পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের গভর্নর মুহাম্মদ যোবায়েরের (বাঁ থেকে চতুর্থ) সাথে বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের একাংশ :  নয়া দিগন্ত
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের গভর্নর মুহাম্মদ যোবায়েরের (বাঁ থেকে চতুর্থ) সাথে বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের একাংশ : নয়া দিগন্ত
বাংলাদেশী সাংবাদিকদের উদ্দেশে সিন্ধের গভর্নর

দুই দেশের সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে

হামিম উল কবির পাকিস্তান থেকে ফিরে

আপনারা উন্নতি করলে আমরা খুশি হই। আপনাদের অর্থনীতি বেশ ভালো হচ্ছে। আপনারা ভালো থাকুন, এটা আমরা সব সময় কামনা করি। পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশের গভর্নর মুহাম্মদ জোবায়ের এভাবেই পাকিস্তান সফররত বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিলেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সাথে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ একধরনের বন্ধন অনুভব করে। তিনি অন্যান্য দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, জাপান ও চীনের মধ্যে একসময় যুদ্ধ হয়েছে। আমেরিকার সাথে ভিয়েতনামের দীর্ঘ যুদ্ধ হয়েছে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মধ্যে তিক্ততা খুবই প্রাচীন। কিন্তু এ দেশগুলো অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে কাছাকাছি এসেছে এবং সব ধরনের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের মধ্যে। তারা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গত ১৯ থেকে ২৬ মার্চ বাংলাদেশ থেকে ১০ জনের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতরের আমন্ত্রণে পাকিস্তান সফরে গেলে ২১ মার্চ সিন্ধের গভর্নরের সরকারি বাসভবনে প্রতিনিধিদলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রায় এক ঘণ্টা গভর্নরের সাথে সাংবাদিকদের মতবিনিময় হয়। বাংলাদেশ সম্পর্কে সিন্ধের গভর্নর মুহাম্মদ জোবায়ের আরো বলেন, আপনাদের দেশ এগিয়েছে অনেক। অন্যান্য শিল্পের সাথে টেক্সটাইল শিল্প বেশ ভালো করছে। দুই দেশের মধ্যে নানা দিকে সম্পর্ক বাড়ানোর আরো সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আমরা বাড়াতে পারি। সিন্ধের গভর্নর আরো বলেন, আমরা ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেও সম্পর্ক বাড়াতে পারি। তিনি বলেন, আপনারা সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলুন, বাংলাদেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা কতটুকু বুঝতে পারবেন। লাহোরে পাকিস্তান টাওয়ারে যদি যান দেখবেন সেখানে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেব যে লাহোর প্রস্তাব পেশ করেছিলেন তার সম্পূর্ণ এখনো বাংলায় লেখা রয়েছে। আপনারা কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নার মাজারে গেলে দেখবেন তার কবরের এপিটাফ এখনো উর্দুর সাথে বাংলায় লেখা। বাংলাদেশের প্রতি আমাদের যে ভালোবাসা রয়েছে তার প্রকাশ এগুলো।
বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সফরের শেষ দিন বিকেলে পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যের রাজধানী লাহোরের অভিজাত শপিং সেন্টার ‘প্যাকেজেস মলে’ কথা হচ্ছিল জুলফিকার ইকবালের সাথে। লাহোর তার জন্মস্থান হলেও তিনি বর্তমানে ব্রিটেনে বাস করেন। ছুটি কাটাতে এসেছিলেন নিজ শহর লাহোরে। সন্ধ্যার আগে আগে আমরা কয়েকজন ক্লান্ত হয়ে একটি স্থানে বসে কথা বলছিলাম। ষাটোর্ধ্ব জুলফিকার ইকবাল আমাদের মুখে বাংলা শুনে নিজেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি কি না।’ তিনি অল্প কিছু কথা বাংলায় বলে থেমে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা ইংরেজি অথবা উর্দু জানি কি না। পরে তিনি জানান, ১৯৭১ সালের আগে তিনি গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। আত্মীয়ের বাসায় কিছু দিন অবস্থান করেছিলেন। সেখানেই অল্প কিছু বাংলা শিখেছিলেন। সেটুকুই এখন বাংলাদেশীদের সাথে কথা শুরু করার সম্বল তার। তিনি জানান, লন্ডনে এভাবেই তিনি বাংলাদেশীদের সাথে কথা শুরু করেন।
জুলফিকার ইকবাল বললেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি একধরনের সফট কর্নার রয়েছে আমার। এটা শুধু আমার ধারণা নয়, পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি নাগরিকের একই ধরনের ভালো ধারণা রয়েছে বাংলাদেশ সম্পর্কে। রয়েছে আপনাদের দেশের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা।’ জুলফিকার জানান, ‘আমাদের রাজনীতিকদের ভুলের কারণে আজ আমরা দুই দেশে পরিণত হয়েছি। ইয়াহিয়া খান আর জুলফিকার আলী ভুট্টোর একগুয়েমি এবং ক্ষমতার লোভে একটা রক্তাক্ত পরিণতির মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টির নেতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করাটা ছিল ভুল।’ জুলফিকার ইকবাল বললেন, যা হোক এখন দুইটা দেশ হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ এখনো বাংলাদেশকে ভালোবাসি। শুনেছি আপনারা বড় বড় অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন, নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠছে দ্রুততার সাথে। আপনারা ভালো থাকুন, আমরা সব সময় এই কামনাই করি। জুলফিকার ইকবাল বাংলাদেশী সাংবাদিকদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, সময় থাকলে পুরো পাকিস্তানটা ঘুরে দেখতে। তিনি জানান, পাকিস্তানও ভালো করছে।
বাংলাদেশ সম্পর্কে পাকিস্তানি সাধারণ নাগরিকদেরও রয়েছে বেশ উচ্চ ধারণা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে বেশ আগ্রহী। লাহোর ফোর্ট ঘুরে দেখার সময় সেখানকার গাইড সিকান্দার বললেন, ‘আমি ইতিহাসের ছাত্র। যদিও পূরাকীর্তি আমার প্রিয় বিষয়। তবু ইতিহাসের ছাত্র বলে, বাংলাদেশ সম্পর্কেও আমি পড়েছি, এখনো পড়ছি।’ মুঘলদের বিশ্রামাগার, দরবার হল কিংবা হেরেমের ভগ্নাবশেষ সম্পর্কে বিবরণী দেয়ার ফাঁকে সিকান্দার জানান, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে ১৯৭১ সালে যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল সে সম্পর্ক আবার নতুন করে গড়ে তোলার সময় এসেছে। আমি বাংলাদেশে যাইনি; কিন্তু আমি পাকিস্তানের সচেতন নতুন প্রজন্মের কথা বলতে পারি। তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চায়, বাংলাদেশে যেতে চায়। অনেকের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশে বাস করতেন। পিতা-মাতা, দাদা-দাদীদের কাছে যে গল্প তারা শুনেছে এখন তারা সে স্থানগুলো দেখে আসতে চায়। আমার মনে হয়, একই অবস্থা বাংলাদেশের। আমরা নতুন প্রজন্মের মধ্যে বন্ধন গড়ে তুলতে চাই।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.