আমাদের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব
আমাদের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব

আমাদের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব

সৈয়দ মুহম্মদ জুলকারনাইন

যেমন ’৭২ সালের সংবিধানে ছিল বাংলাদেশের মানুষ পরিচিত হবে বাঙালি হিসেবে। তখন বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মন বিবেক নাড়া দেয়। ৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র লারমা তখনই এর প্রতিবাদ করেন এবং পরবর্তীতে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হন। বাংলাদেশের ১০ ভাগের এক ভাগ নিয়ে পার্বত্য জেলার ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, মুরং, খিয়ং, তংচংগ্যা ও লুসাইসহ আরো কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাঙালি নয় বিধায় সেদিনের এ সিদ্ধান্ত তারা মেনে তো নেয়নি বরং পার্বত্যাঞ্চলের সাথে লাগোয়া ভারতের সহযোগিতা নিয়ে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এ সমস্যার মাধানের উদ্যোগ নেন জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে দেশের মানুষ গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পক্ষে রায় দেয়।

ইংল্যান্ড ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা প্রচার করলেও প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে মেনে নিয়েছে। জার্মানিতে সিডিইউ তথা ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট ইউনিয়ন ক্ষমতায় ছিল। বর্তমানেও সিএসইউ নামের ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ক্ষমতার অংশীদার। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও রাষ্ট্রধর্ম আছে। বিশ্বের অন্তত সাতটি দেশে বৌদ্ধ ধর্ম ও ১৫ দেশে খ্রিষ্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছে।

ভারত জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশের সংবিধান শাসনতন্ত্র নিয়ে কূটনীতি-রাজনীতি চালিয়ে আসছে। বর্তমানেও আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ভারতীয়রা সমালোচনায় মুখর। বিপিণ রাওয়াত যিনি ভারতের সেনাপ্রধান, গত মাসে চীন-পাক ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের কথা বলেছেন। ২০০৯ সালে ভারতের সাবেক সেনানায়ক শঙ্কর নারায়ণ চৌধুরী লিখেছিলেন- এবার বাংলাদেশকে ভারতের রাডারের মধ্যেই রাখতে হবে। ভাবটা এমন, যেন বাংলাদেশই ভারতের জন্য বড় সমস্যা।

কিন্তু নিজেদের বেলায় দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা। হিন্দু মহাসভা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ, শিবসেনা, বিজেপির মতো রাজনৈতিক দলেগুলো তো ক্ষমতায় আছেই, বরং ভারতীয় রাজনীতিতে প্রধান নিয়ামক হিসেবেও কাজ করছে। ২০১৭ সালের আগস্টে ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারী তার মেয়াদের শেষ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানেরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। কারণ, ভারতের বহুত্ববাদী বৈশিষ্ট্য বদলে গেছে। ওখানে হিন্দুস্থান নামটিতেই একটি ধর্মের অনুসারীদের দেশ বোঝায়। আবার ভারত নামটিও রামের সৎভাই ‘ভরত’-এর নামানুসারে রাখা। বিস্ময়ের কথা হচ্ছে, বর্তমানে আমরা কেমন হয়ে গেলাম! যেন অন্ধ, বধির বোবা। দিবালোকের মতো সত্য ঘটনার বিপক্ষে গিয়ে তবুও সব ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রতি সমান আচরণের কথায় ভারতের উদাহরণ দিই। ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানে থাকলে মানুষ শান্তিতে থাকবে, এটা বাস্তবসম্মত নয়। তার বহু প্রমাণ এ উপমহাদেশেই আছে। যদি আমরা মননে মগজে সর্বোপরি আল্লাহর নৈকট্য লাভের সোপান হিসেবে বুকে লালন করতে না পারি তাহলে শান্তি কোথায়?

৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ সালে ‘বাবরি মসজিদ’ ধ্বংস করার কথা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়িসহ মানবসম্পদ মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানতেন। ১৫২৮ সালে সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি যখন ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করেন, তখন কোনো মন্দির ভাঙার প্রমাণ মেলেনি। তবুও কি ওই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মসজিদটি রক্ষা পেয়েছিল? মসজিদের মিনার নিষিদ্ধ করা হয়েছে সুইজারল্যান্ডে। বেলজিয়াম ও ফ্রান্সে হিজাব বা বোরকা নিষিদ্ধ। শুধু আমাদের ভূখণ্ডে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করলে কেন সমস্যার সৃষ্টি হবে? কিছু অতি আধুনিক বুদ্ধিজীবী তাল মিলিয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে দেখা যায়, যা-বিদেশীদের খুশি করার প্রচেষ্টাই বটে। মহান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের কথা বললে, সংবিধানে সংযোজন হলে সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব হচ্ছে বলে কাহিনীর কথা সামনে নিয়ে আসা হয়। তবে শুধু আমার দেশে তো নয়, এ রকম ঘটছে পৃথিবীর বহু দেশে।

আমাদের নদীগুলোতে পানি আসতে দিচ্ছে না বড় দেশ ভারত। ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে ৪২টিতেই বাঁধ দিয়েছে ভারত। ফারাক্কা ব্যারাজ ও উজানে পানি শুষে নেয়ায় হেমন্তেই পদ্মাসহ ৩৬টি শাখা নদী শুকিয়ে মরা নদীতে পরিণত হচ্ছে। ’৯৬ সালের পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ী খরা মওসুমে ভারত বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেয়ার কথা। অথচ তখন পদ্মা ও তার শাখা-প্রশাখাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ৬০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ ছিল ৮০ হাজার কিউসেক। ৭৭ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি যে চুক্তি হয়েছিল তাতে পানির নিম্নতম প্রবাহ ধরা হয় ৫৫ হাজার কিউসেক। কিন্তু ভারত একতরফা পানি অপসারণ করার ফলে ক্রমান্বয়ে পানিপ্রবাহের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। তিস্তা নদী আজ পানিশূন্য। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খরস্রোতা, ভরাযৌবনা ‘তিস্তা’ মৃতপ্রায়। বিশাল রংপুর বিভাগের অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি পরিবেশ সব কিছুই নির্ভর করে এ নদীর পানিপ্রবাহের ওপর। আমাদের দুঃখ, তিস্তার বুকে ধুধু বালুচরের মূলে হচ্ছে ভারতের কুচবিহার জেলার গজলডোবায় নির্মিত বাঁধ।

যার ফলে ‘তিস্তা ব্যারাজ’ অকার্যকর হয়ে গেছে। দক্ষিণ তালপট্টি ভারত দাবি করছে। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের অবমাননা করা হচ্ছে। বিএসএফ বাংলাদেশের বহু নাগরিককে হত্যা করেছে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক দেশের উঁচু, সমতল বা পাহাড়ি এলাকায় সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, আসা-যাওয়া, বসবাস ও প্রয়োজনে জনসমাগম করতে পারে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশের নাগরিক বা সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য থাকতে পারবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে এটিই স্বাভাবিক। তাতে অন্য দেশের কোনো সংগঠন বা সরকার কী করে, কোন অধিকারে বিবৃতি দেয় কিংবা নিন্দা জানানোর মতো ন্যক্কারজনক কাজ করে বোধগম্য নয়। বিশ্বসংস্থা জাতিসঙ্ঘের হস্তক্ষেপ কামনা করাও অযৌক্তিক। ২০১০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়িদের সাথে বাংলাদেশের সমতল থেকে আসা অধিবাসীদের মধ্যে খুবই দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। তার ওপর ভিত্তি করে নয়াদিল্লিভিত্তিক সংগঠন এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস আমাদের গর্বের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ এনে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। একইভাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। এটা অবশ্যই কূটনীতির নিয়মবহির্ভূত। টিপাইমুখ নিয়ে নিয়মবহির্ভূত বক্তব্য তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জনও দিয়েছিলেন আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষিত মহলকে উদ্দেশ্য করে। ভারতীয় সাংবাদিকেরা বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনেই অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন।

এ ধরনের কার্যকলাপে স্বাধীনতা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ উৎকণ্ঠায় থাকা স্বাভাবিক। আর পার্থক্যকরণটা আসে যে, বাঙালি এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কেন। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের সফলতা কী।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.