যে কারণে জাতি অভিশপ্ত

সময়-অসময়
তৈমূর আলম খন্দকার

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। মিথ্যা অর্থাৎ মিথ্যা কথা (খবর), মিথ্যা প্রতিবেদন, মিথ্যা মন্তব্য, মিথ্যা ঘোষণা, মিথ্যা আশ্বাস (False Commitment) প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে জাতির ভাগ্য এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পিতা পুত্রের সাথে, স্বামী স্ত্রীর সাথে, ছাত্র শিক্ষকের সাথে, কর্মকর্তা কর্মচারীর সাথে এবং ভাই ভাইয়ের সাথে মিথ্যা বলে। এমনকি রাষ্ট্রও নাগরিকদের সাথে এক ধরনের মিথ্যা বলে যাচ্ছে কোথাও প্রতিবেদন, কেথাও মন্তব্য, কোথাও ঘোষণার মাধ্যমে; কোথাও ইতিহাসকে রঞ্জিত ও অতিরঞ্জনের মাধ্যমে। মিথ্যার কশাঘাতে সংবিধানও ক্ষতবিক্ষত। নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচারের নিশ্চয়তা সংবিধানে প্রদান করা হলেও ‘মিথ্যার’ নিকট সব কিছুই জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। ‘নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন’ সংবিধান নিশ্চিত করলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন কতটা? আইনের শাসনের বাস্তব প্রতিফলন কী? জনগণ পাচ্ছে না ‘আইনের শাসন’, বরং ‘শাসকদের আইন’ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
আগে মামলার ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে মিথ্যা মামলা সৃজন করে নির্দোষ লোককে ফাঁসানো হতো। এখন ভৌতিক বা কাল্পনিক ঘটনার এজাহার দায়ের করে জেলহাজত, রিমান্ড প্রভৃতি প্রদান করা হয়। আগে মিথ্যা মামলার বাদি হতো সরকারের দলীয় লোকজন; এখন জেনেশুনে মিথ্যা মামলার বাদি হয় স্বয়ং পুলিশ। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ওপরের নির্দেশে করেছি।’ মামলার সারবস্তু মিথ্যা জানার পরও সে মিথ্যা মামলায় অগণিত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে জেলহাজত খাটানো হচ্ছে। ঘটনার আবর্তে প্রতীয়মান হয় যে, সরকারকে রক্ষা বা পুনর্নির্বাচিত করার দায়িত্ব পুলিশের পাশাপাশি প্রশাসন নিয়ে নিয়েছে। ইতঃপূর্বে হাইকোর্ট আগাম জামিন দিলে নি¤œ আদালত হাইকোর্টের আগাম জামিনকে সম্মান জানাতেন। বর্তমানে খুন বা স্বর্ণ চোরাচালান প্রভৃতি মামলায় ম্যাজিস্ট্রেটরা জামিন দিলেও রাজনৈতিক মামলায় হাইকোর্টে আগাম জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের জেলহাজতে নেয়া হয়। অর্থাৎ কৌশলে বেশি দিন হাজতে রাখার ফন্দি। জামিন দেয়া হবে নাÑ এ কথা মাথায় রেখেও জামিনের শুনানির জন্য লম্বা তারিখ দেয়া হচ্ছে, অতঃপর জামিন নামঞ্জুর। হাইকোর্ট যদি না থাকত তবে রাজনৈতিক মামলায় নেতাকর্মীদের নিঃশ্বাস নেয়া বন্ধ হয়ে যেত। মাদকাসহ দেশে শত ধরনের ক্রাইম হচ্ছে; কিন্তু তা নিধনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিধন করাই যেন সরকারের পাশাপাশি পুলিশ, প্রশাসন ও নিম্নআদালতের কাজ।
‘মৌলিক মানবাধিকার’ সংবিধান বারবার নিশ্চিত করলেও সংবিধানের ২৬ থেকে ৪৪ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত অনুচ্ছেদেপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার থেকে জনগণ কার্যত বঞ্চিত। এ কথাগুলো প্রধান বিচারপতিসহ সবাই জানেন এবং এটাও জানেন, জনগণ এ কারণে খুবই ক্ষুব্ধ। তারপরও পাবলিক পারসেপশনের দিকে না তাকিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করা হয়।
