সীমাহীন সাগরকে নিয়ে

সহদেব দাশ

এপ্রিলের প্রথম দিকে আমরা আট বন্ধু টেকনাফে মিলিত হলাম সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে। সাগরের বুকে জেগে ওঠা বালু আর নারিকেল গাছের তৈরি স্থলভাগকে এক পলক দেখতে। 

সাগরবেষ্টিত দেশের সর্বদক্ষিণ এ শহরকে ঘিরে আমাদের উৎসাহ অনেক দিনের। সাগর ও নাফ নদীর ছোঁয়াতে এ শহরকে যতটুকু গোছানো যতটুকু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভাবছিলাম, শহরটাতে নেমে তার বিপরীতটাই দেখলাম। সাগরগর্ভে জন্ম নিয়ে, জন্মলগ্ন হতেই সাগরমাতার আদর যতেœ বেড়ে ওঠা টেকনাফ এখনো নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারেনি। আমি সাগরমাতাকে দোষারোপ না করে টেকনাফকেই দোষারোপ করলাম।
আগের দিন বিকালের সময়টাতে আমরা টেকনাফ বিচে গেলাম। সি বিচ দেখিনি আগে। আমার বন্ধুদের কয়েকজনও যে আগে দেখেনি তা বিচে গিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড দেখে বুঝলাম। রিকশা থেকে একপলক দেখা মাত্র ছুটে চললাম সাগরের দিকে, দুরন্ত ঢেউয়ের ভেতরে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব কিছুই ভিজে গেছে, তাতে খেয়াল নেই। নিজের কাছে মনে হলো- বিশালকায় সাগরের কাছে আমি নিজেই বালুকণা মাত্র। সাগর এতবড় জানতাম না। এই সাগরের কাছে অস্তগামী সূর্য পশ্চিমাকাশে এক মুষ্টি বালুকণার মতো দেখা যেতে লাগল।
সাগর পাড়ি দিয়ে সেন্টমার্টিন যাবো- আমার ভেতরে একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করে যাচ্ছিল। যে কারণে ঘুমই আসছিল না, আগের দিন সেই রাতটাতে। রাত তখন ২টা, আমার বন্ধুরা সব গভীর ঘুমে। ঘুমের ভেতরেও প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বনাথ আর রহিম। নাক ডাকায়ে নিঝুম ঘন পরিবেশকে ভেঙে চুরমার করে দিলো। তাদের থেকে রেহাই পেতে আমি উঠে চেয়ারটা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসি। সামনের ফাঁকা জায়গাটিতে অন্ধকারের বসবাস থাকলে কোথা থেকে আসা সামান্য আলো কয়েক বর্গমিটারের স্থলভাগকে আলোকিত করে রাখছিল।
সি ট্রাক চালু নেই। সি কিং-এ করে রওনা হই। সি কিং তো আর কিছুই না- ইঞ্জিনচালিত বড় ধরনের নৌকাটিতে একটি যাত্রী ছাউনি। বাংলাদেশের পতাকা বহন করে নাফ নদীর বুক দিয়ে চলল সি কিং।
ভরপুর নদীর পাশ ঘিরে গাছ-গাছালি বেষ্টিত পাহাড়ের দৃশ্য সত্যিই অর্পূব, চিরন্তন। কোনো দিন ভোলার নয়। বাংলাদেশ আর মায়ানমারকে ছুঁয়ে এ নদী বড়ই সুশ্রী, শান্ত। এর প্রতিটি পানির ফোঁটা অশ্রুবিন্দুর ন্যায় কোমল, শীতল। নিষ্পাপ প্রতিটি ফোঁটা তার। একেতো দু’দেশের ছোঁয়া, তারপরে সাগরের সাথে রক্ত-মাংসের বন্ধন নাফ নদীকে অপরূপ রূপে সাজিয়েছে। নদীর তীরে আমাদের চোখের দূরসীমানার কাছাকাছি দু-একটা প্যাগোডা, দু-একটা বিল্ডিং নদীর পানিতে ভাসমান জীবন্তটি মনে হলো।
