ads

ইলিশরে ইলিশ

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ না হলে প্রেসটিজ পাংচার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুতরাং এক হাজার টাকার একটা চকচকে নোট দিয়ে চান ভাইকে বাজারে পাঠাল তার বউ এবং এই বলে সতর্ক করে দিলোÑ ‘তুমি কিন্তু প্রতিবারই ঠকে আসো, এবার সাবধানে ইলিশ কিনবে।’
শুকনো ছাই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া গেলেও পিক পকেট হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া না বলে তিনি চকচকে হাজার টাকার নোট থাকা মানিব্যাগটি প্যান্টের পকেটে রাখেননি বরং শার্টের ভেতরের পকেটে রাখলেন। সব মাছের বাজারে সাড়ে তিনটা চক্কর দিলেন। একটা তাজা ইলিশের গায়ে আঙুলের টিপ দিলেন। ইলিশ হাঁ করে হেসে উঠল। বলল, ‘আরে চান ভাই, আপনার আশায় থাকতে থাকতে আমার জানটা তেনা তেনা হয়ে গেল। আমি আপনার বাড়ি যেতে চাই। আমায় নেবেন তো?’
চান ভাই একবার মাছের দিকে আরেকবার মাছ বিক্রেতার দিকে তাকালেন।
‘এই ইলিশটার দাম কত?’ জিজ্ঞেস করলেন চান ভাই।
বিক্রেতা পাঁচ হাজার টাকা দাম হাঁকাল। মাছের দাম শুনে চান ভাইয়ের মাথায় ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। মাথাটা সাত সাতবার ঘুরান্টি খেলো। তিনি ত্বরিত ১০০ হাত দূরে চলে গেলেন। দুরু দুরু বুকে আরো দু-এক দোকানে ইলিশের দাম জানতে চাইলেন। প্রতি ক্ষেত্রে দাম শুনে তিনি ‘বোবা চান’ হয়ে গেছেন। অবশেষে যখন তিনি হাঁটতে হাঁটতে কান্ত পরিশ্রান্ত, দাম শুনে শুনে তৃষ্ণার্ত, তখন তিনি নিরাশ বদনে সিদ্ধান্তে পৌঁছালেনÑ না, ইলিশের পরিবর্তে চেপা ভর্তা দিয়েই নববর্ষকে বরণ করতে হবে। তিনি বাজার থেকে বের হবেন এমন সময় একজন মাছ বিক্রেতা তাকে ডাকলেন, ‘এই যে ভাই, মাছ না নিয়েই চলে যাবেন? ভাই আসেন, অন্তত মাছটা দেখে যান। এক নম্বর মাছ। দামের সঙ্গে বাধবে না।’
চান ভাই মিটমিট করে তাকালেন। পা পা করে সামনে আগালেন। বললেন, ‘মাছের দা দাম!’
বিক্রেতা বললেন, ‘এক পিস শুধু আপনার জন্য মাত্র ৫০০ টাকা।’
‘৫০০ টাকা!’ চান ভাইয়ের মন-প্রাণ খুশিতে লাফ দিয়ে উঠল। চোখের কোণে আনন্দ-অশ্রু আসে আসে অবস্থা। এরপরই মনে কিঞ্চিত সন্দেহ সৃষ্টি হলো। তিনি বললেন, ‘আচ্ছা ভাই, এটা ইলিশ মাছ তো?’
বিক্রেতা ডানে বামে তাকালেন। বললেন, ‘ইলিশ মানে, এক্কেবারে খাঁটি ইলিশ।’
চান ভাই সন্দেহের চোখে পাশের দোকানে রাখা ইলিশের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘ওই ইলিশগুলোর গায়ের রঙের সাথে তো এগুলোর কোনো মিল নেই।’ বিক্রেতা বললেন, ‘আরে ভাই আপনি তো দেখনি কিছুই জানেন না। ওই যে দেখছেন ইলিশ। ওইগুলো হলো দেশী মানে পদ্মার ইলিশ আর আমার ইলিশ হলো ট্রাইগ্রিস নদীর ইলিশ, দেখছেন না কেমন ঝকঝক করছে।’
