বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা সহজ করুন
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা সহজ করুন

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা সহজ করুন

এম জি হোসেন

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানোর দৃঢ় প্রস্তুতি ও প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে ভালোভাবেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুনঃপ্রবৃত্তি ছাড়াই চলমান পরীক্ষা শেষ হবে এমন প্রত্যাশা সবার। পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে হলেও শিক্ষার্থীদের টেনশন কিন্তু শেষ হচ্ছে না। কারণ, এরপর তাদের বড় যুদ্ধে অংশ নিতে হবে, এর নাম- ‘ভর্তি যুদ্ধ’। এ যুদ্ধ চলবে নানা সেক্টরে বছরজুড়ে। আজ রংপুর, কাল সিলেট, পরশু ঢাকাতে, পরদিন খুলনা না হয় চট্টগ্রাম। এই যুদ্ধে আর্থিক খরচ বহন করতে হয় সৈনিকদেরই, সে ধনীর দুলাল হোক অথবা বিত্তহীন পরিবারের ‘গলার কাঁটা’। এই যোদ্ধাদের প্রায় অর্ধেকই আবার নারী। এক্ষেত্রে ঝুঁকি, অর্থ সঙ্কট, মানবতার দাবি যেন অজুহাত মাত্র। ছাত্রী যত মেধাবীই হোক এই অসম প্রতিযোগিতা ক’জনের পক্ষে সম্ভব? কোনো অভিভাবকের পক্ষে তার মেয়েকে একা একা খুলনা, ঢাকা, সিলেট, রংপুর ছোটাছুটি করতে দেয়া আদৌ কি সম্ভব? সাথে থাকার মতো কাউকে সবসময় পাওয়া না গেলে এবং তিন-চারগুণ বেশি অর্থ জোগানের মতো আর্থিক সঙ্গতি না থাকলে মেয়েদের পক্ষে এ যুদ্ধে কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন প্রায় অসম্ভব।

পাস করার পর একজন শিক্ষার্থীকে কোথাও না কোথাও ভর্তি হতেই হবে। নানা কারণে ভালো ছাত্রছাত্রীদের প্রথম পছন্দ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তো আর একটি বা দু’টি নয়, এক জায়গায়ও নয়। এর বাইরে রয়েছে মেডিক্যাল কলেজসহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠান। ভাগ্য কোথায় নিহিত, তা জানার যেহেতু কোনো উপায় নেই, তাই পরশপাথর সন্ধানী সেই খ্যাপার মতো ‘বেলাভূমিতে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি পাথরই পরখ না করে একজন শিক্ষার্থীর মন শান্তি পেতে পারে না।


এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রয়েছে একাধিক গ্রুপও। সুতরাং, অনেকগুলো ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া দরকার। অন্য কথায়, যে কটিতে অংশ নেয়ার মতো আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সামর্থ্য রয়েছে এর মধ্যে সমন্বয় করাও জটিল ও কঠিন বিষয়। এ সব বিবেচনায় অনেকে আবার ‘মাথা ব্যথা নিরসনে মাথা কেটে ফেলার মতোই ভর্তি পরীক্ষা তুলে দেয়ার কথা বলেন, যা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ, উদার পরীক্ষা ব্যবস্থায় অ+ পাওয়ার যোগ্য শিক্ষার্থীরাই কেবল অ+ পাচ্ছে না বরং অ- পাওয়ারও যোগ্য নয়, এমন অনেকেও অ+ পেয়ে যাচ্ছে এবং এদের সংখ্যাই বোধকরি বেশি। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস, আর নকল প্রবণতা তো আছেই। তা ছাড়া শুধু রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে কোনো শিক্ষার্থীর বিশেষ যোগ্যতা ও ঝোঁকপ্রবণতা যেমনি বাছাই করা যায় না, তেমিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষেও তাদের প্রয়োজন ও প্রত্যাশামতো মেধা বাছাই করে নেয়া সম্ভব নয়। সুতরাং, ভর্তি পরীক্ষা বহাল রেখেই সমস্যা নিরসনের চেষ্টা করতে হবে।

এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শ্রেণী বিন্যাস, মানগত অবস্থান ও শিক্ষার্থীর পছন্দের বিষয়গুলোকে সামনে রেখে কিছু সুপারিশ পেশ করছি। মেডিক্যাল ছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মোটামুটি চার শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। (১) ইঞ্জিনিয়ারিং, (২) কৃষি, (৩) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, (৪) সাধারণ (ইসলামি) বিশ্ববিদ্যালয়। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একই গ্রুপে নেয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক, খ ও গ ক্যাটাগরিতে শ্রেণীবিন্যাস করে ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। ধরা যাক দেশে ‘গ’ ক্যাটাগরির (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সাধারণ) ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০টি বিষয় পড়ানো হয়। (সবক’টি বিষয় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়; তেমন নয়।) ধরা যাক, এই ৫০টি বিষয় ছয়টি অনুষদে বিভক্ত এবং সে অনুযায়ী অ ..... ঋ গ্রুপের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ভাবছি। ‘অ’ গ্রুপে অধিতব্য বিষয় মনে তরুণ ২০টি।

ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম পূরণের সময় প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তিনটি তথ্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। (১) তার পছন্দের বিষয়ক্রম, (২) পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়, (৩) তার প্রার্থিত বিষয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মেধাক্রমের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হলে বিষয় না বিশ্ববিদ্যালয়, কোনটিকে প্রাধান্য দেয়া হবে। ধরা যাক শাহীন ‘অ’ গ্রুপের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হলো। তার প্রথম পছন্দ ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয় অর্থনীতি। সঙ্গত কারণেই সে তার প্রত্যাশিত বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যাবে। অন্য দিকে শামিমের সম্মিলিত মেধার তালিকায় অবস্থান ৭০০তম। তারও প্রথম পছন্দ ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয় অর্থনীতি। ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে আসন রয়েছে ১০০টি যা মেধার ৫০০ ক্রমেই পূরণ হয়ে গেছে, সুতরাং শামিম ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হতে পারছে না। এখন দেখতে হবে, শামিম বিশ্ববিদ্যালয় না বিষয়কে অগ্রাধিকারে রেখেছে। দেখা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়কেই সে অগ্রাধিকারে রেখেছে। এখন দেখতে হবে, ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য কোনো বিষয় অধ্যয়নে তাকে সুযোগ দেয়া যায় কিনা। আর পছন্দের দ্বিতীয় বিষয়টি হতে পারে বাংলা। বাংলা বিভাগেও ১০০টি আসন রয়েছে যার মধ্যে মেধার ক্রমানুসারে ৪৯৯-তে ৭৫টি পূরণ হয়ে গেছে। সুতরাং, শামিম ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স পড়ার সুযোগ পাবে।

অন্য দিকে, খোকার মেধার তালিকায় অবস্থান দুই হাজারতম। তারও প্রথম পছন্দ ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয় ইংরেজি। দেখা গেল, ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি আসন মেধা ৫০০ ক্রমের মধ্যেই পূরণ হয়ে গেছে। তার আবেদনপত্রে সে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে বিষয়টিকেই সমধিক গুরুত্বে রেখেছে। সুতরাং, দেখতে হবে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পছন্দের বিষয়টিতে ভর্তির সুযোগ পায় কিনা। এখন দেখা গেল, তার পছন্দের ধারাবাহিকতায় ‘গ’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সে ‘গ’ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাবে।
আমাদের বিশ্বাস- এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি শিক্ষার্থী যেমনি তার মেধাক্রম ও পছন্দের মধ্যে সর্বোত্তম সমন্বয়ের সুযোগ পাবে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা অক্ষুণ্ন রেখেই ছাত্রছাত্রী ভর্তির সুযোগ পাবে। ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয় যদি দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ই শীর্ষে থাকবে।

আর একটি কথা হলো, ভর্তির পরীক্ষাগুলো প্রতিটি জেলা শহরেই নেয়া উচিত, যাতে সময়-শ্রম ও অর্থদণ্ড হতে প্রার্থীদের রেহাই দেয়া যায়। ভর্তির এই কার্যক্রম দুই-তিন মাসের মধ্যেই শেষ হওয়া বাঞ্ছনীয় যাতে অনধিক চার মাসের মধ্যে ক্লাস শুরু করা সম্ভব হয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.