ads

গৃহকর্মী আমাদেরই ভাই-বোন

প্রফেসর হেলালুন নাহার

গৃহকর্মী নির্যাতন একটি অতি পুরনো নির্মম সত্য। আবহমানকাল থেকে এ নির্যাতনের নির্মম সত্যকথন নীরবে-নিভৃতে কেঁদে ফিরছে। শুধু দৈহিক নির্যাতনই নয়, ইদানীং অহরহই ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা। এ মহা অন্যায়-অবিচারের প্রতি মানবিক কারণেই আমাদের যেমন আছে ক্ষোভ, তেমনি সহমর্মিতা-সহানুভূতিরও অভাব নেই। কিন্তু এ অবস্থা নিরসনে প্রকৃতপক্ষেই কোনো কার্যকর উদোগ নেই। উদ্যোগ নেই আইন-আদালতেও। জাতীয় পত্রিকাগুলোতে এদের নির্যাতনের খবর প্রতিদিনই দেখা যায় ছোট হরফে। বাস্তবে নির্যাতনের প্রকৃত সংখ্যা সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের চেয়ে শত-সহস্র গুণ বেশি। এ দেশে ঘরে ঘরে প্রতিদিন গৃহকর্মীরা কম-বেশি নির্যাতিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থার (ওখঙ) ভূমিকা কদাচিৎ চোখে পড়ে। গৃহকর্মী নির্যাতনে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অগ্রগামী। বর্তমানে আমাদের দেশে গৃহকর্মীর সংখ্যা আনুমানিক ৫০ লাখ বা আরো বেশি।
একজন মুসলিম মহিলা হিসেবে আমার কিছু উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। কারণ, গৃহকর্মী নিয়ন্ত্রণে ও নির্যাতনে আমাদের মতো মহিলারাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নির্যাতনের শ্রেণিবিভক্তি বহুবিধ।
দু’টি ঘটনা উল্লেখ করছি : রাজশাহী অঞ্চলে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহের কনকনে শীতের রাত। উত্তরমুখী বাড়ির দোতলার বারান্দার সিমেন্টের ওপর মেঝেতে কোনো এক রূপালীকে অভুক্ত অবস্থায় সারা রাত কাটাতে হয়। তার অপরাধ, সে একটি চায়ের কাপ ভেঙে ফেলেছে। বয়স তার ১২ বছর। কী বিচিত্র শাস্তি! এমন শাস্তি অহরহই জুটে থাকে রূপালীদের ভাগ্যে। অত্যাচারের কোনো চিহ্ন নেই, কোনো প্রমাণ নেই।
আরো একটু বলি, রাহেলা নামের প্রৌঢ়া। বাসার ম্যাডাম তাকে গালিগালাজের সাথে সাথে রাগ হলেই যখন তখন চড়-থাপ্পড় মারতে কার্পণ্য করেন না। কখনো বা মেহমানদের সামনেই। তরুণী ম্যাডাম বয়সে তার কন্যাতুল্য। তার বয়সের মর্যাদা ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। নির্বাক অভিযোগ দু’চোখে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে। এর কি কোনো বিচার আছে? নেই। নামমাত্র বেতনে অথবা শুধু পেটে-ভাতে অসংখ্য শিশুশ্রমিক ও নারী বাসাবাড়িতে কাজ করে যাচ্ছে; করবে।
পচা-বাসি খাবার খেয়ে আর দিনের পর দিন একচিলতে বদ্ধঘরে মশারিবিহীন (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে) অবস্থায় দিন-রাত কাটিয়ে এরা ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়াসহ নানাবিধ রোগে ভোগে। জানেও না তার কী হয়েছে? অসৎ চরিত্রের গৃহকর্তা অথবা বাড়িতে আশ্রিত পুরুষ আত্মীয়স্বজনের দেহের ুধা মেটাতে এরা ধর্ষণের শিকার হয়। এক দিকে চরমভাবে যৌন নির্যাতনে মৃতপ্রায় হয়, নানাবিধ ভয়াবহ অসুখে আক্রান্ত হয়; অন্য দিকে গৃহকর্ত্রীও তাদের ওপর অমানসিক নির্যাতন চালায়। কোথাও বা শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয় এদের। মাথার চুল কেটে দেয়া তো সাধারণ ব্যাপার। পরিশেষে তাকেই দোষী সাব্যস্ত করে ভ্রষ্টা অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়। লোকলজ্জার ভয়ে এরা নিজেরা বা এদের হতভাগ্য অভিভাবকেরা আইনের দরজা পর্যন্ত আসতে পারে না, সুবিচার তো বহু দূর।
বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়, বেত্রাঘাত, গরম খুন্তির ছেঁকা, গরম ইস্ত্রির ছেঁকা, গরম পানি ঢেলে দিয়ে গা ঝলসে দেয়া এবং লাঠিপেটা করা ইত্যকার শাস্তির নাকি আইনের চোখে কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। অপরাধযোগ্য শাস্তি বলে এগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৪(খ) ধারায় কার্যকর হয় না। সোজা কথায়, আইন এ নির্যাতন শাস্তি বলে কভার করে না।