চান ভাই এখানে আর কথা বাড়ালেন না বরং দু’টি মাছ কিনে পা বাড়ালেন বাসার পথে। চান ভাই রিকশায় চেয়ে আছেন আর মনে মনে ভাবছেন, দেশী ইলিশ যেখানে সোনার দামে বিক্রি হচ্ছে সেখানে এই বিক্রেতা বিদেশী ইলিশ এত সস্তায় বিক্রি করে দিলো? লোকটা নিশ্চিত মাল খেয়েছে। এত সস্তায় বিদেশী ইলিশ দুটি বিক্রি করে দেয়ায় নিশ্চয়ই লোকটা তার বউয়ের বকা খাবে। সে যা-ই হোক আমি তো জিতলাম।
এই ভেবে চান ভাইয়ের মুখে স্মিত হাসি চলে এলো। হাসির ঢেউ তার হৃদয় ভেদ করে হাওয়ায়ও চলে এলো। রিকশাওয়ালা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘ভাইজানেই মনে অনেক সুখ মনে অয়। হাসি তো দেহি থামতেই চায় না।’
চান ভাই বললেন, ‘ঠিকই ধরেছ। আমার বউ বলে আমি নাকি বাজার করতে গিয়ে ঠকে আসি। কিন্তু আজ বউকে দেখিয়ে দেবো আমি শুধু ঠকিই না জিততেও জানি। যেখানে দেশী ইলিশ বিক্রি হচ্ছে সোনার দামে, সেখানে আমি এক হাজার টাকায় দুই-দুইটা ইলিশ কিনে ফেললাম। তাও আবার বিদেশী ইলিশ! টাইগ্রিস নদীর ইলিশ!’
তিনি সেই হাসি হাসি মুখেই বাসায় ঢুকলেন। মন যেখানে খুশিতে টগবগ করছে; সেখানে মুখে হাসি থাকবেই। চান ভাই বাসায় ঢুকেই চেঁচামেচি শুরু করে দিলেন, ‘কই গো লুবনার মা। পাশের বাসার ভাই-ভাবীকে খবর দাও। দেখো কী নিয়ে এসেছি। এবারের নববর্ষটা আমার জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে আসবে মনে হয়।’
পাশের বাসার ভাই-ভাবী এলো। চান ভাই মাছের মোড়ক উন্মোচন করলেন। বললেন, ‘বউ তুমি না বলেছিলে, আমি শুধু ঠকেই আসি কিন্তু এই দেখো, এক হাজার টাকায় দুই-দুইটা বিদেশী ইলিশ পেয়ে গেলাম।’
চান ভাইয়ের বউ মাছে নখ দিয়ে আঁচড় কাটল। এরপরই ঘটল গ্রেনেড বিস্ফোরণ! ‘হাঁদারাম, জনম কানা, সিলভার কার্প এনে বলছ বিদেশী ইলিশ!’
বউয়ের সাথে মৌন ও সরব সমর্থন জানাল পাশের বাসার ভাই-ভাবী। কিন্তু সহজে আত্মসমর্পণ করতে রাজি নন চান ভাই। তিন তলার লেবু মাছ ব্যবসায়ী। চান ভাই লেবুকে জরুরি তলব করলেন। লেবুও কালপ্রিটের মতো বউয়ের আবেদনের পক্ষে আঙুল উঠিয়ে দিলো। লেবুর এই প্রত্যক্ষ সমর্থনে এতিমের মতো অবস্থা চান ভাইয়ের। তিনি লেবুর কানে কানে বললেন, ‘ভাই, আপনার একটি কথায় বেঁচে যেতে পারে আমার মহামূল্যবান ইজ্জত। দরকার হলে খাসি জবাই করে আপনাকে খাওয়াব। তবু আমার মান-ইজ্জতে পানি ঢালবেন না।’
লেবু চান ভাইয়ের ডান হাতে চিমটি কাটল। বলল, ‘মাছটা আমি ভালো করে পরীক্ষা করি তো। সে এবার সফদার ডাক্তারের ভূমিকায় অভিনয় শুরু করল। মাছের চোখে হাত বুলিয়ে দেখল। মুখ হাঁ করিয়ে বলল, ‘খাইছেরে।’
মাছের গা টিপেটিপে নিথর দেহের তাপমাত্রা মেপে বলল, ‘হুম!’
চান ভাই রিভিউয়ে জয়লাভ করেছেন। বল স্টাম্প মিছ করেছে। সুতরাং আমি আগে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হলাম। এটি আসলেই বিদেশী ইলিশ মাছ।’
মাছের জন্য খাসি কোরবানি দিয়ে এবারের মতো জিতে আবার হাসলেন চান ভাই। তবে এ হাসিতে আগের হাসির মতো প্রাণ ছিল না।

 

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.