শিকড়ের টান চারাগল্প

তন্ময় আলমগীর

অসুস্থতার খবর শুনে সবাই দাদিকে দেখে গেছে। রাজশাহী থেকে এসেছিল ছেলে ও ছেলের বউ। ঢাকাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে বড় মেয়ে। রিজার্ভ গাড়ি করে এক দিনের জন্য এসেছিল। সবার একই ভাষ্যÑ একঘেঁয়েমি করে আর গ্রামে একা থেকো না। আমাদের সাথে শহরে চলো। হুটহাট কিছু হয়ে গেলে!
দাদা মারা গেছেন পাঁচ বছর হয়ে গেছে। তখনও দাদা আর দাদিই শুধু গ্রামে থাকতেন। ছেলেমেয়েরা শহরে সেটেলড। কেউ চাকরি কেউ ব্যবসায় নিয়ে ব্যস্ত। এক নাতনি থাকে ইতালিতে। সবাই অনুরোধ করেÑ তোমার যেখানে যার কাছে থাকতে ভালো লাগে তার কাছে থাকো। কিন্তু কে শুনে কার কথা! দাদি নাছোড়বান্দার মতো কিছুতেই দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও না যাওয়ার শপথ করে বসে আছে।
শিকড়ের টানে সবাই দেখে গেলেও সবশেষে ইতালিপ্রবাসী বড় নাতি সাইমা এসেছে সপ্তাহখানেক পরে। রাজশাহীতে বাবার কাছে না গিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি দাদির কাছে চলে এসেছে, গ্রামের বাড়ি। প্রথম নাতনি সাইমা ছিল দাদির সবচেয়ে আদরণীয়। দাদির একরোখামি স্বভাব তাকেও কিছুটা ভর করেছে। সেও জেদ করে প্রায় তিন বছর ধরে ইতালিতে পড়ে আছে একা একা।
এসেই দাদির সাথে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। দাদি ফেসবুক কী বোঝে না। বোঝার কথাও না। ফেসবুক এসেছে মাত্র বার-তের বছর হলো। সাইমার পাঁচ হাজার বন্ধু থাকার ব্যাপারটাও তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। দাদি চোখ কপালে তুলে বললেন, নিশ্চয় তোর মোবাইলে ভূত-প্রেতের আছর আছে। ইতালিতেও ভূত!
রাজশাহীতে থাকা অবস্থায় গ্রামে দাদির কাছে এলে ঘুমানোর আগে দাদি রূপকথার গল্প শোনাত। মাঝে মধ্যে ভূত-প্রেতের গল্প বলে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াত। উঠোনে, বেলগাছ তলায়, কলপাড়ে ভূত থাকার কথা শুনে সত্যি মনে হতো সাইমার। সকালে ওঠেই ভূতের খোঁজ নিত সে। তিন-চার বছর যাবত সেসব মাথায় নেই। যতবার দাদির সাথে দেখা বা কথা হয়েছে ততবার আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল সাইমার জীবন। যে জীবন রূপকথা বা ভূত-প্রেতের চেয়ে রহস্যময়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় প্রেম হয় আহাদের সাথে। তুমুল প্রেম। বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে তারা। আহাদের ছোট বড় যেকোনো একটা চাকরি জুটে গেলেই শুভ কাজটা সেরে ফেলবে। বাবা আন্দাজ করতে পেরে তড়িঘড়ি করে প্রবাসী ব্যবসায়ী আনিসের সাথে বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের মাসখানেকের মধ্যেই আনিস সাইমার তিলতিল করে ঢেলে সাজানো স্বপ্নের বুক চিরে দুবাই পাড়ি জমায়।
মানিয়ে নেয়ার সংগ্রামে একসময় সফল হয় সাইমা। ধীরে ধীরে মুছতে থাকে আহাদের স্মৃতি। আড়ালে চলে যায় তার আরাধিত প্রেম। কদাচিত মনে পড়লেও এখন তেমনভাবে হাহাকার গর্জে ওঠে না বুকে। কিন্তু প্রেম বিসর্জন দিয়ে যাকে আপন করে নিতে চাচ্ছে সাইমা, সে আসলে কতটুকু ওর যোগ্য?
সাইমা প্রথমে ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না, দিন দিন আনিসের ঔদ্বত্যপূর্ণ আচরণ বেড়েই চলেছে। নেশাপানির সীমা ছাড়িয়ে নাইট ক্লাবেও রাতের পর রাত কাটিয়ে দেয়। সাইমার মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সুন্দরী, ভদ্র একটা বউ পাওয়া সত্ত্বেও!
সমস্যাটা আসলে আনিসের চরিত্রের। মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি শারীরিকভাবেও নির্যাতন করত। শেষমেশ অন্তরদহন আর শরীরে আঘাতের চিহ্ন বহন করে সাইমা ফিরে আসে দেশে। নীরবে, নিভৃতে দু’মাস কাটানোর পর ওয়ার্ক ভিসায় চলে যায় ইতালিতে।
দেশে আসার এই তিন-চার দিনের মধ্যে দাদির দেখাদেখি সাইমাও পান খাওয়া শিখে ফেলেছে। বাটা থেকে পান বের করে নিজে একটা পান মুখে দিয়ে আরেকটা জর্দামাখা পান দাদির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, পান চিবুলে এখন আর আগের মতো তোমার ঠোঁট টকটকে হয় না। দাদি ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ঠিকই বলেছিস। তোর দাদার মৃত্যুর পর থেকে সব স্থবির হয়ে গেছে। সাইমা বলল, আমার সাথে ইতালি যাবে? বাকি দিনগুলো সুখে কাটাতে মন চায় না তোমার? দাদি দৃঢ়তার সাথে বললেন, আমি বেশ সুখে আছি। বস্তিভিটায় তোর দাদার কবর আমাকে এখনো সঙ্গ দেয়। খুব বেশি কষ্ট হলে কবরের ওপর হাত বুলিয়ে দেই। নিমেষেই কষ্ট দূর হয়ে যায়। কিন্তু তুই! বিদেশ-বিভূঁইয়ে আর কত একা থাকবি? স্বামী-সংসার হলো মেয়েদের শিকড়। শিকড় ছাড়া কত দিন বেঁচে থাকা যায়?
দাদির স্নেহমাখা কথা সাইমার অন্তরের আবেশকে আপ্লুত করল। অপার দরদসুধা অন্তরগড়ানে মেখে দিলো কান্নার প্রলেপ। ঝরঝর করে কেঁদে দিলো সাইমা। স্বপ্নেও ভাবেনি তার জীবনটা এভাবে এলোমেলো হয়ে যাবে। নেমে আসবে অথৈ অন্ধকার। কী যেন নেই, কী যেন নেই। কিসের যেন দারুণ অভাব অনুভূত হয় হৃদয়ে!
সুহৃদ, কিশোরগঞ্জ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.