ads

প্লট-ফ্ল্যাট সবই সস্তায় কেনেন নাজমুল হক ভাতা নেন বেতনের ৩৬ গুণ

শামছুল ইসলাম

প্লট বা ফ্ল্যাট সবই সস্তায় কেনেন নৌপরিবহন অধিদফতরের (ডিজি শিপিং) ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. এস এম নাজমুল হক। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় অবিশ্বাস্য নামকাওয়াস্ত মূল্যে কয়েকটি প্লট ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে এক হাজার ৮২৫ বর্গফুটের যে ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করছেন সেই ফ্ল্যাট তিনি নাকি সাড়ে ৮ লাখ টাকায় কিনেছেন। আয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন চেহারা তার। বছরে মূল বেতনের অন্তত ৩৬ গুণ বেশি বেতনভাতা ও সুদ নেন এ প্রকৌশলী। এ অধিদফতর থেকেই বছরে তার আয় কোটি টাকার বেশি। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দদুক) স্বেচ্ছায় অবিশ্বাস্য এসব তথ্য জানিয়েছেন তিনি নিজেই। যদিও দুদক তার সম্পদের এসব হিসাব মানতে নারাজ। তার সম্পদ ও আয়ের উৎস খতিয়ে দেখছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নৌপরিবহন অধিদফতরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভ্যন্তরীণ নৌযান সার্ভে (ফিটনেস পরীক্ষা) ও নিবন্ধন, নৌযানের মাস্টারশিপ ও ড্রাইভারশিপ পরীক্ষা, বে-ক্রসিংয়ের (উপকূল অতিক্রম) অনুমতি প্রদান, নৌযানের নকশা অনুমোদন, সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিকদের পরীক্ষাসহ প্রায় সব কাজে অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। গণমাধ্যমগুলোতেও এসব খবর প্রকাশিত হয়েছে। তারপরও অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রা লাগামহীন হয়ে উঠেছে। অধিদফতরের এমন অনিয়ম ঠেকাতে তৎপর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী ড. এস এম নাজমুল হককে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করে দুদক। সেগুনবাগিচায় সেগুন রেস্তোরাঁ থেকে নাজমুল হককে ঘুষের টাকাসহ গ্রেফতার করা হয়।
দুদক সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগ ১-এর উপপরিচালক বেনজীর আহমেদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে (স্বারক নং দুদক/অনু. ও তদন্ত ১/অনু. ৩২০ ঢাকা ২০১৪/২১৪১৪) নাজমুল হকের সম্পদের তথ্য চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়। ওই নোটিশে বলা হয়, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিত্তে অনুসন্ধান করে দুদকের স্থির বিশ্বাস হয়েছে এসএম নাজমুল হক জ্ঞাত আয়ের বহির্ভূত স্বনামে বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ওই নোটিশে এস এম নাজমুল, তার স্ত্রী এবং স্বজনদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়। নোটিশ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে হিসাব জমা দিতে বলা হয় দুদকে। নোটিশে আরো বলা হয়, সম্পদবিবরণী দাখিলে কোনোরকম মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হলে দুদক আইনের ধারা ২৬-এর উপধারা ২ মোতাবেক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজস্ব ফাঁকি দিতে প্লট ও ফ্ল্যাটের দাম অবিশ্বাস্য কম দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করেছেন নাজমুল হক। তার নিজ নামে ও তার স্ত্রীর নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে। এ ছাড়া বেনামেও সম্পদ থাকতে পারে। রহস্যজনক কারণে এ কর্মকর্তাকে একই সাথে পাঁচটি পদে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি একই সাথে ভারপ্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার, চিফ এক্সামিনার অব ইঞ্জিনিয়ার, চেয়ারম্যান- ইনল্যান্ড অ্যান্ড ড্রাইভারশিপ বোর্ড, প্রিন্সিপাল সার্ভেয়ার- ইনল্যান্ড শিপ সেফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পদে আসীন রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, নাজমুল হকের নামে সিদ্ধেশ্বরী রোডে ডোমইনোতে চার রুমের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। মাত্র ১০ বছর আগে কেনা (২০০৭-০৮ অর্থবছরে) এ ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ৮ লাখ টাকা। ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে ওই ভবনের প্রতিটি বর্গফুটের দাম ছিল অন্তত পাঁচ হাজার টাকা। অথচ তিনি প্রতি বর্গফুটের দাম দেখিয়েছেন ৪৬৬ টাকা।
এ ছাড়া ২০১২-১৩ অর্থবছরে পূর্বাচল মেরিন সিটিতে ৫ কাঠা জমি ৩ লাখ টাকায় কিনেছেন নাজমুল হক। নিজের বেতন ও ভাতা থেকে প্রাপ্ত টাকায় এ জমি কিনেছেন। অর্থাৎ প্রতি কাঠার দাম পড়েছে মাত্র ৬০ হাজার টাকা। ওই অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আরো ৫ কাঠা জমি কিনেছেন তিনি। ওই ৫ কাঠার দামও দেখিয়েছেন ৩ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কাঠার দাম পড়ে ৬০ হাজার টাকা। এর আগের সালে ২০১১-২০১২ অর্থবছরে খিলক্ষেত ডুমনিতে ৫ কাঠা জমি কেনেন নাজমুল হক। ওই জমির দাম দেখিয়েছেন ৯৫ লাখ টাকা। ২০০৩-০৪ সালে খুলনার নিরালায় ভাইদের পৌনে তিন কাঠা জমি আড়াই লাখ টাকায় কেনেন এ কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একজন কর্মকর্তা জানান, এ কর্মকর্তার বার্ষিক আয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যেকোনো পর্যায়ের কর্মকর্তার চেয়ে বেশি। প্রতি অর্থবছরে তার আয় প্রায় সোয়া কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তার আয় ছিল এক কোটি ১৭ লাখ ৪ হাজার ১২১ টাকা। এর মধ্যে বেতন ৩ লাখ ২১ হাজার টাকা, করমুক্ত ভাতা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ টাকা ও উৎসবভাতা ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা। তার অন্যান্য আয়ের মধ্যে রয়েছে- ব্যাংকসুদ ৭২ হাজার ৮৭২ টাকা, পরীক্ষা ফি ১ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৮৪৯ টাকা, জাহাজ জরিপ ফি ২৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা, ইনল্যান্ড ফি ৭০ লাখ ১৩ হাজার ৭৭২ টাকা ও সমুদ্রগামী জাহাজের পরীক্ষা ফি ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৭৭ টাকা।
অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তারা বেতনের সমপরিমাণের বেশি ভাতাদি নিতে পারেন না। কিন্তু নৌপরিবহন অধিদফতরের কর্মকর্তারা ওই নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজেদের মতো করে বেতনভাতা নির্ধারণ করে নিয়েছেন। এসব টাকা যাচ্ছে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, জাহাজ মালিক ও অভ্যন্তরীণ নৌযানের মাস্টার-ড্রাইভারদের পকেট থেকে। প্রচলিত যেকোনো পরীক্ষায় একবার ফি দিতে হয়, কিন্তু এ অধিদফতরের প্রতিটি পরীক্ষার জন্য পৃথক ফি নিয়ে থাকেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা, যা সরকারি নিয়মনীতির পরিপন্থী।

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.