আমার বন্ধুরা তো আনন্দে উৎফুল্ল। চোখে-মুখে তাদের হাসি-খুশির বোল বাক্য লেগেই আছে। নাদিম তো পানিতে ভাসমান এক ছোট্ট ডানা লম্বা সাদা পাখিকে দেখে ‘আলবাট্রস’ নামে গালগল্প শুরু করল। আর কিছুদূর যেতেই এক ঝাঁক পান-কৌড়িকে লক্ষ্য রেখে ক্যামেরা বন্দি করতে যাবে, এমন সময় উড়ে যাওয়াতে ক্ষেপলো নাদিম। চাপাই ভাষায় বলে উঠলÑ ছীট, ছালারা যে উড়তে পারে। আমি তখন বললামÑ ছালারা উড়তে পারে এজন্যই ছালারা পেঙ্গুইন নয়।
সামনে হতে মায়ানমারের পতাকা নিয়ে যাত্রীবহনকারী এক ট্রলারে সমান আকার-আকৃতি দু’জন তরুণী। তাতে উৎসাহ পেল সবাই। ফর্সাদের এরকম লাল ড্রেসে পছন্দ শাকিলের। জুয়েলের পছন্দ এ রকমই, তবে স্লিম ফিগারের হলে ভালো হয়। নাদিম অল্পই বলে উঠল- ট্যুর ছার্থক।
সবাই দু-এক কথা বললেও এখনো পর্যন্ত কথা বলেনি সবার মাঝখানটাতে চুপটি করে বসা বয়সের ভারে বুদ্ধিজীবী পুলক। তাকে অন্য চিন্তাতে ধরেছে- সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধে তাকে বহনকারী নৌ-যানটি পারে কি না পারে। সে ভীতিই কাবু করে তুলেছে তাকে। যাওয়া হলো না আমাদের। সি কিং-এর ইঞ্জিনে ডিস্টার্ব দেয়াতে সেই নাফ নদী থেকেই ফিরে আসতে হলো।
বিকালটাতে মাথিনের কুপ, মার্কেটে নানা স্থানে ঘুরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। সেখান থেকে গিয়ে আড্ডার পর্ব সারতে রাত ১২টা বেজে গেল। সে পর্বে নাদিমের লাভ ম্যারেজ, মাথিনের কুপ, মায়ানমারের সেই সুন্দর তরুণীদ্বয়, নানা কিছুই স্থান পেল।
পরের দিন আবারো প্রস্তুতি। হোটেলে নাস্তা করছি এমন সময় এক শুভাকাক্সক্ষী বললো ভাইয়েরা সেন্টমার্টিন যাবেন বুঝি?
নাম কেরামত তা মুহূর্তেই তার মুখ থেকে শুনলাম। আমাদের সবার নামও কৌশলে জেনে ফেলল। তারপরে অমুক ভাই, তমুক ভাই বলে সম্বোধন করতে লাগল।
সি কিং-এর দারুণ নিন্দা করে আমাদের বুঝিয়ে এক সাধারণ ট্রলারে তুলে দিলো কেরামত ভাই। ১৫ দিনের ট্যুরটাতে সাতদিন কেটে গেলেও এমন লোক পেলাম না, যে আমাদের সাহায্যে সামান্যটুকু এগিয়ে আসছে। তার আলাপ ব্যবহারে মুগ্ধ আমরা সবাই। রহিম তো বলেই ফেলল, কেরামত ভাই, আপনার মতো মানুষ হয় না। কেরামতের মুখটাতে এক অন্যরকম ছবি ফুটে উঠল। হাসল কি কাঁদল, সে-ই জানে। বলল, সবই আল্লার ইচ্ছা। ভালো মানুষে, খারাপ মানুষে দুনিয়া ভর্তি।
ট্রলারটাতে ওঠামাত্র কেরামত ছোট্ট হেসে বলল, ভাই, একশ’ টাকা বউনি করেন আর সাতশ’ টাকা নেমে দিয়েন।
কেরামতের হাতে একশ’ টাকার একখানা নোট ধরিয়ে দিতেই বিসমিল্লাহ বলে পকেটে ঢোকাল। তারপর পেছন ফিরে হুড়মুড় করে নেমে গেল।
