মামলা নিষ্পত্তির গুরুত্বপূর্ণ স্টেজ প্রি-ট্রায়াল (বিচারপূর্ব শুনানি) ও পোস্ট ট্রায়াল (বিচার-পরবর্তী) সম্ভব হচ্ছে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এ পর্যায়ে ৫০ শতাংশ মামলা আপসে নিষ্পত্তি হয়ে যায়। এতে এ ধরনের বিকল্প বিচার নিষ্পত্তির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অগণিত ভুক্তভোগী নারী, শিশু ও বিচার প্রার্থী মানুষ। ফলে বিচার পাওয়ার জন্য তাদের আদালতে ঘুরতে হয় বছরের পর বছর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে সহকারী জজ আদালত উল্লেখিত পাঁচটি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য মামলাগুলো গ্রহণ করে থাকে। জেলার ১৬টি থানা এলাকার মধ্যে সীতাকুণ্ডু, মিরসরাই, হাটহাজারী পারিবারিক আদালত ব্যতিত অন্যান্য এলাকাগুলোতে মন্থর গতিতে মামলা চলছে। সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ও মহানগরীর ১৬টি নিয়ে মোট ৩২টি থানা এলাকাকে পাঁচটি অধিক্ষেত্রে ভাগ করে ওই এলাকাগুলোর এ সংক্রান্ত মামলা উল্লিখিত পাঁচটি সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দায়ের করতে হয়। এরপর দু’টি পারিবারিক আদালতগুলোতে (১টিতে বিচারক শূন্যতা) নিয়মিত বিচারক না থাকায় এখানে বিচার নিষ্পত্তিতে মারাত্মক সময় ক্ষেপণ হচ্ছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-বিএইচআরএফ চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘নিয়মিত বিচারক না থাকায় পারিবারিক আদালতের মামলা চার-পাঁচ বছরেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। অথচ পারিবারিক আদালতের মামলা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার আইনি বিধান রয়েছে। তিনি বলেন, পারিবারিক আপিল নিষ্পত্তির জন্য স্বতন্ত্র একটি পারিবারিক আপিল আদালত থাকলে বিচার প্রার্থী জনগণের দ্রুত বিচার প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত হয় এবং মামলা জটও কমে যায়।

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.