ads

ম্যাক্সিম গোর্কি বিশ্বনন্দিত সাহিত্যিক

হিমেল আহমেদ

একটি মাত্র উপন্যাস লিখেই যিনি বিশ্ব তোলপাড় করে দিয়েছেন এমন লেখকদের সংখ্যা খুবই কম। ম্যাক্সিম গোর্কি রুশ সাহিত্যিক, যার মা উপন্যাস আজো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। ১৮৯২ সালে নিঝনিনভোগদের শ্রমিক আলেক্সি পেশকভ যখন ম্যাক্সিম গোর্কি ছদ্মনামে প্রথম গল্প লেখেন, তার বয়স মাত্র চব্বিশ। অল্প বয়সে সাহিত্যের মেধা মননে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির জন্ম খুব কমই হয়েছে। লেখকের বিচিত্র জীবন ও জীবিকার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মঞ্চে যে রু, তিক্ত ও সুগভীর অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, বিশ্বের খুব কম লেখকের ভাগ্যেই তা ঘটে। লেখালেখির কারণ জানতে চাওয়ায় তিনি বলেছিলেন, মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে প্রবল করে তোলার জন্য লিখি। আরও বলেছিলেন, কঠোর বাস্তবতা ও তার সব ধরনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে বিদ্রোহী করে তোলার সংগ্রামে নিজেকে প্রত্যভাবে লিপ্ত করার জন্য হাতে কলম তুলে নিয়েছি। বিখ্যাত এই কথাশিল্পী বাল্যকাল থেকেই অন্যায় অবিচারের শিকার হয়েছেন বলেই প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন ছোটবেলা থেকেই। রুশ এই সাহিত্যিক রাশিয়ার ভোলগা নদীর তীরবর্তী শহরে ১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকালেই গোর্কি পিতাকে হারান, যখন তার বয়স মাত্র চার বছর। নানা-নানীর আশ্রয়ে পিতৃহীন বালকটিকে স্কুলে ভর্তি করানো হলেও তা আর বেশিদূর এগোয়নি। এরই মধ্যে মায়ের বিয়ে হয়ে যায় অন্যত্র। নানী তাকে প্রায়ই মারধর করতেন। এমন পরিস্থিতিতে এগারো বছর বয়সে মাকেও হারান। মাকে হারানোর পর বাড়ি থেকে পালিয়ে যান তিনি। মাত্র ১৬ বছর বয়সে চলে যান কাজান শহরে। চার বছর সেখানেই অবস্থান করেন। পেয়ে যান কিছু বন্ধুবান্ধব, যাদের সংস্পর্শে তার স্বপ্রণোদিত শিা অর্জন উৎসাহিত হতে থাকে। পড়তে থাকেন রুশ সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের রচনা। বাদ যায়নি সৃজনশীল সাহিত্য, দর্শন ও বিশ্বসাহিত্য। ১৮৮৮ থেকে ৯২ পর্যন্ত তিনি হেঁটে ঘুরে বেড়ালেন রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কাজ করলেন আর ঘুরতে থাকলেন। এমনি করে ভোলগা নদীর অববাহিকাজুড়ে বিশাল এলাকার মানুষ এবং তাদের সমাজ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আচরণ, অভ্যাস ইত্যাদি ব্যাপারে প্রত্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এর আগে ১৯ বছর বয়সে দুই-দুইবার আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টাও চালান। সে অপরাধে তাকে অবশ্য শাস্তিও পেতে হয়েছিল। জীবনের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা তার বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল! বাস্তবমুখর জীবনের প্রতি ধাপে তিনি কষ্টকে, পরিশ্রমকে বন্ধুর মতোই নিত্য সঙ্গী হিসেবে দেখেছেন। তার এই সময়কার জীবনে অভিজ্ঞতার কাহিনী অবলম্বনে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প ‘ছাব্বিশজন লোক আর একটি রুটি’। কারখানায় কাজ করার সময় পুলিশের সন্দেহ পড়েছিল তার ওপর। সুকৌশলে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতেন গোর্কি। