স্রোতধারার স্বত্ত্বাধিকারি শারমিন সেলিম তুলি ; মাদল-এর স্বত্ত্বাধিকারি  মাসুমা খাতুন শাম্মী
স্রোতধারার স্বত্ত্বাধিকারি শারমিন সেলিম তুলি ; মাদল-এর স্বত্ত্বাধিকারি মাসুমা খাতুন শাম্মী

বৈশাখে নারী উদ্যোক্তারা

বদরুন নেসা নিপা

পয়লা বৈশাখ মানে বাঙালির প্রাণের উৎসবে মেতে থাকার নাম। মজার সব খাবার আর সাজপোশাকে ঘটে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। বৈশাখের প্রথম দিনটি যেন ঢাকার রাজপথ রঙিন রূপ ধারণ করে। লাল-নীল আলোকসজ্জায় নয়, প্রকৃতির আলোয় সজ্জিত হয় জীবন। নতুন শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে হাজার হাজার বাঙালি নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে নেয়। এই উৎসবকে ঘিরে দেশীয় উদ্যোক্তাদের থাকে বিনিয়োগ থাকে পরিকল্পনা। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা এখন অনেক। দেশীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় এই উৎসবের প্রস্তুতিও চলে মাসখানকে ধরে। আমাদের অর্থনীতিতে যোগ হয় এক নতুন সূচক। দেশের মোট শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি নারী। নববর্ষকে ঘিরে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যস্ততাও বেড়ে যায়। এ উৎসবকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাদের থাকে আপ্রাণ চেষ্টা। বাংলা নববর্ষ পালনের অন্যতম অনুসঙ্গগুলো হচ্ছে পোশাক, গহনা, সাজসজ্জা ও খাবার। বাঙালির এই সর্বজনীন উৎসবকে ঘিরে নারী উদ্যোক্তাদের প্রস্তুতি নিয়ে লিখেছেন বদরুন নেসা নিপা
বৈশাখী পোশাকে বাঙালির ট্রেন্ড নিয়ে এসেছে স্রোতধারা
শারমিন সেলিম তুলি। ছোট বেলা থেকেই তার পোশাকে রঙে ঢঙে একটু ভিন্নতা ছিল। নিজের শৈল্পিক ছোঁয়ায় পোশাক পরতেন। সেখান থেকেই মাথায় আসে বুটিক স্থাপনের। সেই মোতাবেক গড়ে তুলেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘স্রোতধারা ফ্যাশন হাউজ’। মাত্র পাঁচ লাখ টাকা নিজের সঞ্চিত অর্থ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ছিল মূলধন। ২০০০ সালে গুলশান বিআইটি স্কুলের পাশে বুটিক শপ দিয়ে স্রোতধারার যাত্রা শুরু। একে একে বসুন্ধরা সিটি শপিং সেন্টার, তারপর গুলশান পিংক সিটিতে আছে ফ্যাশন হাউজ স্রোতধারার শোরুম। আধুনিক মেয়ে হোক, আর মধ্য বয়সী নারী হোক, সবার কথা মাথায় রেখেই ডিজাইন করেন শারমিন সেলিম তুলি। নতুনত্বের ছোঁয়ায় বৈচিত্র্যময় পোশাক সবারই প্রিয়। আর সেই বিষয়টিই গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালি, বাঙালি খাবার, বাঙালি পোশাক, বাঙালি সংস্কৃতি। বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। আর উৎসব মানেই প্রথমেই যে অনুষঙ্গটি মাথায় আসে তা হলো পোশাক। বৈশাখে পোশাক মানেই যেন রঙের মেলা। এই আয়োজনকে ঘিরে দু’মাস আগে থেকেই ছোট-বড় সব ফ্যাশন হাউজ ব্যস্ত সময় কাটায়। সবারই লক্ষ্য থাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বিশেষ দিনিটকে আরো ফ্যাশনেবল করে তোলার। সে লক্ষ্যেই বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে প্রতিটি পোশাক বাঙালির ট্রেন্ড ও ফ্যাশনেবল করে উপস্থাপন করেছে স্রোতধারা ফ্যাশন হাউজ। পয়লা বৈশাখে আমরা একাত্ম হই মনের ব্যাকুলতায় প্রাণের টানে। দিনটিকে ঘিরে চলে বিভিন্ন আয়োজন। সেই আয়োজনে শামিল হতে পোশাকের চাহিদা অনেক গুরুত্ববহ। তাই পোশাকের ক্যানভাসে ভেসে উঠে বাঙালির ঐতিহ্য। বৈশাখের প্রথমদিন পোশাকের সাথে সাজের একটি বিষয় রয়েছে। বছরের প্রথম দিন বাঁধভাঙা উৎসবে সাজের ক্ষেত্রে নেই কোনো সীমাবদ্ধতা। বৈশাখের আগে থেকে বৈশাখের দিন পর্যন্ত বিউটি পার্লারগুলো ব্যস্ত সময় কাটায়। সেই লক্ষ্যে বেয়ার, বিউটি পার্লারেও আছে নানারকম বৈশাখী অফার।
যেকোনো শিল্পেই নারী উদ্যোক্তারা নানা ধরনের প্রতিকূলতা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন। নারীরা তাদের কর্মসংস্থানে বিভিন্ন খাতে সংযুক্ত হচ্ছেন। ব্যবসা খাতে রয়েছে তাদের বিশাল অবদান। এরই মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব কর্মাসের একজন সদস্য শারমিন সেলিম তুলি মনে করেন, আমরা নারীরা যদি সবাই উদ্যোক্তা হতে পারি, তবে বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব। যার যতটুকু পুঁজি আছে, তা দিয়েই উদ্যোক্তা হওয়া যায়। তিনি বলেন, অনেকের ধারণা ব্যবসা করতে অনেক টাকা লাগে, মোটেও তা নয়। ১০০ টাকা দিয়েও ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে শুরুটা উৎসব উপলক্ষ করে করা যায়। ঈদের পর আমাদের লোকজ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব পয়লা বৈশাখ। নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি, পরিকল্পনা, সৃজনশীলতা, শৈল্পীকতা, মূলধন ও দৃঢ় সংকল্পকে পুঁজি করে ক্রেতাদের কাছে হাজির হয়েছে এই সফল উদ্যোক্তা।

