নিরাপদ প্রসব নারীর অধিকার

আব্দুর রাজ্জাক ঘিওর, মানিকগঞ্জ

বুধবার রাত ৩টা। সন্তানসম্ভবা আঁখি আক্তার নামের এক নারীর প্রসব বেদনা ওঠে। ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত কাকজোর এলাকায় তার বাড়ি। প্রচণ্ড প্রসব বেদনা আর গভীর রাতে অনুন্নত রাস্তাঘাট পাড়ি দিয়ে তাকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে নেয়া খুবই কষ্টের ব্যাপার হয়ে পড়ে। পরে তার পরিবারের লোকজন বানিয়াজুরী ৮ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ও কমিউিনিটি ক্লিনিক কমিটির সভাপতি মো: আরিফুল ইসলাম সূর্যের সহযোগিতায় স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি কাজী আরিফুল ইসলামের কাছে ফোন দেয়। ফোন পেয়ে তাৎক্ষণিক আরিফুল ইসলাম সন্তানসম্ভবা ওই নারীর বাড়িতে হাজির হন। এরপর তিনি দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খবর জানান। ভোর ৫টায় স্বাস্থ্য পরিদর্শক সোনালী রানী সরকার অ্যাম্বুলেন্সে করে নার্স হালিমাকে সাথে নিয়ে ক্লিনিকে উপস্থিত হন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর সকাল ৮টায় নরমাল ডেলিভারিতে আঁখি আক্তার নবজাতকের জন্ম দেন। এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বানিয়াজুরী ১ নম্বর ওয়ার্ড স্বাস্থ্য সহকারী মৃনাল কান্তি ঘোষ উপস্থিত ছিলেন। মো: রোমান মিয়া ও আঁখির প্রথম পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। ফুটফুটে ওই সন্তানের নাম রাখা হয় মোহাম্মদ আলী। আনন্দের জোয়ার বয়ে যায় এলাকায়। ক্লিনিকের বাইরে অপেক্ষারত স্বজন ও গ্রামের লোকজন এ কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা পেয়ে খুবই খুশি। এ যেন হাতের কাছের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের আস্থা ফিরে আসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে এ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো।
মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমাতে এ বছর উন্নয়ন মেলার বিশেষ সেøাগান ছিল ‘সিজারিয়ান ডেলিভারিকে না বলুন, নরমাল ডেলিভারিকে হ্যাঁ বলুন’। এরই ধারাবাহিকতায় মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিকে সম্প্রতি পাঁচটি শিশু স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করেছে। মানিকগঞ্জের ঘিওরে কাকজোর কমিউনিটি ক্লিনিক আরো এক নবজাতকের জন্ম হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকের ইনচার্জ কাজী আরিফুল ইসলাম নরমাল ডেলিভারিসহ সাধারণ চিকিৎসাসেবা প্রদান করার ফলে গ্রামের মানুষের আস্থা ফিরে এসেছে। তারা এখন হাতের কাছেই কমিউনিটি ক্লিনিকে যেকোনো শারীরিক সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে আসছেন।
আঁখির স্বামী রোমান মিয়া জানান, আমার স্ত্রীর এটাই প্রথম সন্তান। আমরা সাধারণত সিজারিয়ান ডেলিভারির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কাকজোর কমিউনিটি ক্লিনিক আমার সে ধারণা বদলে দিয়েছে। তাদের দক্ষ হাতের ডেলিভারি এত সুন্দরভাবে করেছে যে, আমার স্ত্রী তারপরের দিন চলতি এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। আমরা পরিবারের সবাই খুশি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও প:প: কর্মকর্তা ডা: মো: মেজবাউর রহমান জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আওতায় ১৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সবক’টি কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু আছে। সেবার মান নিশ্চিত করতে আমরা সার্বক্ষণিক সচেষ্ট। ইতোমধ্যে গত ফেব্রুয়ারি মাসে করজনা কমউনিটি ক্লিনিকে দুইটি, গত মার্চ মাসে মাইলাগী কমিউনিটি ক্লিনিকে দুইটি এবং কাকজোর কমিউনিটি ক্লিনিকে গতকাল একটি শিশু স্বাভাবিকভাবে জন্ম গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা অনেক বেশি। তাই মা ও শিশু মৃত্যু হার কমাতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা বৃদ্ধির নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কাজ করে যাচ্ছে। এতে দিন দিন মানুষ কমিউনিটি ক্লিনিকে নরমাল ডেলিভারিতে সন্তান প্রসবে আস্থা ফিরে পাচ্ছে। ফলে সিজার বাণিজ্য অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে। প্রয়োজনীয় লোকবল আর অবকাঠামোগত উপকরণ সঙ্কট সমাধান হলে এই সেবার মান প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া সম্ভব।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.