শিক্ষার স্তরবিন্যাস : যা করণীয়

কাজী মুহাম্মদ কুদরাত-ই-মাইন উদ্দীন

আমাদের বর্তমান শিক্ষানীতি, যা জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ নামে খ্যাত; তা কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের আদলে করা। কেউ কেউ এ শিক্ষানীতিকে ওই কমিশনের সারসংক্ষেপ বলেছেন। কোনো দেশের শিক্ষানীতি যখন প্রণয়ন করা হয়, তখন শিক্ষার স্তরবিন্যাসের দিকে নজর দিতে হয়। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এ শিক্ষার তিনটি স্তর বিন্যাস করে দেখানো হয়েছে। এগুলো হলোÑ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার দু’টি স্তর রয়েছেÑ একটি প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণী, যেখানে ৪+ বয়সের শিশুরা ভর্তি হয়। অন্যটি হচ্ছে, প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। মাধ্যমিক শিক্ষার বিন্যাস হলো নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। দ্বাদশ শ্রেণীর পরবর্তী স্তর হলো উচ্চশিক্ষা। প্রকৃতপক্ষে এখানে শিক্ষার স্তর চারটি। এগুলো হলোÑ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। এখন পর্যন্ত আমরা লক্ষ করি, পঞ্চম শ্রেণী শেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টম শ্রেণী শেষে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেএসসি), দশম শ্রেণী শেষে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (এসএসসি), দ্বাদশ শ্রেণী শেষে হায়ার সেকেন্ডারি সার্টিফিকেট পরীক্ষা (এইচএসসি) অনুষ্ঠিত হয়। তাই তিন স্তরবিশিষ্ট শিক্ষার স্তরবিন্যাস গ্রহণ করা যায় না। যদি তিন স্তরবিশিষ্ট এই শ্রেণীবিন্যাস গ্রহণ করা হয়, তাহলে পঞ্চম শ্রেণী শেষে পিইসি পরীক্ষার পরিবর্তে অষ্টম শ্রেণীতে এরূপ পরীক্ষা গ্রহণ না করে কেন জেএসসি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়, এ প্রশ্ন জাগে। আবার নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত যদি মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর করা হয়, তাহলে দ্বাদশ শ্রেণী শেষে কেন উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা নেয়া হয়? মাধ্যমিক স্তরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা গ্রহণ কি যুক্তিসঙ্গত?
প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার যে ধরন বা পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে ওই বয়সের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানোর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) মাধ্যমে ১১ মাসের এই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষকেরা সাধারণত দু’ভাবে প্রশিক্ষিত হন। একটি হলোÑ সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন (সিইনএড) কোর্সের মাধ্যমে; অন্যটি হলোÑ ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন (ডিপিএড) কোর্সের মাধ্যমে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে শিক্ষকদের ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) এবং মাস্টার্স অব এডুকেশন (এমএড) ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে পাঠদান করানোর জন্য সাধারণত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হয় এবং হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (এইচএসটিটিআই) মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক তৈরি করা হয়। আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকলেও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় স্বল্পমেয়াদি শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়াও জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় সম্প্রতি বিষয়ভিত্তিক একটি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছে ২৮ দিনের। তাই আমরা লক্ষ করি, শিক্ষাদানের ধরনের ভিন্নতার জন্য বয়সভেদে শিক্ষার স্তরবিন্যাসের যথোপযুক্ত দিক বিবেচনা করলে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বর্ণিত শিক্ষার স্তরবিন্যাসের চেয়ে পূর্ববর্তী চারটি স্তরবিন্যাসই ছিল যথার্থ। যদি শিক্ষানীতি-২০১০-এর স্তরবিন্যাসকে কার্যকর করতে হয়, তাহলে শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর মধ্যেও ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সেই সাথে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচির পরিবর্তন প্রয়োজন; কিন্তু সরকার সেটা করেনি। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদানে প্রশিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত শ্রেণী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অথচ এই শিশু শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশ এখনো বিএড বা এমএড ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করছে। ক্ষুদ্র অংশ সরকারের ভ্রান্তনীতির কারণে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন অথবা নি¤œ শ্রেণীতে পাঠদানের উপযুক্ত শিক্ষক থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছে। আবার দেখা যায়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ মাধ্যমিক কোর্স অর্থাৎ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণী অন্তর্ভুক্ত করার কারণে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিএড বা এমএড ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা অর্জন করছে। অথচ তাদের সমপর্যায়ের অন্য শিক্ষার্থীরা সরকারি কলেজে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে লেকচার শুনছে তাদের শ্রেণী শিক্ষায়। আর বেসরকারি কলেজে যারা ভর্তি হয়েছে, তারা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। তাহলে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যারা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করছে এবং সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে যারা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষা গ্রহণ করছে, তারা সবাই যথার্থ শ্রেণিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। অবিলম্বে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সংযোজন এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে দশম শ্রেণী থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীতকরণ বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় একপর্যায়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশের মতো এমন দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করার জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন, তার ব্যয় এবং বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক শিক্ষককে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে পাঠদানে প্রশিক্ষিত করার ব্যয় বহনে কতটুকু সক্ষম তা ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এ দেশটির অবস্থা হলো তিন হাত কম্বলে সাড়ে তিন হাত মানুষকে ঢাকার অবস্থা। সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করে দেশ পরিচালনা করতে হবে। বাস্তব চিত্র হলোÑ সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কাজ চলছে। সচেতন মহল, অভিভাবক মহল ও সমালোচকেরা মনে করেন, এ ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে সমরাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যবসায়ী ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক সুবিধা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় শিক্ষা বিস্তারের চেয়ে, শিক্ষার অগ্রগতির চেয়ে ‘অন্য কিছু’ প্রাধান্য পায়। নগদ বস্তু প্রাপ্তি যেন কর্তৃপক্ষের মুখ্য উদ্দেশ্য না হয়। রাষ্ট্র পরিচালকদের চিন্তা যদি একটি বিশেষ (নগদ অর্থ) বস্তুকেন্দ্রিক হয়, তাহলে এটা বড় উদ্বেগ ও হতাশার বিষয়। প্রকৃতপক্ষে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর স্তরবিন্যাস কার্যকর করতে হলে পূর্ববর্তী ধাপগুলো অতিক্রম করা অর্থাৎ নিজ নিজ স্তরের প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরির জন্য যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। তবে চার স্তরবিশিষ্ট বিন্যাস আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য যথোপযোগী। এগুলো হলোÑ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা।
আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য Bangladesh Education Pre-Primary-22 (BEP-22) অর্থাৎ বাংলাদেশে এডুকেশন প্রাক-প্রাথমিক থেকে পিএইচডি পর্যন্ত; এভাবে স্তর সাজানো যেতে পারে। এখানে মাস্টার্স পর্যন্ত ১৭টি শ্রেণী এবং এমফিল ও পিএইচডি পর্যন্ত পাঁচটি শ্রেণী নিয়ে ২২টি শ্রেণী দেখানো যেতে পারে। যদি কোনো শিক্ষার্থী বিদেশে লেখাপড়া করতে চায়, তাহলে ওই শিক্ষার্থী যে স্তরে লেখাপড়া করার অবস্থায় থাকবে, ঠিক সে স্তরে ভর্তির সুযোগ পাবে ইঊচ থেকে ২২ পদ্ধতি চালু করলে। যেমনÑ কোনো শিক্ষার্থী বিদেশের কোনো স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হতে চাইলে ওই শিক্ষার্থী সপ্তম শ্রেণী পাসের সনদ নিয়ে ভর্তি হবে। তার সনদ বোর্ড কর্তৃক প্রদান করা হবে। সনদটি হবে ইঊচ-৭ পাস।
লেখক : কলেজ শিক্ষক ও নেতা,
বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি
ই-মেইল : kazimain@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.