বৈশাখ উপলক্ষ্যে মাদল সেজেছে নতুন সাজে
মাসুমা খাতুন শাম্মী। পান্থপথে নিজেদের বাড়ির চতুর্থ তলায় ছোট পরিসরে ২০১৪ সালে তিন-চারজন কর্মী নিয়ে মাদল ফ্যাশন হাউজের যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে ভবনের প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলাজুড়েই মাদল ফ্যাশন হাউজ, মাদল ক্যাটারিং অ্যান্ড মাদল খাবার ঘর, মাদল কনভেনশন হল নিয়ে বড় পরিসরে মাদলের সম্ভার। আজকে মাদলের সাথে যুক্ত রয়েছে বেশ কয়েকজন তাঁতি, হস্তশিল্পী, মৃৎশিল্পী, কুটিরশিল্পী, পোশাক শিল্পী, কৃষক-খামারি ও সৃজনশীল গহনা শিল্পী। মাদল এখন কর্মসংস্থানেরও মাধ্যম হয়েছে অনেক নারী-পুরুষের। মাদল ফ্যাশন হাউজে আছে সাধ ও সাধ্যের মধ্যে দেশীয় রঙবেরঙের শাড়ি, নারী-পুরুষ ও শিশুদের পোশাক। নান্দনিকতার ছোঁয়ায় দেশীয় ঐতিহ্যের আর উপাদানের সংমিশ্রণে অ্যান্টিকসের গহনা। জুতা, ব্যাগ, নানা রকম দেশীয় উপাদানের কুটির ও হস্তশিল্প, গিফট আইটেম। আরো আছে, দেশীয় খাবারের ব্যবস্থা, কৃষিপণ্য সম্ভার। বৈশাখকে ঘিরে আমাদের নগর জীবনে যে রঙিন প্রাণের ছোঁয়া লাগে, সেই ছোঁয়ায় মাদলও সাজে নতুন রূপে, নতুন উদ্দীপনায়। মাদলের পসরায় যোগ হয় নতুন নতুন সব কালেকশন। নতুন এই সম্ভার নিয়ে ৫ বা ৬ এপ্রিল মাদলে বিশেষ বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। ক্রেতাদের সম্মুখে বৈশাখের আনুষঙ্গিক সব উপকরণ হাজির করা হয়। প্রচণ্ড গরমে, যানজটে, বাজারে ঠেলাঠেলি করে কেনাকাটায় বের হওয়া রিতিমতো যুদ্ধের পর্যায়ে পড়ে। একই জায়গা থেকে বৈশাখী কেনাকাটা করতে মাদলে রয়েছে সেই সুবিধা। নববর্ষ উপলক্ষে গেট টুগেদার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, কিংবা অফিস কলিগরা মিলে দিনটিতে কিছু সময় নিজেদের মতো করে উদযাপন করতে আসতে পারেন মাদল খাবার ঘরে, কিংবা মাদল কনভেনশন হলে বুকিং দিয়ে পুরো বৈশাখ মাসই আয়োজন করতে পারেন নিজেদের মতো করে পার্টি। এ ছাড়া দেশীয় খাবার, কৃষিপণ্য যা বাংলার ঐতিহ্য অনেকটাই শহরে পরিবেশে হারিয়ে যেতে বসেছে। সেগুলো ক্রেতারা অনায়াশে পেয়ে যাবেন মাদলে। পয়লা বৈশাখে থাকবে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবারের আয়োজন।
আমাদের সংস্কৃতিতে ১২ মাসে ১৩ পার্বণের ব্যাপারটি মিলেমিশে আছে। ১৩ পার্বণের কয়েকটি উৎসবের পাল্লা ঝুঁকে আছে ধর্মীয় আচার-আচরণের দিকে। বাকি সবগুলো উৎসব লোকজ চেতনার ওপর দাঁড়ানো। পয়লা বৈশাখ সে উৎসবের মধ্যে অন্যতম। বৈশাখজুড়েই মাদলের প্রচেষ্টা থাকে আধুনিক ও রুচিসম্মত করে উৎসবগুলোকে সবার কাছে তুলে ধরার।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.