ক্লীবদের চাঁদাবাজি

আত্মপক্ষ
এবনে গোলাম সামাদ

যাদের বলা হয় উভলিঙ্গ প্রাণী (Hermaphrodite), যেমন কেঁচো ও জোঁক, তাদের একই দেহে ডিম্বকোষ (ওভা) ও শুক্রকীট (স্পার্ম) উৎপন্ন হয়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে যাদের বলা হয় উভলিঙ্গ বা কীব, তাদের ক্ষেত্রে এ রকম কিছু ঘটে না। কীবদের দেহ বাহ্যিকভাবে দেখে উভলিঙ্গ মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তারা উভলিঙ্গ নয়। অনেকে কীবের দেহে ভেতরে ডিম্বাশয় থাকে কিন্তু থাকে না আনুষঙ্গিক জননাঙ্গ। তাই তারা ধারণ করতে পারে না সন্তান। অন্য দিকে অনেক কীবের দেহে থাকে শুক্রাশয়, কিন্তু তাদের দেহে থাকে না আনুষঙ্গিক পুরুষাঙ্গ। তাই তারা হতে পারে না সন্তানের জনক।
অনেক সময় অনেক পুরুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় নারী হওয়ার জন্য প্রবল বাসনা। এটাকে বলা চলে একধরনের মানসিক ব্যাধি। এরা মেয়েদের মতো সাজপোশাক পরতে চায়। কিন্তু কোনো পুরুষের পক্ষে সম্ভব হয় না নারী হওয়া। পাখিদের মধ্যে লিঙ্গ পরিবর্তনের কথা জানা আছে। জানা আছে, মুরগির মোরগ হয়ে যাওয়ার কথা। মুরগি মোরগ হয়ে গেলে তার মাথার ঝুঁটি হয়ে ওঠে মোরগেরই মতো। সে অন্য মুরগিদের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয় প্রকৃত মোরগেরই মতো। আর তার বীর্যে নিষিক্ত হয়ে উৎপন্ন হতে পারে মুরগির স্বাভাবিক ডিম। যাতে তা দিলে হতে পারে মুরগি অথবা মোরগ। মুরগি ও মোরগের দেহ থেকে কেটে ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয় সরিয়ে নেয়া চলে। এ রকম করলে মুরগি ও মোরগের চেহারার মধ্যে বড় রকমের কোনো পার্থক্য থাকে না।
মুরগি দেখতে হয়ে ওঠে কতকটা মোরগের মতো। কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে ঘটে উল্টো। যেমন ষাঁড়ের দেহ থেকে শুক্রাশয় সরিয়ে নিলে, অর্থাৎ পেরাই করলে, ষাঁড় পরিণত হয় বলদে। বলদ দেখতে হয় কতকটা গাভীর অনুরূপ। তার মধ্যে থাকে না দুর্দান্ত স্বভাব। তাই তাকে দিয়ে লাঙল টানানো ও গরুর গাড়ি চালানো হয় সহজসাধ্য। মানুষের মধ্যে কীবরা একসময় ছিল যথেষ্ট নিরীহ প্রকৃতির। কিন্তু এখন তাদের বলা যাচ্ছে না, বিশেষ করে বাংলাদেশে শান্ত প্রকৃতির। তারা এখন জোর করে করছে ‘চাঁদা’ আদায় স্বাভাবিক মানুষের কাছ থেকে। মানুষের চরিত্র কেবল তার অঙ্গ গঠনের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে সামাজিক পরিবেশেরও ওপর। ব্রিটিশ শাসনামলে কীবদের অত্যাচার ছিল না। কীবদের অত্যাচার ছিল না পাকিস্তান শাসন আমলেও। কিন্তু এখন যেহেতু সাধারণভাবেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, তাই শুরু হতে পেরেছে কীবদের জোরজবরদস্তি করে চাঁদাবাজি করার ঘটনা। সমাজ পরিস্থিতি বদলালে হতে পারবে এই অত্যাচারের অবসান। এটা অনুমান করা চলে।
কীবরা বোকা নয়। তারা সহজেই শিখতে পারে অনেক কাজ। তারা হতে পারে উচ্চশিক্ষিত। আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। অর্থাৎ প্রায় ৮০ বছর আগের কথা। আমাদের পাড়ায় ছিলেন একজন কীব। তিনি ছিলেন খুব ভালো রাজমিস্ত্রি। তিনি রাজমিস্ত্রি হিসেবে যা উপায় করতেন, তাতে ভালোভাবে চলত তার জীবন। রাজশাহীতে বহু কীব ছিল। এক কীবের পানের দোকান ছিল। তারা পান তৈরি করে বেচে জীবিকা নির্বাহ করত। চাঁদাবাজি ছিল না তাদের জীবিকার উপায়। কিছু কীব, যারা ছিলেন বিশেষভাবেই নারীদের মতো দেখতে, তারা হিন্দুদের পূজা-পার্বণে ও বিয়ে উৎসবে মেয়ে সেজে খেমটা নাচ নাচতেন। এই নাচ ছিল তাদের জীবিকার প্রধান উপায়। কিন্তু বর্তমানে এদের আচার-আচরণ গেছে বিশেষভাবেই বদলে।