রাসূল সা: ছিলেন এতিমের বন্ধু, গরিবের বন্ধু, বিধবার বন্ধু ও নির্যাতিত মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু। হজরত আবুজর গিফারি রা: এক বর্ণনায় বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন, ‘তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীরা তোমাদের ভাইবোন। আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। সুতরাং সে যেন তাদেরকে তাই খেতে দেয় যা সে নিজে খায়। তাই পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে, আর তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ যেন তার ওপর না চাপানো হয়। একান্তই যদি চাপাতে হয়, তবে যেন তা সমাধা করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করা হয়।’ Ñ বুখারি ও মুসলিম।
তিনি আরো বলেনÑ ‘যখন কোনো দাস-দাসী তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করে এনে দেয় তখন নিজের সাথে বসিয়ে তাকে খাওয়াবে। কেননা সে ধোঁয়া ও তাপ সহ্য করেছে। আর কোনো খাবার যদি পরিমাণে কম হয় তবে অন্তত দু-একমুঠো তার হাতে দেবে।’Ñ সহি মুসলিম।
নবী করিম সা: মৃত্যুমুহূর্তে শেষ বাক্য হিসেবে বলে গেছেনÑ ‘নামাজ, নামাজ। তোমাদের দাস-দাসীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। মহানবী সা: বারবার এ কথা বলতে থাকেন।’ Ñ সহি বুখারী, বর্ণনাকারী হজরত আলী রা:।
উল্লিখিত হাদিসগুলোকে হৃদয় ও প্রজ্ঞা দিয়ে অনুভব করে আমাদের উচিত তা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলা। হাদিসগুলো থেকে আমরা যে দিকনির্দেশনা পেলাম তা অতি সুস্পষ্ট। এ হাদিসগুলোর ভিত্তিতেই কিছু নিয়মনীতি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। যেমনÑ (১) গৃহকর্মীরা পরিবারের সদস্যতুল্য গণ্য হবে। (২) পরিবারের সদস্যরা যা খাবে, তারাও তাই খাবে। (৩) পরিবারের সদস্যরা যা পরবে তাদেরও (সতর ঢাকা) সে ধরনের পোশাক দিতে হবে। (৪) সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ তাদের ওপর চাপানো যাবে না। যদি দেয়া হয় তবে তাকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে ও সক্রিয় সহযোগিতা করতে হবে। (৫) মাঝে মধ্যেই তাদের নিজেদের সাথে খাবার খেতে ডাকতে হবে। (৬) সর্বোপরি আখেরাতের ভয়াবহ দিনের কথা হৃদয়ে স্মরণ রেখে অধীনস্থদের প্রতি ইনসাফ বা সুবিচার করতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসূল সা:-এর নির্দেশকে পার্থিব সমস্ত বিবেচনার ওপর স্থান দিতে হবে। অত্যাচার, নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যা তো অকল্পনীয়।
আমরা জানি, গৃহকর্মীদের নিয়ে বহু জায়গায় বহু সমস্যা সব সময়ই হয়ে থাকে। অকৃতজ্ঞ দাস-দাসীকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সা: অত্যন্ত অপছন্দ করেছেন। এমনকি রাসূল সা:-এর সময়েও অবাধ্য ক্রীতদাসকে বিক্রি করে দিতে বলা হয়েছে। কাজেই এ ব্যাপারে গৃহকর্মীদের সবরের সাথে উপদেশ দিয়ে, শাসন করেও যদি ভালো করতে না পারা যায়, তবে অত্যাচার না করে তাকে কাজ থেকে সরিয়ে দেয়াই উত্তম। তাদের অপরাধ যদি আইনে শাস্তিযোগ্য হয়, তবে তাদের আইনে সোপর্দ করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ লাখ লাখ এই গৃহকর্মীর জন্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সরকারি সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু মানবাধিকার সংরক্ষণে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এ সমস্যার সমাধানই সর্বশ্রেষ্ঠ, সন্দেহ নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.