ads

ধান কাটা শুরু করেছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। ছবিটি জামালগঞ্জের একটি ফসলী মাঠ থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত
ধান কাটা শুরু করেছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। ছবিটি জামালগঞ্জের একটি ফসলী মাঠ থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত
সুনামগঞ্জে বোরো ধান কাটা শুরু

দুর্ভোগ শেষে সুদিনের আশায় হাওরের ৩ লাখ কৃষক পরিবার

তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই-শাল্লা ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জসহ প্রায় সব উপজেলাই দেশী জাতের ধানের সাথে বিআর-২৮ ধান কাটা শুরু হয়েছে। বুকভরা আশা নিয়ে সোনার ধান ঘরে তোলার দিন গুনছেন কৃষকেরা। গত বোরো মওসুমে এ সময় হাওরের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গিয়েছিল স্বপ্নের ফসল। এ বছর এরই মধ্যে জামালগঞ্জ উপজেলার বোরো ধানের ভাণ্ডার খ্যাত পাকনা হাওর ও হালির হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। উৎসবের আমেজে ধান কাটতে দেখা গেছে কৃষকদের। ইতোমধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ধান কাটার শ্রমিকেরা আসতে শুরু করেছেন। তবে শ্রমিক সঙ্কটের কারণে কিছুটা উদ্বিগ্ন কৃষকেরা।
জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই-শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জসহ ১১ উপজেলার গ্রামে গ্রামে এখন চলছে বোরো ফসল কাটার প্রস্তুতি। পাকা-আধাপাকা ধানের মৌ-মৌ গন্ধে ভরে গেছে জেলার সব ক’টি হাওরের ফসলি মাঠ। বছরে একটি মাত্র ফসল বোরো ধানকে ঘিরেই এ অঞ্চলের মানুষের যত স্বপ্ন। বছরজুড়ে অভাব-অনটন আর জমাট বাধা দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে এবার কিছুটা হলেও সোনাঝরা হাসি ফুটেছে কৃষকদের মুখে। কৃষকেরা ব্যস্ত ধান কাটতে মাঠে আর কৃষাণীরা ব্যস্ত মাড়াইকল দিয়ে ধান শুকানোর জন্য খলা প্রস্তুতের কাজে। সব মিলিয়ে হাওর পাড়ের গ্রামে গ্রামে চলছে ধান কাটার উৎসব।
আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আর সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। এ সময় সবার ঘরে ঘরে থাকবে ধান আর ধান। হাজারো স্বপ্নে বিভোর কৃষকেরা এখন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন কবে তাদের গোলায় উঠবে সোনালি ধান। কিন্তু এত স্বপ্নের মধ্যেও তাদের মনে আতঙ্কের কোনো কমতি নেই। রোদ উঠলেই আনন্দের ঝলকে ভরে ওঠে কৃষাণ-কৃষাণীর মন আর মেঘলা আকাশ বা বৃষ্টি হলেই তাদের চেহারাটা হয়ে যায় ফ্যাকাসে। বজ্রপাতের শব্দে তাদের বুক কেঁপে ওঠে। পাহাড়ি ঢল তাদের মনে ভাবনা জাগায়। চৈত্রের প্রচণ্ড অভাবের দিনে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে চরম দুর্দিন কাটিয়েছেন তারা। কৃষকেরা রাত পোহালেই ধানি মাঠে গিয়ে সোনালি ধানের ঢেউয়ের দোলায় তাদের প্রাণ জুড়িয়ে ভুলে যান দুর্দিনের কথা।
গত বছর সুনামগঞ্জের হাওরে ছিল ফসলহারা কৃষকের হাহাকার আর আর্তনাদ। একের পর এক হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবির কারণে তারা হয়ে পড়েন দিশেহারা। এবার জেলার সবচেয়ে ভালো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ হয়েছে জামালগঞ্জের হাওরে। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আল ইমরানের নিরলস প্রচেষ্টায় জেলাপর্যায়ে বাঁধ নির্মাণে জামালগঞ্জ সেরা হিসেবে আলোচনায় আসেন। নিঃস্ব কৃষকরা এবার কষ্টের ফলানো ধান গোলায় তোলার স্বপ্ন দেখছেন।
পাকনা হাওরের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এবার বহু কষ্টে দেনা করে ফসল করছি, আল্লার রহমতে ভালো ফলন হইছে। ধান কাটা শুরু করছি।’ কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী ছানা মিয়া বলেন, ‘গত বছর ফসল ডুবির পর চোখে অন্ধকার দেখেছি, সারা বছর কষ্ট করে দেনা করে ফসল ফলাইছি। ফলনও ভালো হইছে। কয়েক দিনের মধ্যেই আমার ধান কাটা শুরু হইব।’ কৃষক প্রবাল মিয়া বলেন, ‘ধান কাটা শুরু হইছে, এবার হাওরের বাঁধ হইছে ঠিক মতোই। নদীতেও পানি নাই, আল্লাহ যদি কয়েকটা দিন রোদ দেয় তাইলে হাওরের ফসল ঘরে যাইবো।’
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রজব আলী জানান, লম্বাবাক গ্রামের কৃষক কবীর হোসেন ও আবদুর রহিম বিআর-২৮ জাতের ধান কেটেছেন। ফলনও হয়েছে ভালো। আর সপ্তাহখানেক পর হালির হাওরে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ছোট বড় ১৫৪টি হাওরে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে একের পর এক জেলার সব ক’টি হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যায়। এতে জেলার তিন লাখ ২৫ হাজার ৯৯০টি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চলতি বছর জেলার বিভিন্ন হাওরে দুই লাখ ২২ হাজার ৭১৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন। কিছু কিছু হাওরে ধান কাটা শুরু হয়েছে। পুরোদমে ধান কাটা শুরু হতে আরো এক সপ্তাহ সময় লাগবে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, জেলায় এবার হাওরের ফসল রক্ষায় এক হাজার ৪৯০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন বাঁধ হয়েছে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। বাঁধের কাজ শেষ। এখন আনুষঙ্গিক কাজ চলছে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম বলেন, জেলার সব ক’টি হাওরের ফসল রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণর কাজ করেছি। বৈরী আবহাওয়া না হলে কৃষকেরা এবার হাসি মুখেই তাদের ধান গোলায় তুলতে পারবেন। আমরা কৃষকদের মুখে সেই আনন্দের হাসি দেখতে চাই।

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.