আমরা যথেষ্টই বুঝলাম- এত সময়ের কথোপকথনে কেরামত একশ’ টাকা হস্তগত করতে পেরেছে। আশপাশের লোকজন সে দৃশ্য নিতান্তই স্বাভাবিকভাবে নিলো, যেন এরকম দৃশ্য দেখতে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
নাফ নদীর শান্তশিষ্ট ঢেউয়ের ওপর দিয়ে অনায়াসে ছুটে চলল আমাদের ও আরও অনেককে বহনকারী সে ট্রলার। ঘণ্টাখানেক সময়ে আমরা সাগর ও নাফ নদীর মিলনস্থল বরাবর পৌঁছে গেছি। নদীর শান্তশিষ্ট ঢেউয়ের সাথে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মিলন ঘটেছে।
দূর সাগরের দিকে একবার তাকাতেই ভেতরটা কেঁপে উঠল আমার। চোখের সীমানায় রাশি রাশি ঢেউ ছাড়া আর কিছুই নেই। আমাদের সবাইকে সলিল সমাধিস্থ করতে মাত্র একটি ঢেউই যথেষ্ট। সামনের তৈরি প্রতিটি ঢেউ যেন গিলে ফেলতে চাচ্ছে আমাদের। এ পর্যন্ত কত যে প্রাণ গিলে ফেলেছে, তার ইয়ত্তা নেই। তবুও ক্ষুধা মেটেনি। আমি শুধু প্রবল, পরাক্রমশীল ঢেউকে উদ্দেশ করে বলে উঠলামÑ ক্ষমতা তোমার অসীম, তাতে সন্দেহ নেই। তবুও তুমি ক্ষণস্থায়ী। সাগরের বুকেই জন্ম আবার ক্ষণপরে সাগরের বুকেই মৃত্যু তোমার।
যাত্রার শুরুতে নাফ নদীর সেই মনোরম দৃশ্য আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তখন ভাবছিলামÑ এ যাত্রাই শেষ নয়, জীবনে বহুতবার এখানে আসব। কিন্তু উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের মাথায় পায়ে ওঠা-নামা করতে করতে মনে হলো- এ যাত্রাই শেষ যাত্রা। জীবনে আর বাঁচব না, যাত্রাও করা হবে না।
দূরসীমানায় টেকনাফের অস্তিত্ব অষ্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। মুহূর্তেই তা হারিয়ে গেল। উত্তর-পূর্ব কোণে শুধু মিয়ানমারের কিছু নারিকেল গাছের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছিল। মনে তখনও বাঁচার আশা ছিল। ডুবলে অন্তত সাঁতরে সেখানে গিয়ে উঠতে পারব। তাও একসময় হারিয়ে গেল। বাঁচার আশা একেবারে ক্ষীণ হয়ে উঠল। চোখের সীমানায় তখন কোনো স্থলভাগ নেই। ঢেউয়ের বড় বড় ধাক্কা আমার বাইরেটার সাথে ভেতরটাকেও নাড়িয়ে তুলল। কোথা থেকে আসা একটি ট্রলার, চোখের সীমানায় খানিকক্ষণ থেকে সামান্যটুকু আশা সঞ্চার করে আবার চোখের সীমানার বাইরে চলে গেল। আকাশের কোণে চাতক পাখির এক খণ্ড মেঘ দেখার মতো।
সাহস যখন সব হারিয়ে ফেলেছি তখন আমার পেছনটাতে বসা মায়ের কোলে এক পিচ্চি বালককে দেখে খানিকটা সাহস বাড়ল। বয়স দু’তিন বছরের বেশি নয়। সবেমাত্র ল্যাংটা দশা পার করেছে। দেখলাম, পিচ্চি সে বালক খুবই স্বাভাবিকভাবে নিষ্পলক চোখে সাগরের দিকে চেয়ে আছে। ট্রলার ডুবলে নিজে বাঁচি-মরি ঐ পিচ্চিকে আগে বাঁচাতে হবে- নিজেকে শক্ত করে নিলাম। পিচ্চি বালক যে ভয় পায়নি আমি জোয়ান হয়ে সে ভয় কেন করব?
