ads

ইসলামের দৃষ্টিতে নববর্ষ

ড. মোহাম্মদ আতীকুর রহমান

প্রতি বছরই বাংলার ঘরে ঘরে আসে পয়লা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ। এ দিনটি বিশেষ উৎসব হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের কাছে নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। নববর্ষ, বর্ষবরণ, পয়লা বৈশাখÑ এ শব্দগুলো বাংলা নতুন বছরের আগমন উপলে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। বর্তমানে অতি উৎসাহী কিছু ব্যক্তি আনন্দ উৎসবের নামে বেপর্দা, বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা, মাতলামি করে এ দিনটিকে কলুষিত করছে। যা ইসলাম এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে চরম অন্যায় হিসেবে বিবেচিত।

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস : হিন্দু সৌরপঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারো মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌরপঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। হিন্দু সৌরবছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়– এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পালিত হতো। তৎকালীন সময়ে নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।
ভারতবর্ষে মুগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটেরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের ল্েয মুগল সম্রাট জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করে প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার রাজস্ব কর্মকর্তা আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন।
১৫৮৪ সালের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনাপদ্ধতি কার্যকর করা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পয়লা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। এর পর থেকে মুঘলরা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পয়লা বৈশাখ পালন করতেন। সে সময় বাংলার কৃষকরা বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীদের সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পরদিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়।
একই ধারাবাহিকতায় ১৬০৮ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি ঢাকাকে যখন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন, তখন থেকেই রাজস্ব আদায় ও ব্যবসায় বাণিজ্যের হিসাব-নিকাশ শুরু করার জন্য বাংলা বছরের পয়লা বৈশাখকে উৎসবের দিন হিসেবে পালন শুরু করেন।
ঐতিহাসিক তথ্যে আছে যে, সম্রাট আকবরের অনুকরণে সুবেদার ইসলাম চিশতি তার বাসভবনের সামনে সব প্রজার শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ এবং বৈশাখী উৎসব পালন করতেন। সেখানে সরকারি সুবেদার থেকে শুরু করে জমিদার, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত থাকতেন। প্রজারা খাজনা নিয়ে আসত, সে উপলে সেখানে খাজনা আদায় ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি চলত মেলায় গান-বাজনা, গরু-মোষের লড়াই, কাবাডি খেলা ও হালখাতা অনুষ্ঠান। পরে ঢাকা শহরে মিটফোর্ডের নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারিবাড়ি, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ঢাকার নবাবদের আহসান মঞ্জিল, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউজ, পাটুয়াটুলির জমিদার ওয়াইয়ের নীলকুঠির সামনে প্রতি পয়লা বৈশাখে রাজ পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো। প্রজারা নতুন জামা-কাপড় পরে জমিদারবাড়ি খাজনা দিতে আসত। জমিদারেরা আঙ্গিনায় নেমে এসে প্রজাদের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। সবশেষে ভোজনপর্ব দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হতো। কালের বিবর্তনে নববর্ষের সাথে সম্পর্কিত অনেক পুরনো উৎসবের বিলুপ্তি ঘটেছে, আর সংযোগ ঘটেছে নতুন নতুন উৎসবের।

ইসলামের দৃষ্টিতে পয়লা বৈশাখ : ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম পার্থিব জীবনকে পরকালীন জীবনের শস্যত্রে হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ইসলাম আনন্দ ফুর্তি করার নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু তার সীমারেখা টেনে দিয়েছে। ইসলাম শান্তির কথা বলেছে, কিন্তু অশান্তি সৃষ্টি করা হতে বিরত থাকতে বলেছে। ইসলাম শালীনতার কথা বলেছে, কিন্তু অশালীনতা হতে বিরত থাকতে বলেছে। এক কথায়, মানুষের অমঙ্গল হয় এমন প্রতিটি কাজ থেকেই বিরত থাকতে বলেছে ইসলাম। বাংলাদেশে প্রতি বছর মহা ধুমধামে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হচ্ছে। পরিতাপের বিষয়, পয়লা বৈশাখ উদযাপনের নামে আনন্দ ফুর্তি ক্রমেই যেন সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে।

শেষ কথা : পয়লা বৈশাখ বাংলার আপামর জনসাধারণের কাছে একটি উৎসবের দিন হিসেবে পরিগণিত। উদযাপনের জন্য সরকার দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। মুসলিম ভাইবোন প্রত্যেকের স্মরণ রাখা উচিত, এ জীবনই শেষ নয়, এর পরও অপর আরেক জীবনের মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। সে জীবনকে সামনে রেখেই আবর্তিত হোক আমাদের আনন্দ ফুর্তি।
লেখক : গবেষক

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.