নতুন বছরে নতুন হালখাতা

মাহমুদুল হাসান

বৈশাখের আমেজ চলছে সারা ঢাকাজুড়ে। রীতি অনুযায়ী পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার, ইসলামপুর, মিটফোর্ড রোড ও চকবাজারের দোকানগুলোতে হালখাতার আয়োজন করা হয় পয়লা বৈশাখের পরের দিন। আর দোকানগুলোতে হালখাতার প্রস্তুতি আর বৈশাখ বরণ করার উপকরণ তৈরির কাজ শুরু হয় সপ্তাহখানেক আগে থেকেই। রাজধানীর হালখাতার বর্তমান হাল নিয়ে লিখেছেন মাহমুদুল হাসান


সময়, সুযোগ আর পরিবেশ মিলে যোগ-বিয়োগ ঘটে অনেক ঐতিহ্যের। কিছু ঐতিহ্যের শিকড় এত গভীরে যে, আধুনিকতার শত ঝাপটায়ও টিকে থাকে প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো। বাঙালি চির ঐতিহ্য এই হালখাতা। সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব পালনে আড়ম্বরতায় ভাটা পড়েছে বটে, তবে তা টিকে আছে স্বমহিমায়। বাংলা নববর্ষে অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবেই আসে ‘হালখাতা’।
পুরনো দিনের হিসেব আর লেনদেন চুকিয়ে বাঙালি ব্যবসায়ীদের নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার রীতি বহু দিনের। সময়ের ব্যবধানে জীবনাচার ও সংস্কৃতির অনেক পরিবর্তন এলেও তার খুব একটা প্রভাব পড়েনি পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাঝে। আর তাই নতুন বছরে হিসাব নিকাশের শুভসূচনা করতে এখানে হালখাতা উৎসব চলছে পুরোদমে।
বাংলা সন চালু হওয়ার পর নববর্ষ উদযাপনে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে হালখাতা দ্বিতীয় বৃহৎ অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দেনাদার ও পাওনাদারের মধ্যে বিশ্বাস, আস্থা ও গভীর সম্পর্কের প্রকাশ ঘটত হালখাতার মাধ্যমে। এটা ছিল সৌজন্য প্রকাশের এক ঐতিহ্য। চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ করা এবং পরবর্তী দিন পয়লা বৈশাখে ভূমির মালিক ও ব্যবসায়ীরা তাদের প্রজা ও পণ্য ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন বছরের হিসাব শুরু করতেন। রঙ ফিকে হয়ে এলেও পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মহলে এখনো রয়েছে হালখাতার চল।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার এলাকার বেশির ভাগই অলঙ্কারের দোকান। বৈশাখে আগে এই এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ দোকানে রঙের কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কর্মচারীরা। দোকানগুলোর শাটার ও দেয়ালে চলছে রঙের কাজ। কোনো কোনো দোকানে চলছে ধোয়ামোছার কাজও। দোকানের আসবাব বাইরে বের করে সেগুলোও পরিষ্কার করছেন দোকানিরা।
শাঁখারীবাজারের রুপা গোল্ড হাউসের মালিক সুব্রত দাস বলেন, হালখাতার দিন অনেক দূর থেকে গ্রাহকেরা আসেন। একটা উৎসব বিরাজ করে। সেই জন্যই দোকান রঙিন করতে হয়। প্রযুক্তির এই যুগেও দাওয়াত কার্ড দেয়া হালখাতার অন্যতম অনুষঙ্গ। এখন অনেকেই দূরের গ্রাহকদের ফোনে দাওয়াত দেয়। কিন্তু কার্ড না দিলে উৎসবের ভাব আসে না। ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ার করে দূরের গ্রাহকদের দাওয়াত কার্ড দেওয়া হয়।
পুরান ঢাকার দোকানগুলোও সাজানো হয়েছে বৈশাখ উদ্যাপনের নানা উপকরণ দিয়ে। মুখোশ, ঘুড়ি, বৈশাখী টুপি, একতারা, ডুগডুগি দিয়ে দোকান সাজিয়েছেন দোকানিরা। পুরান ঢাকার রাস্তায় হালখাতা বিক্রি করছেন এক বিক্রেতা। তিনি জানান, গুণগতমানের ওপর হালখাতার দাম ২০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়। এই হালখাতা পুরান ঢাকায় সালুখাতা বা লাল খাতা নামেও পরিচিত।
