আবার এলো পয়লা বৈশাখ

মাহমুদ শাহ কোরেশী

আবার এলো পয়লা বৈশাখ! বাংলা নববর্ষ! আনন্দমুখর একটি উৎসবের দিন উদযাপনের জন্য বাঙালি সঙ্কল্পবদ্ধ। চলছে নানারকম প্রস্তুতি। আবহমান কাল থেকে চলে আসছে এর আমেজ। ক্রমে বেড়েছে এর গতি ও প্রকৃতি মেলা, গান, নাটক আর ইদানীং নানা বিকট মূর্তির মিছিল। যার যেমন অভিরুচি!

কিন্তু আমাদের কবি-সাহিত্যিকেরা বহুকাল থেকে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বাঙালির ভাষার প্রতি দায়িত্ববোধের কথা। তবে সেটা যেন শুধু ‘অমর একুশে’ থেকে পয়লা বৈশাখ। বড় জোর পঁচিশে বৈশাখ কিংবা এগারোই জ্যৈষ্ঠের ব্যাপার! এরপর আর বাংলা ভাষা চর্চা যেন খুব একটা প্রয়োজনীয় বিষয় নয়। এর চেয়ে প্রয়োজনীয় বহু বিষয় রয়েছে। রয়েছে ভুলে ভর্তি ইংরেজি ‘সাইনবোর্ড’ দিয়ে দোকান সাজানোর ব্যাপার। বাংলাটা যেন শুধু কিছু কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকের কালক্ষেপণের জন্য। সাধারণভাবে এখনো এই বোধটা জাতির চিত্তে জাগছে না- বাংলা আমার মাতৃভাষা, বাংলা আমার রাষ্ট্রভাষা। সুতরাং আমাদের উপযুক্তভাবে এর চর্চা করতে হবে। এতে শিক্ষিত হতে হবে। ইংরেজি বা অন্য কোনো বিদেশী ভাষায় আমি প্রশিক্ষিত হতে পারি, দক্ষ হতে পারি সেটা হবে আমার অতিরিক্ত অর্জন। কিন্তু নিজের গোড়া শক্ত করতে হবে নিজের ভাষায় যথাসাধ্য দক্ষতা অর্জন করে। এবং সেটা প্রকাশ পাবে কাজে-কর্মে, আলাপে-লেখা লেখিতে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় লাভের অব্যবহিত পর থেকে জাতীয় চৈতন্যে অগ্রবর্তী পদক্ষেপের লক্ষ্যে নানা চিন্তা-ভাবনা ও কর্মকাণ্ড লক্ষ্য গোচর হয়েছিল। কিন্তু বহু অহেতুক বিতর্ক আর দলাদলিতে কাজের কাজ খুব বেশি হয়নি। একেবারে যে হয়নি তাও কিন্তু নয়। কেননা বিতর্কের ফলাফল স্বরূপ কিছু নিশ্চিত বক্তব্য আমাদের ভাগ্যে জোটে। বাংলাদেশে যে এতটা স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তায় অধিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এটা বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হয়ে গেছে। অবশ্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা আমাদের প্রতিশ্রুত সাফল্য অর্জনে সক্ষম করেনি।

তা ছাড়া একবিংশ শতাব্দীর অনেকগুলো বছর অতিক্রম করে এলেও বিশ্বব্যাপী নানা আঞ্চলিক কোন্দল, অহেতুক যুদ্ধ-বিগ্রহ সাংস্কৃতিক পটভূমি নির্মাণের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুতিতে বাধাগ্রস্ত করেছে। ১৯৯৬ সালে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি জাজ শিরাক তার মন্ত্রগুরু অদ্রে মালরো অনুসরণে ‘সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমরা তাও কথার কথায় পর্যবসিত হতে দেখেছি।

বাংলাদেশে শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতি এক গোঁজামিলের রূপায়ণ হয়ে চলেছে। আমরা কিছুতেই সমন্বিত কিছু তৈরি করতে পারছি না। কথার ও অর্থের অপচয় হয়েই চলেছে।

অতএব, পূর্বকথায় ফিরে গিয়ে নববর্ষের শুভক্ষণে আমরা আবার আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের আন্তরিক অধ্যয়ন ও চর্চায় নিজেদের ব্রতী করব। বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবো। কিন্তু তার অহেতুক অনুকরণে নিজেদের ব্যস্ত করে তুলব না। ভুলবো না আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি। আমাদের বর্ণাঢ্য অতীত। জীবনকে শুদ্ধ ও সুন্দর করে তুলতে হলে শেকড়ের পানে লক্ষ রাখতে হবে। পূর্বপুরুষের প্রদত্ত সম্পদ ও ঐতিহ্যনির্ভর হয়েই নিজেদের গড়ে তুলতে হবে।

অথচ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, চিন্তার বৈকল্য সহজেই চোখে পড়ে। পয়লা বৈশাখের জাতীয় চৈতন্যের সঙ্গে এর কোনো সাক্ষাৎ সম্পর্ক নেই। তাই নববর্ষে একান্তকাম্য: আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে দীক্ষা লাভ করব। আমরা আমাদের ভাষা ও ঐতিহ্যকে পালন করব। আমাদের বিশ্বমুখী মানসিকতা আত্মধ্বংসী বিরোধের জন্ম দেবে না। জীবনকে সমৃদ্ধ করবার বহু উপাদান আমরা এখানেই খুঁজে পাব।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.