মেরাজ একটি বিস্ময়কর ঘটনা

প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী

মেরাজ রাসূল সা:-এর জীবনে এক বিস্ময়কর ঘটনা। এক রাতে মসজিদুল হারাম থেকে দূরবর্তী মসজিদুল আকসা গমন এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বালোকে আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন, বেহেশত-দোজখ অবলোকনসহ আবার রাতেই ফিরে আসাÑ যা অতীতে কখনো কারো দ্বারা ঘটেনি বা কেউ দাবিও করেনি; সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু অসম্ভব নয়। অসম্ভব নয় এই কারণে যে, কাজটি ঘটিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা, যাঁর কাছে সম্ভব-অসম্ভব প্রশ্ন একবারেই অবান্তর। তিনি বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত (সেই আল্লাহ তায়ালা), যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসায় নিয়ে গেলেন, যার পারিপার্শ্বিকতাকে তিনি আগেই বরকতপূর্ণ করে রেখেছিলেন, যেন তিনি তাকে তাঁর কিছু নিদর্শন দেখাতে পারেন, মূলত তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বস্রষ্টা। কুরআন মজিদে এতটুকুই বলা হয়েছে এবং হাদিসে অতিরিক্ত যা আছে তা কুরআনেরই পরিপূরক। অন্তত ২৫ জন সাহাবি মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মেরাজ স্বপ্নযোগে নয়, বরং সশরীরেই সংঘটিত হয়েছে বলে রাসূল সা: মেরাজ থেকে ফিরে এসে ঘোষণা করলে আরবের কাফির-মুশরিকরা রাসূল সা:-এর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেয়। এ ঘটনায় অনেক দুর্বল ঈমানদারের ঈমান নড়বড়ে হয়ে যায়। কাফিররা রাসূল সা:-এর নবুয়ত দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করার একটা মোম সুযোগ হিসেবে এটাকে গ্রহণ করে এবং তারা আবু বকর রা:সহ নেতৃস্থানীয়দের ডেকে এনে রাসূল সা:-কে গত রাতের ঘটনা বিবৃত করার জন্য আহ্বান জানায়। কোনো দ্বিধা-সঙ্কোচ ছাড়াই তিনি সবিস্তারে ঘটনা বর্ণনা করেন। কারণ নবী-রাসূলগণ সত্য প্রকাশে কখনো কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করেননি। আবু বকর রা: রাসূল সা:-এর মুখ থেকে ঘটনা শুনে তাৎণিক বলে উঠেন ঘটনা সত্য এবং আমি তা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। আল্লাহর নবী সা: তাঁকে সিদ্দিক উপাধিতে ভূষিত করেন। রাসূল সা: ইতঃপূর্বে কখনই বায়তুল মোকাদ্দাসে যাননি। কিন্তু আবু বকর রা:সহ সেখানে উপস্থিত অনেক মুরুব্বিস্থানীয় ব্যক্তি বায়তুল মোকাদ্দাসে গিয়েছিলেন। কাফিরদের মুখ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে আবু বকর রা: মসজিদে আকসার একটি বর্ণনা দানের জন্য রাসূল সা:-কে বলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীর সামনে মসজিদে আকসাকে তুলে ধরলে তিনি সবিস্তারে মসজিদের বর্ণনা দেন এবং সেখানে উপস্থিত লোকজনদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। তাতে সবাই নিশ্চুপ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া আল্লাহ তায়ালার ছুবহানাল্লাহ ও আবদ শব্দ চয়নেও বোঝা যায়, এটা সশরীরে ঘটে যাওয়া একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা।
আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক অসংখ্য নবী-রাসূলের মধ্যে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হলেন আমাদের প্রিয়তম নবী, সাইয়্যেদুল মুরসালিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব (তিনি তাঁর আপন রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন যাতে সব দ্বীনের ওপর একে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, যদিও শিরকবাদীরা মোটেই বরদাশত করবে না) দিয়েই এ জমিনে পাঠিয়েছেন। তাই যখনই তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, ‘হে দুনিয়ার মানুষ! তোমরা বলোÑ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে।’ এ ঘোষণার সাথে সাথে তাঁর আপন চাচা আবু লাহাবসহ আরবের মুশরিকরা প্রচণ্ড বিরোধিতা শুরু করে। অথচ এই আবু লাহাবই তার এতিম ভাতিজার জন্মের খবরে এত খুশি হয়েছিল যে, উট জবাই করে লোকদের খাইয়েছিল এবং যে দাসী এ শুভ সংবাদ তাকে দিয়েছিল তাকে সে মুক্ত করে দিয়েছিল। নবী ছিলেন তাঁর বংশ ও জাতির নয়নের মণি, সবার প্রিয়ভাজন ও আল-আমিন। তাদের বিবাদ-বিসংবাদের মীমাংসাকারী, তাদের ধন-সম্পদের আমানতদার এবং সব সৎ চারিত্রিক গুণের সমাহার ছিল তাঁর মধ্যে। অথচ দ্বীনের দাওয়াতের সাথে সাথে রাতারাতি তিনি জাতির ভয়ঙ্কর দুশমনে পরিণত হন। তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের সয়লাব হয়ে যায়। তিনি যা নন; তাঁকে তাই বলা হতে থাকে। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সান্ত্বনা দেনÑ ‘হে নবী! আমি জানি ওরা যে সব কথাবার্তা বলে তাতে তোমার বড়ই মনোকষ্ট হয়; কিন্তু জালেমরা তোমাকে নয়; আল্লাহর নিদর্শনকেই তারা অস্বীকার করে। এ অপপ্রচার শুধু সে সময়েই সীমাবদ্ধ নয়, আজও যারা নবীর উত্তরাধিকার হিসেবে দাওয়াতি দ্বীনের কাজ করে যাচ্ছেÑ সে সব বরেণ্য আলেম, ইসলামী চিন্তাবিদ ও ঈমানদারদের বিরুদ্ধে সীমাহীন অপপ্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছে। অত্যাচার-নির্যাতনে আল্লাহর রাসূল সা: ও তাঁর সাথীদের জীবন বিপণœ হয়ে পড়লে এক সময় সাহাবায়ে কেরামদের একটি অংশ আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে বাধ্য হন। এত জুলুম-নির্যাতনের মধ্যেও আল্লাহর রাসূল সা: ও তাঁর সাথীদের দাওয়াতি দ্বীনের কাজ অব্যাহত থাকে। জুলুম-নির্যাতনে পরম ধৈর্য অবলম্বনের তাগিদ আসে আল্লাহর প থেকে। হামলার পরিবর্তে কোনো হামলা নয় বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনো গোপনে প্রতিশোধও নয়, কেবল নীরবে সয়ে যাওয়া ও আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করাই ছিল মুমিনদের দায়িত্ব।
সে সময়ে আরবের প্রত্যেক গোত্র থেকে কিছু সৎস্বভাবসম্পন্ন মানুষ আল্লাহর দ্বীন কবুল করে রাসূলের জামাতে শরিক হন। এরই মধ্যে মদিনার আওজ ও খাজরাজ গোত্রের বেশ প্রভাবশালী কিছু লোক ইসলাম কবুল করে রাসূল সা:-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানান এবং সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। হিজরতের এক বছর আগে নিপীড়ন-নির্যাতনের চরম মুহূর্তে রাসূল সা:-এর জীবনে বিস্ময়কর ঘটনা মেরাজ সংঘটিত হয়। যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে এ দুনিয়াতে পাঠান তা পূর্ণতা লাভের সময় ঘনিয়ে আসার আগে আল্লাহ তাঁর নবীকে সৃষ্টির অনেক নিদর্শনাবলি প্রত্য করান এবং তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতসহ একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার ল্েয ১৪টি মূলনীতি প্রদান করেন, যা মেরাজ থেকে ফিরে এসে জনসমে তিনি (সূরা বনি-ইসরাইল) পেশ করেন। এর এক বছর পরই তাঁকে হিজরতের জন্য নির্দেশ দেয়া হয় এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে রাষ্ট্রশক্তি চাওয়ার জন্য তাঁকে বলা হয়। কুরআনের বাণী-আর দোয়া করো : ‘হে আমার পরওয়ারদিগার! আমাকে যেখানেই তুমি নিয়ে যাও সত্যতার সাথে নিয়ে যাও এবং যেখান থেকেই বের করো সত্যতার সাথে বের করো এবং তোমার প থেকে একটি কর্তৃত্বশীল পরাক্রান্ত শক্তিকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও।’ অর্থাৎ তুমি নিজেই আমাকে কর্তৃত্ব ও মতা দান করো অথবা কোনো রাষ্ট্রমতাকে আমার সাহায্যকারী বানিয়ে দাও, যাতে তার মতা ব্যবহার করে আমি দুনিয়ার বিকৃত ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করতে পারি, অশ্লীলতা ও পাপের সয়লাব রুখে দিতে পারি এবং তোমার ন্যায় বিধান জারি করতে সম হই। আল্লাহ পাকের সাহায্যে রাসূল সা: যে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন তার মৌলনীতি (রাজনীতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনীতিক ও পারিবারিক) তিনি সে সময়ে সবিস্তারে পেশ করেন।
