নববর্ষ উৎসব লোক ও নগর সংস্কৃতি
নববর্ষ উৎসব লোক ও নগর সংস্কৃতি

নববর্ষ উৎসব লোক ও নগর সংস্কৃতি

ড. আশরাফ পিন্টু

উৎসবের আদি ইতিহাস অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায়- ‘উৎসব’ হলো বৈদিক ঋষিদের ‘সোমরস’ নিষ্কাশনের এক আনন্দ-উদ্বেল লোকাচার। ‘সোমরস’ বৈদিক সোম যজ্ঞানুষ্ঠানের অপরিহার্য অঙ্গ ছিল। কালক্রমে এ উৎসব শব্দের অর্থ বদলে গেছে। এখন উৎসব বলতে ধর্মীয় ও সামাজিক উভয় আনন্দানুষ্ঠানকেই বোঝায়। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের উৎসব রয়েছে। এগুলোকে ধর্মীয়. সামাজিক ও জাতীয় বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যায়। ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে মুসলমানদের দুই ঈদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা, চৈত্র সংক্রান্তি, খ্রিষ্টানদের বড়দিন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বুদ্ধ পূর্ণিমা ইত্যাদি। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এ উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি উৎসব। যা ওরা বাংলা নববর্ষের দিনেই পালন করে থাকে। জাতীয় উৎসবের মধ্যে আছে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদযাপন। আর সামাজিক বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে অন্যতম হলো বাংলা নববর্ষের উৎসব। এ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ. খ্রিষ্টান সম্প্রদায়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবসীরাও এ উৎসব পালন করে থাকে।

মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই ভারতবর্ষে নববর্ষ পালিত হতো। তখন সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।

ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে সম্রাট আকবর বাংলা সালের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার করার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সাল এবং আরবি সালের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সাল চালু করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়। তবে এ গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬ খ্রি:) থেকে। প্রথমে এ সালের নাম ছিল ফসলি সাল, পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

মূলত সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা মানে পুরাতন বইয়ের হিসেবের পাঠ চুকিয়ে নতুন হিসাব বই খোলা। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। বর্তমানে গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সব স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ ইংরেজি সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পয়লা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পয়লা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।

নববর্ষে উৎসব গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নববর্ষের দিন গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় বর্ণাঢ্য মেলা বসে। মেলায় বিভিন্ন লোকজ খাবার- খই, মুড়ি, বাতাসা এবং লোকজ খেলনা- যেমন মাটির তৈরি পুতুল, আম, কাঁঠাল, বাঁশের বাঁশি ইত্যাদি কেনাবেচায় সাধারণ মানুষ মুখর হয়ে ওঠে। এ ছাড়া, নাগরদোলা, পুতুলনাচ ইত্যাদি আনন্দ অনুষ্ঠানে নববর্ষের এ দিনটিতে ছোট-বড় সবাই আনন্দ মুখরিত হয়ে ওঠে। এই দিনেই শুরু হয় ব্যবসায়ীদের ঐতিহ্যবাহী শুভ হালখাতা। প্রতিটি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানেই ক্রেতাদের মিষ্টান্ন সহযোগে আপ্যায়ন করা হয়। মূলত নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, বিভিন্ন লোকশিল্পজাত পণ্য, মৃৎল্পিজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এ মেলায় বিনোদনের জন্য বাউল শিল্পী বা বয়াতিদের উপস্থিতি থাকেন। তারা পালাগান, জারিগান, কবিগান ও মুর্শিদিগানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক গান পরিবেশন করে দর্শকদের আনন্দ দিয়ে থাকেন। এর ফলে এই মেলা বাঙালিদের কাছে সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়।

বর্তমানে নাগরিক জীবনেও লোক ও নগর-সংস্কৃতির মিশ্রণে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষের উৎসব পালিত হয়ে থাকে। শহরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের বটমূলে নববর্ষকে স্বাগত জানাতে শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করে থাকেন। এ দিন সকল বয়সের পুরুষেরা পাজামা-পাঞ্জাবি, নারীরা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, হাতে চুড়ি, খোঁপায় ফুল, গলায় ফুলের মালা এবং কপালে টিপ পরে। বর্তমানে ইলিশের দুর্মূল্য হলেও শহরে সকলে একসাথে বসে পান্তা-ইলিশ খাওয়া একটা বিশেষ ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

নববর্ষের উৎসব সর্বজনীন হলেও বর্তমানে উৎসবের গায়ে যুগ পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট। উৎসব যেখানে অনাবিল হৃদয় আবেগের প্রাধান্য ছিল, ছিল প্রীতিময়তা, সেখানে কৃত্রিমতা তাকে গ্রাস করেছে। হৃদয়হীন আচার-অনুষ্ঠান আর চোখ-ঝলসানো চাকচিক্য আজ উৎসবের বৈশিষ্ট্য। নগর সভ্যতার যান্ত্রিকতায় আজ আমাদের হৃদয়-ঐশ্বর্য লুণ্ঠিত। তাই উৎসবের মহতী কল্যাণী রূপটি কালো পর্দায় আচ্ছন্ন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘‘প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন একাকী। কিন্তু উৎসবের দিন মানুষ বৃহৎ, সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ...।’ আমরা যেন এই বৃহৎ হৃদয়ের অধিকারী হয়ে চিরায়ত লোকসংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে সর্বজনীন নববর্ষ উৎসব পালন করতে পারি -এটাই কাম্য।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.