ক্রমে ক্রমে নারিকেল গাছবেষ্টিত নারিকেল জিঞ্জিরার আবছা ছবি আমাদের দৃষ্টিগোচরর হলো। মনটা আমার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। এ আনন্দ কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আনন্দের মতো। আমি সেন্টমার্টিন আবিষ্কার করিনি, শুধু আবিষ্কৃত সেন্টমার্টিনকে নিজের ভেতর থেকে আবিষ্কার করি।
একসময় নেমেই পড়লাম। দেখতে লাগলাম সেন্টমার্টিনের ভেতরটা। নানাজন নানাস্থানে ক্যামেরাবন্দি হতে লাগলাম। দেখার সাথে সাথে যুগোপযুগের সাক্ষী করে রাখতে ব্যস্ত এ যাত্রাকে। কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে একই ট্রলার করে আবার আমরা ফিরি। সূর্য সারা দিনের পরিশ্রমান্তে সাগরের পানিতে ডুব দিলো।
নাফ নদীতে পৌঁছাতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। চোখের সামনে দৃষ্টিগোচর সব দৃশ্য অগোচরে চলে গেল। হারিয়ে গেল নাফ নদীর তীর ঘিরে মিয়ানমারের সেসব সুশ্রী দৃশ্য। হারিয়ে গেল বাংলাদেশ প্রান্তে নদীর চরে কিছু দুরন্তপনা যুবকের দৃশ্যও। আমরাও একসময় অন্ধকারের ঠিকানায়।
ঘাটে যখন পৌঁছলাম তখন রাত অনেকটা হয়ে গেছে। নদীতে ভাটা। ছোট পথ দিয়ে যেতে পারছে না আমাদের বড় ট্রলারটি। অন্ধকারের ভেতর কাদা মেখে উঠতে হবে- আমার শহুরে বন্ধুরা ভয় পেয়ে গেল। আমাদের হৈ চৈ শুনে কোথা থেকে দু-তিনটা ডিঙ্গি নৌকা ছুটে এলো।
দশ টাকা করে চাইলে আমরা পাঁচ টাকা করে দিতে চাইলাম। তাতে রাজি হওয়ায় আমরা উঠে বসলাম। হাত-বিশেক দূরে নিয়ে আমাদের বলল, ভাইয়েরা নামেন?
আমরা সবাই বলে উঠলাম, এখানে কেন নামব? আমাদের পাকা ঘাটে নিয়ে যান?
মধ্য বয়স্ক সে মাঝি বলল, পাকা ঘাটে আমাদের যাওনের অধিকার নেই। আমরা এ পর্যন্ত আনি।
শেষ পর্যন্ত আমাদের আর হাত দশেক দূরে পাকা ঘাটে পৌঁছে দিয়ে দশ টাকা করেই নিলো।
যখন টেকনাফে প্রথম নামছিলাম তখন নোংরা, শ্রীহীন পরিবেশ দেখে আমি পবিত্রভূমি টেকনাফকেই দোষারোপ করছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি না। এখানকার মানুষগুলো যতটুকু ভালো তার চেয়েও টেকনাফ অনেকটা ভালো, অনেকটা গোছালো, অনেকটা সুশ্রী।
সেন্টমার্টিন যাত্রার অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। এখনো বছরান্তে সে সময় যেখানে থাকি না কেন সেন্টমার্টিনের আকাশের বাতাসের গন্ধ পাই। আমি এখনো বলে দিতে পারি সাগর শান্ত নাকি অশান্ত। সীমাহীন সাগরকে নিয়ে আগে যতটুকু জানতাম আজও ততটুকু জানি- সাগর উত্তাল হলেও মায়া মমতার কমতি নেই তার।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.