হালখাতা উৎপাদন প্রতিষ্ঠান পুরান ঢাকার লোকনাথ বুক এজেন্সির পরিচালক আসিফুজ্জামান ইহাম বলেন, বছরজুড়ে হালখাতা বিক্রি হলেও পয়লা বৈশাখের আগে আগে এর বিক্রি বেড়ে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠানের হিসাব এখন কম্পিউটারাইজড। তবে পুরান ঢাকার বেশির ভাগ ব্যবসায়ী খাতাপত্রেই হিসাব তুলে রাখেন। পুরান ঢাকার স্বর্ণব্যবসায়ী, শ্যামবাজারের আড়তদারেরা তাদের প্রধান ক্রেতা। তবে নতুন ঢাকায় ব্যবসা করছেন এমন অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ীও তাদের তৈরি এই খাতা কিনে থাকেন। সরকারি হিসাবে শনিবার নববর্ষ পালন হলেও তারা বাঙালি রীতি অনুসারে পরদিন রোববারও নববর্ষ উদযাপন করেন পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীরা।
সাধারণত পয়লা বৈশাখের হালখাতা অনুষ্ঠানে দোকানিদের বাকির টাকা মিটিয়ে দিয়ে থাকেন ক্রেতারা। যদিও এখন মানুষের হাতে নগদ অর্থের অভাব নেই। এখন আর আগের মতো পরিস্থিতি নেই। সমাজের বিশাল বিবর্তন ঘটেছে। গ্রাম-বাংলার জনজীবনেও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। কেউ কাউকে চেনেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে সরে গিয়ে নগরভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠেছে, শিল্প বিকশিত হচ্ছে। সবার হাতে কম-বেশি নগদ অর্থ আছে এখন। তাই হালখাতা পালনের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ক্রেডিট কার্ডনির্ভর দুনিয়ায় এখন হালখাতা মলিন হয়ে গেছে!
১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে ঢাকায় সুবেদার ইসলাম খান চিশতি তার বাসভবনের সামনে প্রজাদের শুভ কামনা করে মিষ্টি বিতরণ ও উৎসবের আয়োজন করতেন। খাজনা আদায় ও হিসাবনিকাশের পাশাপাশি চলত মেলা, গান বাজনা ও হালখাতা অনুষ্ঠান। পরবর্তী সময় ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় মিটফোর্ডের নলগোলার ভাওয়াল রাজার কাচারিবাড়ি, ফরাশগঞ্জের রূপলাল হাউজ, পাটুয়াটুলীর সামনে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো।
পুরান ঢাকার চক মোগলটুলির ব্যবসায়ী মনির হোসেন বলেন, আগের রীতি অনুসারে পয়লা বৈশাখের আগে বাকি টাকা পরিশোধ সেভাবে না হলেও তারা হালখাতা উৎসবের ঐতিহ্য ছোট পরিসরে হলেও ধরে রেখেছেন। তার প্রতিষ্ঠান ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে, সাজানো হয়েছে। লেনদেন রয়েছে এমন ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি। এ ছাড়া ব্যবসায় সাফল্য প্রার্থনার জন্য মিলাদের আয়োজন করেছেন। তিনি আরো বলেন, পুরান ঢাকায় আগের মতো ধুমধাম করে হালখাতা হয় না। তবে ছোট পরিসরে হলেও ব্যবসায়ীরা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
শাঁখারীবাজারের শাঁখা, শঙ্খ ও শোলা দোকানের মালিক শ্যামল দাস বলেন, হালখাতা আমাদের অনেক পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী রীতি। আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে আমাদের মধ্যে এই রীতি চলে আসছে। আশা করছি, পরের প্রজন্মও এ রীতি মেনে চলবে। এ দিন আমরা পুরো দোকান নতুন করে ফুলসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সাজাই।
গত রোববার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজারসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় হালখাতা উৎসবের আমেজ। এই উৎসবের অংশ হিসেবে পুরান ঢাকার দোকানগুলো সাজানো হয়েছে ফুল দিয়ে। সবাইকে মিষ্টিমুখ করানোর পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও চলছে পণ্যের ওপর ছাড়। এ ছাড়া ক্রেতাদের দেওয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় পুরস্কার।
ছবি : বিডিনিউজ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.