ads

ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ

ড. ইউসুফ আল-কারযাভি

আমরা যে আদর্শ চাই তার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ তা উদ্দেশ্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেেিত ভারসাম্যপূর্ণ। কারণ তা এমন এক সুষম আদর্শ যা মানুষ ও জীবনের প্রতি এক মধ্যম, সমন্বিত ও প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটায়। এ হচ্ছে চরমপন্থা ও ঔদাসীন্য থেকে মুক্ত এক সংহত ও সুষম উম্মাহর এক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির অবয়
কোনো কোনো ইসলামপন্থী কেবল দু’টি রঙ দেখতে পানÑ সাদা আর কালো। তারা অন্য কোনো রঙ না চেনেন, না দেখতে পান কোনটি মৌলিক ও কোনটি মিশ্র রঙ, যে রঙ অন্যেরা দেখতে পায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ সব রঙ বাদ দিয়ে নিজের দৃষ্টি এমন কি জীবনকে একটি মাত্র কালো রঙের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখেন। তারা মানুষ ও বস্তুকে কালো ফিল্মে আচ্ছাদিত চোখ দিয়ে দেখেন।
তারা এ কালো হতাশাবাদী দৃষ্টি দিয়েই প্রত্যেক প্রশ্নের জবাব তৈরি রাখেন এবং কাকে বা কোথায় গিয়ে লাগল তার পরোয়া না করেই মিসাইলের মতো ছুড়ে দেন। তাদের কাছে গোটা সমাজই ইসলামপূর্ব যুগের মতোই জাহেল। জীবনের সব কিছুই পাপ। সব লোক হয় বেইমান, নয় তো মুনাফিক। দুনিয়া অপশক্তিতে পূর্ণ, গোটা জগৎ অকল্যাণে পূর্ণ।
তাদের চোখে সমসাময়িক যুগে মানুষ যা কিছুু করে তা হারাম ছাড়া কিছু নয়। সব সঙ্গীত, অভিনয়, নাটক এবং শিল্পকলা হারাম।
হতাশাবাদীরা সাহসিকতার সাথে উল্লিখিত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। অথচ আমাদের পূর্বসূরিরা সন্দেহাতীতভাবে হারাম বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হারাম শব্দটি ব্যবহারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। আল কুরআনের দু’টি আয়াতে মদের নিন্দা করে বলা হয়েছেÑ ‘তারা আপনাকে মদ ও জুয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, উভয়ের ব্যবহারের মধ্যে গুরুতর পাপ রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু কল্যাণও আছে। আর এ দু’টোর মধ্যে কল্যাণ অপো পাপই অধিক গুরুতর’। (সূরা বাকারা : ২১৯)।
অন্যত্র বলা হয়েছেÑ ‘এবং তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের নিকটেও যেও না’। (সূরা নিসা : ৪৩) কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা:-এর কোনো কোনো সাহাবি মদপান অব্যাহত রাখেন এবং কেউ কেউ বললেন, ইয়া আল্লাহ, মদের ব্যাপারে আমাদের কাছে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাঠান এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি জানানো হয় সূরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াতেÑ ‘এ হতে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হতে পার’।
আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, পঞ্চাশের দশকে বেশ কিছু জাহেলি চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে। এসব চিন্তাধারা ইসলামি সমাজেও এমন মাত্রায় বিস্তার লাভ করে যে, সবকিছু প্রত্যাখ্যান, হতাশা, সংশয় এবং মুসলমানসহ অন্যদের অভিযুক্ত করার প্রবণতা চিন্তার প্রধান ধারা হয়ে দাঁড়ায়।
সে সময়ে অন্যকে পাপি, অবিশ্বাসী এমন কি কাফের বলে রায় দেয়ার প্রবণতার ত্রে তৈরি হয় এবং এ রকম একটি নিপীড়নমূলক পরিবেশে এ চিন্তাধারা বিকাশে সহায়ক হয়। আর এমনি পরিবেশেই ইসলামি আন্দোলন এবং তার অনুসারীরা ওই সময়ের সম্মুখীন হয়। ওই সময়ে ইসলামি আন্দোলনের অনুসারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়। গোপনে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দেয়া হয়। অন্য সব ধরনের নিপীড়নও চালানো হয়। অন্য দিকে কমিউনিস্ট, ধর্মনিরপেতাবাদী ও ইসলামের শত্রুদের জন্য সব দরজা খুলে দেয়া হয়।
মধ্যপন্থা ও সহজপন্থা : স্বাচ্ছন্দ্য সুনিশ্চিত করতে আমার মতে, মধ্যপন্থা বা ভারসাম্য পদ্ধতি হাত ধরাধরি করে চলে। দ্বীনের েেত্র এ পদ্ধতি একদিকে অনময়নীয়তা ও অহেতুক বাড়াবাড়ি এবং অন্য দিকে শৈথিল্য ও লাগামহীনতার মধ্যে এক সুষম দৃষ্টিভঙ্গি।
সহজতর পথ : ইসলামি আন্দোলন অবশ্যই জটিলতা নয়, সহজতর পথ ধরে এগোতে হবে। সমাজ সম্পর্কে ইসলামি আইনবিদদের মতামত, অর্থনীতি, আইন, আচরণ ও আন্তর্জাতিক আইনের েেত্র এ সহজতর নীতি অবলম্বন করতে হবে। একাধিক কারণে আমি এ কথা বলছি।

