গণতন্ত্রহীনতা দেশ উন্নয়নে অন্তরায়

মো: তোফাজ্জল বিন আমীন

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রথম ধাপের যোগ্যতা অর্জনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। গত ১৫ মার্চ ’১৮ জাতিসঙ্ঘের পলিসি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এই তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে চূড়ান্তভাবে এই যোগ্যতা অর্জন করতে বাংলাদেশকে আরো ছয় বছর উন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। যদি বাংলাদেশ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রাখতে পারে তাহলেই কেবল ২০২৪ সালে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি মিলবে।
একটি দেশের সরকার যখন ভুল করে বা ভুল পথে হাঁটে তখন তার সমালোচনা ও প্রতিবাদ করা, সংশোধনের উপায় নির্দেশ করা শিক্ষিত সমাজ ও নাগরিকদের নৈতিক দায়িত্ব। পক্ষান্তরে সরকারেরও মনে রাখা প্রয়োজন, যারা তোষামোদি করেন তারা সরকারের বন্ধু নয়। সমালোচক মাত্রই সরকারের শত্রু নয়। সমালোচকদের চেয়ে চাটুকারদের মধ্যে সরকারের দুশমনের সংখ্যা বেশি থাকে। মনে রাখতে হবেÑ সুশাসন, মানবাধিকার ও নৈতিকতার সূচক এ দেশে নিম্নগামী। তা ছাড়া, দেশটির কপালে স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তকমাও লেগে গেছে।
যারাই ক্ষমতার মগডালে অবস্থান করে তারাই উন্নয়নের গালভরা ভুলি আর তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে; কিন্তু জনগণের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয় না। যে সমাজ বা রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক সুষ্ঠু পরিবেশ বিরাজ করে না সেখানে উন্নয়নশীলের তকমা অর্থহীন। বাংলাদেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং সেখানে এখন গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানদণ্ড মানা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছে একটি জার্মান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের ১২৯টি দেশে গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি এবং সুশাসনের অবস্থা নিয়ে এক সমীক্ষার পর জার্মান প্রতিষ্ঠান বেরটেলসম্যান স্টিফটুং তাদের রিপোর্টে এই মন্তব্য করেছে। রিপোর্টে ১২৯টি দেশের মধ্যে ৫৮টি দেশ এখন স্বৈরশাসনের অধীন এবং ৭১টি দেশকে গণতান্ত্রিক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ২০১৬ সালে তাদের আগের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বিশ্বের ৭৪টি দেশে গণতান্ত্রিক এবং ৫৫টি দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চলছে। ১২৯টি দেশের গণতন্ত্রের অবস্থা নিয়ে যে সূচক এই সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম। এই কলঙ্কের দাগ শুধু ক্ষমতাসীন দলের তা কিন্তু নয়! তবে সরকারের দায়টা একটু বেশি। এই সরকার যতটুকু না উন্নয়ন করেছে তার চেয়ে বেশি আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছে।
দেশের শেয়ার মার্কেট লুট, ডেসটিনি, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও ফারমার্স ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার সাথে সরকার ঘরানার লোকেরাই জড়িত বলে ব্যাপক অভিযোগ। সুতরাং ক্ষতাসীনদের উচিত তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার আগে আয়নাতে নিজেদের চেহারাটা একটু দেখে নেয়া।
সংবিধান অনুযায়ী আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো কয়েক মাস বাকি। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিলেও ভোটের রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি দেশের মানুষ যেমন প্রত্যাশা করেনি তেমনিভাবে বিদেশীরাও কামনা করেনি। নিকট অতীতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টারির প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে সফর করে গেছে। তিন দিনের সফরে এসে প্রতিনিধিদলটি জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছে, যাতে ঘুরেফিরে নির্বাচন, সুশাসন ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠিয়ে থাকে; কিন্তু ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন হওয়ায় তারা কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। এবারো পাঠাবে কি না, তা নির্ভর করছে নির্বাচনী পরিবেশের ওপর। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার সাথে বৈঠকে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধিদল জানতে চেয়েছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বর্তমানে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না? জবাবে সিইসি বলেছেন, এ ব্যাপারে আদালতই সিদ্ধান্ত নেবেন, ইসির কিছু করার নেই। আমরাও মনে করি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আইনি লড়াইকে কোনোভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় হস্তক্ষেপ করা হবে না। আমরা দেখেছি অতীতে নিম্ন আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পরও সরকারি দলের অনেক নেতা উচ্চ আদালতে আপিল করে নির্বাচন করেছেন, মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে ক্ষমতাসীনেরা যেভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করছে তাতে গণতন্ত্রের পরাজয়ের পদধ্বনি ছাড়া আর কিছুই শোনা যাবে না। গণতন্ত্রের আবরণে যখন স্বৈরতান্ত্রিক জুলুম নির্যাতনের শাসন চেপে বসে নিরীহ জনগোষ্ঠীর ওপর তখন সমাজ বা রাষ্ট্রে শান্তি বিরাজ করে না। সিনেমার হিরো বা নায়িকার চশমা দিয়ে বড়জোড় অভিনয় করা যায়, সমাজের নির্যাতিত মজলুম মানুষের আহাজারি বা নির্যাতনের ছবি দেখা যায় না। আর তখন জনগণের মুখের ভাষা বোঝার মতো হিতাহিত জ্ঞান জনপ্রতিনিধিদের মগজে থাকে না। তবে গণতন্ত্রে হঠাৎ করেই ক্ষমতার পরিবর্তন হয় এবং এটি হয় দ্রুততার সাথে। কাউকে জানান না দিয়ে কিংবা কাউকে একটু প্রস্তুতিরও সময় না দিয়ে গণতন্ত্র মোড় নেয় এদিক থেকে ওদিকে। ফলে যারাই শাসন ক্ষমতায় টিকে থাকেন গণতন্ত্রের আবরণে তাদের নৈতিক চরিত্রে, চিন্তায়, মননশীলতায় স্বৈরাচারের গন্ধ যখনই লেগে যায় তখনই বর্ষার বাদলে ডুবে যায় স্বৈরতন্ত্রের সাজানো সিংহাসন।
গণতন্ত্রের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকার ফলেই আফগানিস্তান, ইরাক, লেবানন, মিসর, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ভেঙে পড়েছে। গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে আইয়ুব খান উন্নয়নের জোয়ার প্রচার করেও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এ দেশের জনগণ উন্নয়নের গালভরা বুলি শুনতে চায় না, গণতন্ত্রের বাংলাদেশও দেখতে চায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.