১. তোমার রব আদেশ করেছেন, তাঁকে বাদ দিয়ে তোমরা আর কারো ইবাদত করো না।
২. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো; তাঁদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তাঁদেরকে কখনো ‘উহ!’ (বিরক্তিসূচক) পর্যন্ত বলো না এবং কখনো তাঁদেরকে ধমক দিও না; তাঁদের সাথে সম্মানজনক ও ভদ্রজনোচিত কথা বলো। অনুকম্পায় তুমি তাঁদের প্রতি বিনয়াবনত থেকো এবং বলো, ‘হে আমার রব, তাঁদের প্রতি ঠিক সেভাবেই তুমি দয়া করো, যেমনি করে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।
৩. আত্মীয়স্বজনকে তাদের পাওনা আদায় করে দেবে, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরদেরকেও।
৪. কখনো অপব্যয় করো না। অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের বড় অকৃতজ্ঞ।
৫. তুমি যদি তাদের (অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজন, মিসকিন ও সম্বলহীন পথিক) থেকে পাশ কেটে থাকতে চাও এ কারণে যে, তুমি তোমার রবের যে রহমত পাওয়ার আকাক্সক্ষী তা এখনো তালাশ করছ, তবে তাদেরকে বিনয়সূচক জবাব দাও।
৬. নিজেদের হাত গলার সাথে বেঁধে রেখো না, আবার একেবারে খোলাও ছেড়ে দিও নাÑ তাহলে তোমরা তিরস্কৃত ও অম হয়ে পড়বে। তোমার রব যার জন্য চান রিজিক প্রশস্ত করে দেন, আর যার জন্য চান রিজিক সঙ্কীর্ণ করে দেন। তিনি তাঁর বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল আছেন ও তাদের দেখছেন।
৭. দারিদ্র্যের ভয়ে নিজের সন্তানদের হত্যা করো না। আমরা তাদের রিজিক দেবো এবং তোমাদেরকেও। বস্তুত তাদের হত্যা করা একটি বড় ভুল।
৮. জিনার নিকটেও যেও না। তা অত্যন্ত খারাপ কাজ, আর তা অতীব নিকৃষ্ট পথ।
৯. প্রাণ হত্যার অপরাধ করো না, যাকে আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেনÑ কিন্তু সত্যতা সহকারে। আর যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে, তার ওলিকে আমরা কিসাস দাবি করার অধিকার দান করেছি। অতএব হত্যার ব্যাপারে যেন সীমালঙ্ঘন না করে। তাকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে।
১০. এতিমের ধনমালের কাছেও যেও না; কিন্তু অতি উত্তম পন্থায়, যত দিনে না সে তার যৌবন লাভ করে।
১১. ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি রা করবে। ওয়াদা-প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
১২. পাত্র দিয়ে মাপ দিলে পুরোপুরি ভর্তি করে দেবে। আর ওজন করে দিলে ত্রুটিহীন পাল্লা দ্বারা ওজন করে দেবে। যা খুবই ভালো নীতি ও পরিণামের দৃষ্টিতে অতীব উত্তম।
১৩. এমন কোনো জিনিসের পেছনে লেগো না, যে বিষয়ের কোনো জ্ঞান তোমার নেই। নিশ্চিত জেন চু, কান ও দিল সব কিছুকেই জবাবদিহি করতে হবে।
১৪. জমিনে বাহাদুরি করে চলো না। তোমরা না জমিনকে দীর্ণ করতে পারবে আর না পর্বতের ন্যায় উচ্চতা লাভ করতে পারবে।
রাসূল সা: প্রতিষ্ঠিত মদিনার রাষ্ট্রটি মূলত এসব মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত একটি কল্যাণ রাষ্ট্র ছিল। সব শ্রেণীর মানুষ পূর্ণনিরাপত্তার সাথে সে রাষ্ট্রে বসবাস করেছেন।
লেখক : শিক্ষাবিদ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.