সঙ্গত কারণেই বীর বাঙালি গানে গানে বলতÑ ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে সেই জনতা।’ স্বেচ্ছাচারিতা অর্থাৎ আইনের শাসনের চেয়ে শাসকের শাসন যখন বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে নিরপেক্ষ আসনে আসীন রাষ্ট্রীয় চেয়ারগুলোও স্বৈরতন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে আজ সেই চিত্রই ফুটে উঠেছে। আদালত কোনো কর্মকাণ্ড দ্বারা বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি করতে পারেন না। যেমনÑ জামিন নামঞ্জুর করার আদেশ হওয়ার পর সই-মোহরি নকল পেতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীর উচ্চ আদালতে যেতে বিলম্ব হয়। এ ধরনের বহু ঘটনায় বিচারপ্রার্থী হয়রানির শিকার হন, বিচার বিভাগের অনিয়ম দেখার দায়িত্ব যার, তিনি এ সম্পর্কে নির্বাক। অথচ তার বিরুদ্ধে কিছু বলা বা সমালোচনা করা যাবে না, করলেই ‘আদালত অবমাননা’র মামলা।
জাতীয় জীবনে মিডিয়ার অনেক প্রভাব রয়েছে। মিডিয়া ইচ্ছা করলে কারো ভাবমূর্তি হিমালয়ের চূড়ায় নিতে পারে। অন্য দিকে, কাউকে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে পারে। পাঠক বা জনগণ চায় ঘটনার সঠিক চিত্র; কিন্তু সে প্রাপ্তি থেকেও জনগণ বঞ্চিত। বর্তমানে যার ১০টা ব্যবসা চলমান রয়েছে, হয়তো সে তার ব্যবসাগুলোর নিরাপত্তার জন্য ‘মিডিয়ার ব্যবসা’ও হাতে নিয়েছে। যে মিডিয়ার মালিক ভূমিদস্যুতার সাথে জড়িত, সেখানে ভূমিদস্যুতার খবর ভিন্নভাবে প্রচারিত হয়। ব্যাংক লুটের সাথে যারা জড়িত তাদের মালিকানাধীন মিডিয়ায় যা প্রচার করা হয়, তাতে প্রকৃত ঘটনার প্রতিফলন ঘটে না। ফলে সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয় জনগণ।
‘মিথ্যা’ যখন কোনো জাতিকে ঘিরে ফেলে তখন সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা জনগোষ্ঠী দ্বারা নির্যাতিত হয় সুবিধাবঞ্চিত লোকেরা, জনসংখ্যার দিক থেকে যাদের আধিক্য বেশি। মিথ্যা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সত্য বলা যায় না। অর্থাৎ গণতন্ত্র থাকে না। ভূমিদস্যুকে ভূমিদস্যু বলা যায় না, ব্যাংক লুটেরাকে ‘লুটেরা’ বলা যায় না। কারণ দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রকে তারাই নিয়ন্ত্রণ করে।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক ও জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রথীশ, তথা ‘বাবুসোনা’র হত্যার রহস্য যদি তার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের পরকীয়ার কাহিনীর মাধ্যমে উদঘাটিত না হতো; তবে যেভাবে মহাসড়ক বন্ধ করার হুমকি দেয়া হয়েছিল, তাতে বিএনপি ও ২০ দলের ওপর স্টিমরোলার চালানো সরকারের জন্য সহজ হয়ে যেত। প্রচার করা হচ্ছিল, জাপানি নাগরিক এবং মাজারের খাদেম হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং যুদ্ধাপরাধী মামলার সাক্ষী হওয়ার কারণে তাকে গুম করা হয়েছে। সে কারণেই গুমের মামলার তীর তাদের ওপর বর্ষিত হতো; যারা সরকারের নির্যাতনের টার্গেট। প্রচার-অপপ্রচার এত দ্রুতগতিতে ছড়ায়, যা রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং এ কারণেই মিথ্যার সাগরে জাতি নিমজ্জিত হচ্ছে। আবুল মনসুর আহমদ প্রণীত ‘ফুড কনফারেন্স’ নামক পুস্তকের ১২৪ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, ‘মিথ্যা কথার প্রচার দরকার নাই। কারণ মিথ্যা কথা নিজেই প্রচারিত হয়, বিশ্বাসও তা করে সকলেই এবং খুব সহজেই। সত্য কথা কেহ বিশ্বাস করতে চায় না। সত্য কথা যদি সহজ হয়, ব্যাপারটা আরো মুশকিল হয়ে যায়।’