প্রথমত, আমাদের শরিয়াহ সহজসাধ্যতা, মা ও সহিষ্ণুতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তা কাঠিন্য ও কেশ নির্মূল করতে চায়। শরিয়াহর মূল গ্রন্থগুলোতে এ চেতনাই প্রতিফলিত হয়েছে।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান এবং তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না’। (সূরা বাকারা : ১৮৫) অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহর ইচ্ছে নয় যে, তোমাদের ওপর কোনো অসুবিধা চাপিয়ে দেন;। (সূরা মায়িদা : ৬) মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ভার হালকা করতে ইচ্ছে করেন, কারণ মানুষকে দুর্বলভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে’। (সূরা নিসা : ২৮) আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এটি তোমাদের প্রভুর প থেকে সহজ ব্যবস্থা ও অনগ্রহ’। (সূরা বাকারা : ১৭৮)
মহানবী সা: বলেছেন, ‘কাজকর্ম সহজ করে দাও, কঠিন নয়’ (বুখারি ও মুসলিম)। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের বিষয়াদি সহজ করার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং এগুলো কঠিন করে ফেলো না’। (তিরমিজি)
আমর ইবনুল আস রা: এক শীতের রাতে নাপাকি সত্ত্বেও ফরজ গোসল না করেই নামাজ আদায় করেন। তখন তার সঙ্গীরা রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে অভিযোগ করলে আমর আত্মপ সমর্থন করে বললেন, আমি আল কুরআনের ওই আয়াত স্মরণ করেছি। যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি অতি করুণাশীল’। (সূরা নিসা : ২৯) এবং রাসূলুল্লাহ সা: স্মিত হাসলেন।
রাসূলুল্লাহ সা: কিছু লোকের এরূপ মানসিকতার তীব্র নিন্দাও করেন। যারা এক আহত ব্যক্তিকে নাপাকির দরুণ তাকে অবশ্যই গোসল করতে হবে বলে পীড়াপীড়ি করেছিল এবং লোকটি গোসল করেও তাদের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের কারণে ইন্তেকাল করে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘তারা তাকে হত্যা করেছে। তারা যখন জানে না, তখন জিজ্ঞেস করল না কেন? না জানার প্রতিকার হচ্ছে প্রশ্ন করা। তার তস্থানের একটি ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে তায়াম্মুম করে নেয়াই যথেষ্ট ছিল’। (আহমাদ, আবু দাউদ ও আল হাকিম এবং সহিহ আল জামি আল সগিরেও এ হাদিস বর্ণিত হয়েছে)
দ্বিতীয়ত, আমাদের এ যুগে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে মানুষের কল্যাণের স্বার্থে সহজসাধ্যতার প্রয়োজন অনেক বেশি। কারণ অধুনা মানুষের ইচ্ছাশক্তির এমন অবয় ঘটেছে যে, সৎ ও কল্যাণকর কাজের ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ কমে গিয়ে দুষ্কর্মের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সুতরাং, দ্বীনি হুকুম-আহকাম পালনে কঠোরতম নিয়মবিধি অনুসরণের তাগিদ দেয়ার পরিবর্তে মানুষকে সহজসাধ্যতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করাই বাঞ্ছনীয়। রাসূলুল্লাহ সা: প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী মানুষ এবং মরুভূমির বেদুইনদের প্রতি এমন আচরণই করেছিলেন। যারা দ্বীনি আহকাম ফরজ পালন ছাড়া অন্যান্য নফল ইবাদত করার অঙ্গীকার করত না। রাসূলুল্লাহ সা: তাদেরকেও গ্রহণ করে নিতেন এবং কারো কারো সম্পর্কে বলতেন, ‘সে তার কথা অনুযায়ী ভালো কাজ করলে সে সৎ কর্মশীল হবে, অথবা সে তার ওয়াদা পালন করলে বেহেশতে যাবে অথবা তোমাদের কেউ যদি বেহেশতি লোক দেখতে চাও, তাহলে এ লোকটির দিকে দেখো’।
রাসূলুল্লাহ সা: শুধু তাদের প্রতি মমত্ববোধ এবং তাদের কঠোর অবস্থা বিবেচনা করেই এরূপ সদাচার করতেন।
তৃতীয়ত, ব্যক্তিগতভাবে যেকেউ নিজের ওপর কঠোরতা আরোপ করে স্বীয় ইচ্ছাশক্তির সীমানা পরখ করতে পারে। কিন্তু মধ্যপন্থা হচ্ছে সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে উপযোগী উপায়।
কেননা রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ সে সব লোককে পছন্দ করেন, যারা তাঁর প্রদত্ত সহজসাধ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে, কারণ তিনি তাদের পাপকর্ম করাকে ঘৃণা করেন’। (আহমাদ, ইবনে হিব্বান ও বায়হাকি এবং সহিহ আল জামি আল সগিরেও এ হাদিস সন্নিবেশিত হয়েছে)
নামাজের জামায়াতে ইমামতি সম্পর্কে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যিনি নামাজে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তার উচিত নামাজকে সংপ্তি করা, কেননা ইমামের পেছনে মানুষদের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ এবং ব্যস্ত মুসাফির থাকতে পারে’। সালাত হচ্ছে এমন একটি প্রতীক যেখানে জীবনের নানা দিকের প্রতিফলন ঘটে।
অতএব, ইসলামি আন্দোলনের ফকিহরা এমন সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন না, যা বিধিনিষেধের প্রাচীর খাড়া করে, সহজসাধ্যতার পথ নির্দেশ করে না, কেবল নিষেধ করে, অনুমতি দেয় না। বিশেষ করে সে সব ইস্যুতে যেগুলোর সাথে মহিলা, পরিবার, শিল্পকলা, বিনোদন ইত্যাদি বিষয় জড়িত।

অনুবাদ : মুহাম্মদ সানাউল্লাহ আখুঞ্জি

 

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.