আমি একটি পরিবারের কথা জানি। যে পরিবারে জন্মেছিলেন একজন কীব। কিন্তু ওই পরিবারে তাকে অবহেলা না করে অন্য সন্তানদের মতো উচ্চশিক্ষিত করে তোলা হয়। ওই পরিবারে ওই কীব সন্তান হন একজন নদী বিশেষজ্ঞ। তিনি পেতে পারেন উচ্চ সরকারি কর্ম। আমার মনে হয় কীব জন্মালে তাকে অবহেলা না করে তার মা-বাবা যদি অন্য সন্তানদের মতো প্রতিপালন করেন, তবে কীবরা হয়ে উঠতে পারে আমাদের সাধারণ সমাজজীবনেরই অংশ। একটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির অন্যতম মাপকাঠি হলো বেকার সংখ্যা কমা। আর এক কথায় কর্মসংস্থান বাড়া। কর্মসংস্থান বাড়ার একটা বাস্তব অর্থ দাঁড়ায় সম্পদ উৎপাদন বাড়ানো। চাঁদাবাজি বেকার সমস্যা কমায় না, সম্পদ উৎপাদন বাড়ায় না। এর ফলে যা হয়, তা হলোÑ একদল মানুষের আহার্য আর এক দল মানুষের উদরে যেতে পারা।
নয়া দিগন্তের চিঠিপত্র বিভাগে ১১ এপ্রিল ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি পত্র প্রকাশিত হয়েছে। পত্রটির শিরোনাম ‘হিজরাদের দৌরাত্ম্য’। পত্র লেখক হলেন মাহাবুবউদ্দিন চৌধুরী। আমি পত্র লেখকের সাথে সহমত পোষণ করি। তবে মনে করি, হিজড়াদের প্রতিপালন করার দায়িত্ব নিতে হবে, যে পরিবারে তার জন্ম সেই পরিবারকেই। আইন বিশেষজ্ঞ নই, তবে শুনেছি মুসলিম আইন অনুসারে কীবদের ধারা হয় কন্যাসন্তান হিসেবে। আর সেই অনুসারে উত্তরাধিকার সূত্রে সে পেতে পারে মা-বাবার সম্পত্তির অংশ। সে তার প্রাপ্ত অংশ আর কাউকে হেবা করে দিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটা হয় কি না তা আমার জানা নেই। আমি হিজড়া কথাটা ব্যবহার না করে সংস্কৃত কীব শব্দটা ব্যবহার করেছি। হিজড়া শব্দটা আমার কানে খারাপ শোনায়। হিজড়া শব্দটা বাংলা নয়; হিন্দি থেকে বাংলায় অনুপ্রবিষ্ট। মহাভারতে বলা হয়েছে অর্জুন একবার কীবের ছদ্মবেশ ধারণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, শত্রুপক্ষকে ফাঁকি দেয়ার জন্য।
বাংলাদেশে, প্রাচীন যুগে, বিশেষ করে পাল রাজাদের সময়, পাথর কেটে অনেক সুন্দর মূর্তি গড়া হয়েছে। এসব মূর্তির মধ্যে আছে অর্ধনারীশ্বর মূর্তি। যার একটি নমুনা সংরক্ষিত আছে রাজশাহী বরেন্দ্র মিউজিয়ামে। এই মূর্তিটির একটি পাশ নারীদেহের মতো, অপর পাশ পুরুষদেহের মতো। এই মূর্তিটি গড়া কেন হতো, তা আমার জানা নেই। তবে মূর্তিটির গড়নচাতুর্য অদ্ভুত। প্রাণিবিদ্যায় Gynandromorphs বলে একটা কথা আছে। এর বাংলা কী করা হয়েছে, আমার তা জানা নেই। তবে গাইনানড্রোমর্ফ বলতে বোঝায় এমন প্রাণী, যার শরীরের অর্ধেকটা হলো সেই প্রাণীর নারীদেহের মতো। আর অপর অর্ধেকটা হলো সেই প্রাণীর পুরুষদেহের মতো। পতঙ্গের মধ্যে এ রকম দেহধারী পতঙ্গ অনেক উৎপন্ন হতে দেখা যায়।
কিন্তু মানুষের মধ্যে এ রকম ঘটনা ঘটতে দেখা যায় না। কৃত্রিম উপায়ে শূকরের মধ্যে এ রকম শাবক উৎপন্ন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু যারা আমাদের দেশে বা অন্য দেশে কীব হিসেবে পরিচিত, তারা ঠিক এই রকম নয়। অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ছেলে এবং মেয়েদের প্রতিযোগিতা পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হয়। যাদের বলে কীব, তারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না। কারণ, তাদের ঠিক করা যায় না, পুরুষ না মহিলা। সাধারণভাবেই যাদের দেহকোষে দু’টি করে X ক্রোমোজোম থাকে, তাদেরই ধরা হয় প্রকৃত নারী। আর তারাই অংশ নিতে পারে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায়। কিছু কীবের দেহে থাকতে দেখা যায় XXY ক্রোমোজোম। এদের প্রকৃত নারী হিসেবে গণ্য করা হয় না। যদিও বাহ্যিকভাবে দেখে মনে হয় নারী। নারী আর পুরুষের মধ্যে একটি বড় পার্থক্য হিসেবে গণ্য করা হয় পেশিশক্তি। আমাদের দেশে কীবদের পেশিশক্তিকে মনে করা হতো কম। কিন্তু এখন তারা যথেষ্ট পেশিশক্তি প্রদর্শন করতে পারছে। এই পরিবর্তনটা কিভাবে ঘটতে পারল, সে ব্যাখ্যা আমার জানা নেই।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.