প্রতিবাদবিহীন সমাজে মিথ্যা সহজেই বাসা বাঁধতে পারে এবং দিনে দিনে তা শিলাপাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। আমাদের সমাজের অবস্থা অনুরূপ। মানুষ কেন প্রতিবাদ করবে? প্রতিবাদকারীকে কেউ সহযোগিতা করা তো দূরের কথা, প্রকাশ্যে সমর্থন পর্যন্ত করতে চায় না। প্রভাবশালী ব্যক্তির অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে বিপদে ফেলে, গুম-খুন করে। নিয়োগকর্তার অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করলে চাকরি হারাতে হয়, সত্যের পথে থেকে নেতার বিরুদ্ধাচরণ করলে পদ-পদবি ও নমিনেশন হারাতে হয়; কখনো বা হক কথা বললে আর কিছু না হোক আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠবে। রাষ্ট্রযন্ত্রের অবিচার বা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে কথা বললে কাল্পনিক ঘটনা সৃষ্টি করে জেলে ভরে রাখে। এ অবস্থায় সত্যের পেছনে দাঁড়ানোর অবস্থা কোথায়? মানুষ যখন সত্য বলতে পারে না বা সত্য কথা শোনা বা বলার কোনো পরিস্থিতি থাকে না, তখনই হয় তাকে নীরব দর্শক হয়ে নতুবা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে। মানুষ যখন তার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করতে চায় এবং এ জন্য যখন কারো সমর্থন পাওয়া যায় না, তখন হতাশা তাকে ঘিরে ফেলে।
‘সত্য কথা’ অনেক নির্মম। এটা বলা বা শোনা বা হজম করা অনেক দুরূহ ব্যাপার, অথচ রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ প্রণীত ‘ফুড কনফারেন্স’ বইয়ের মর্ম মতেÑ ‘মিথ্যা কথা’ অনেক সহজেই প্রচার হয়ে যায় এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ জন্য কোনো শত্রু সাধারণত সৃষ্টি হয় না। সুখের নেশায় আমরা যা-ই করি না কেন, সব কিছুর মূলে রয়েছে ‘ভবিষ্যৎ বংশধরদের’ শান্তিতে রেখে যাওয়ার নিশ্চয়তা বিধান করা। এটা আমাদের মানসিক চাহিদা থাকলেও কর্মে প্রমাণিত হচ্ছে এর বিপরীত চিন্তা ও চেতনা। ভবিষ্যৎ বংশধরকে একটি জ্বলন্ত অগ্নিগিরিতে রেখে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতিই আমরা সমাপ্ত করেছি। সুখের নেশায় ঘরে ঘরে নেশা ঢুকে গেছে। রেইনট্রি হোটেলের ঘটনাসহ অনেক ঘটনা প্রমাণ করে, অভাবের তাড়নায় নয়, বরং লাগামহীন অপচয় থেকে ধনিক শ্রেণী দ্বারাই নানাবিধ অপরাধ প্রসারিত হচ্ছে। এর প্রধান কারণও, মানুষের মিথ্যার পেছনে মানুষের ছুটে চলা। মিথ্যা আভিজাত্যও এক ধরনের নেশা। এ নেশায় ধনিক শ্রেণীর ঘরে ঘরে অশান্তি, যা থেকে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে, যা নিছক অভাব থেকে নয়, বরং মিথ্যার পেছনে ধাবমানরত দুর্ভাগা লোকেরা এ পরিণতি ডেকে আনছে।
সত্য-মিথ্যার ব্যবধান মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না, যখন উপলব্ধি আসে তখন আর শোধরানোর সময় থাকে না। রাষ্ট্রযন্ত্রসহ গোটা জাতির নিয়ন্ত্রকেরা যেভাবে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করছেন, তার পরিণতি কী হতে পারে, তা-ও উপলব্ধি হচ্ছে না।হ

লেখক : কলামিস্ট ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.