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে করতে মনের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ব্যক্তি হিসেবে সৎ ছিলেন গোর্কি কিন্তু তার ওপর যখন সন্দেহ, অবিশ্বাস; নিজের ওপরেই সব বিশ্বাসটুকু হারিয়ে ফেলেছিলেন এই সাহিত্যিক। তাই বেছে নিয়েছিলেন আত্মহত্যার পথ। কিন্তু সময়ের অন্য কিছু ইচ্ছা ছিল! তাই তার আত্মহত্যার চেষ্টা বিফলে যায়। ১৮৯৮ সালে পিটাসবুর্গ থেকে তার প্রথম গ্রন্থ ‘ওচের্কি ই রাস্কাজি’ (নকশা ও গল্পাবলি) দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
গোর্কির এই প্রথমপর্বের লেখায় এক দিকে আমরা দেখেছি সরল মানবিকতা, শ্রমিক, ভবঘুুরে, রাশিয়ার জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের দুঃখ-যন্ত্রণা, বঞ্চনা, হতাশা ও শোষণের ছবি, অন্য দিকে মালিক, ব্যবসায়ী, বিত্তবানদের স্থূল, লোভী ও সর্বগ্রাসী লুট ও মতার চিত্র। এই চরিত্রগুলো গোর্কি এত গভীর ও আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, নাটক, উপন্যাস ও গল্পে তা জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এর আগেই পত্র-পত্রিকায় অনেক গল্প প্রকাশ হয়। এর মধ্যে ‘পেসনিয়া আ সোকলে’ ও ‘পেসনিয়া আ বুরেভিয়েনিকে’ (যথাক্রমে বাজপাখির গান ও ঝড়ো পাখির গান) নামে দুটি কবিতা তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল। ১৮৯৫-এ তার বিখ্যাত ‘চেলকাশ’ গল্পটি এক দৈনিকে প্রকাশ হওয়ার পর আলোড়ন পড়ে যায়। সেই সুবাদে সামারার এক বড় পত্রিকায় চাকরির সুযোগ পেয়ে যান। তখন তিনি ঠিক করেন, চাকরি করবেন এবং পাশাপাশি লেখা চালিয়ে যাবেন। ম্যাক্সিম গোর্কি অবশ্য পরবর্তীতে ১৯১৫-এ ‘লিয়েতপিস্’ (কড়চা) পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং তার ছয় বছর পর ১৯২১ থেকে তার সম্পাদনায় সোভিয়েত সাহিত্য পত্রিকা ‘ক্রাস্নায়া নোফ্’ (রক্তিম জমি) প্রকাশিত হতে থাকে। তার লেখা মা উপন্যাস রাশিয়া পেরিয়ে বিশ্ব দখল করে নেয়। অনেকের ধারণা মতে বিশ্বের সবচেয়ে পঠিত ও বিক্রীত উপন্যাস হলো ম্যাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসটি। শুধু সাহিত্যে অবদান রেখেছেন তা নয়। রাজনীতিতেও জড়িত ছিলেন এই সাহিত্যসম্রাট। রুশ বিপ্লবেও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে ম্যাক্সিম গোর্কির। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ম্যাক্সিম গোর্কি আকস্মিক মারা যান। দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নিয়েও রোগমুক্তি মেলেনি তার। গোর্কিভক্তরা তার এই মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। অনেকের ধারণা এটি হত্যা ছিল। রাশিয়ার মতায় থাকা লেলিন বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিলেন গোর্কিকে এমনটা সন্দেহ করেন অনেকে। ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যু স্বাভাবিক নাকি হত্যা এই রহস্য আজো অজানা। কিন্তু তিনি যুগ যুগ ধরে বিশ্বের অন্যতম সাহিত্যসম্রাট হয়ে এখনো কোটি ভক্তের হৃদয়ে স্থান করে আছেন।

 

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.