নারীর অগ্রগতি দেশ থেকে দেশান্তরে

খোন্দকার জিল্লুর রহমান

‘সৃষ্টির যা কিছু সুন্দর চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। কোনো কালে একা হয়নিকো জয় পুরুষের তরবারি। শান্তি দিয়াছে-প্রেরণা দিয়াছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।’ ইসলামেও নারীর যথেষ্ট মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সমাজে প্রচলিত আছে, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, গুণবান প্রতি মিলে তার সনে। কথাগুলো অনেক মূল্যবান। নারী মাতা, নারী সুখ, নারী ভালোবাসা, নারী অনুপ্রেরণা। এমন অনেক সুন্দর সুন্দর গল্পগাথা, আছে স্বপ্ন বাস্তবতা, আছে এগিয়ে চলার সাহসিকতা। অনেকে বলে, নারী অবলা, নিরীহ এবং সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। এটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছুটা সত্য হলেও বাস্তবে আমাদের দেশে নারীদের অগ্রযাত্রা অনেক বেশি লক্ষণীয়। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধানবিরোধী দলসহ দুই বিরোধীদলীয় নেতাই নারী সে দেশের নারীর অগ্রযাত্রা কম নয়। আমাদের দেশের নারীরা এখন ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীতে কার্যকর ভূমিকাসহ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সফলভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
আমাদের দেশের নারীরা পিছিয়ে নেই, শ্রম মেধা দক্ষতার পরিচয় দিয়ে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। দুঃসাহসী ও চ্যালেঞ্জিং কর্মকাণ্ডে সফলতার স্বাক্ষর রাখছে আমাদের নারীরা। পুরুষের পাশাপাশি নারী সদস্যরা সেনাবাহিনীতে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। সাহসিকতা ও দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীতে অনেক বাংলাদেশী নারী সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাহসিকতা নিয়ে প্রথম প্যারাসুটার হিসেবে নারী ছত্রীসেনা ক্যাপ্টেন জান্নাতুল ফেরদাউস ২০১৩ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি সফলভাবে ১০০০ ফুট উচ্চতা থেকে অবতরণের সম্মান অর্জন করেছেন। এরপর দ্বিতীয় প্যারাসুটার হিসেবে নুসরাত নুর আল চৌধুরী সফলভাবে অবতরণের সম্মান অর্জন করেন। সেনাবাহিনীতে বর্তমানে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা এক হাজার ২৮০ জন। সর্বোচ্চ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পর্যন্ত কর্মরত আছেন। মেডিক্যাল কোর ছাড়া নিয়মিত কমিশনে মেজর পদেও আছেন নারীরা। ২৩০ জন নারী জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছেন। বর্তমানে ৬০ জন শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত।
পুরুষদের সাথে সাথে নারীদের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান আছে বলেই সেনাবাহিনীতে নারীদের যোগদানের আগ্রহ বেড়েই চলেছে। সেনাবাহিনীর দুই নারী পাইলটের যোগদান উল্লেখযোগ্য। তাদের একজন মেজর নাজিয়া নুসরাত হোসেন আর অন্য জন শাহ্রীনা বিন্তে আনোয়ার।
নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীতে এই প্রথমবারের মতো এত বেশি নারী সৈনিক যোগদান করেন। স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের দেশের নারীরা আর্মি মেডিক্যাল কোরে ডাক্তার ও নার্সরূপে যোগদান করে আসছেন। অন্যান্য কোরেও নারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন সার্ভিসে নারী কর্মকর্তারা দেশে ও বিদেশে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে ২০১৬ সালে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথম একজন নারী নেতৃত্ব দিয়েছেন। আইভরি কোস্টে পাঠানো এই মিশনে ৫৬ জনের মেডিক্যাল কন্টিনজেন্টে নারী কমান্ডার কর্নেল নাজমা বেগম নেতৃত্ব দেন। এই দলে ৬ জন নারী ছিলেন। সেনাবাহিনীতে প্রথম নারী অধিনায়ক হিসেবে ২১ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের নেতৃত্ব দেন তিনি। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর অব মেডিক্যাল সার্ভিসেস হিসেবে ১১ পদাতিক ডিভিশনে বগুড়া সেনানিবাসে তিনি কর্মরত ছিলেন।
বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাত, ভারসাম্যহীন অবস্থান, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ইত্যাদি প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নারীদের অগ্রযাত্রা থেমে নেই। এত অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর নারীর ক্ষমতায়নের প্রায় ১০ বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে যখন দেশ উন্নয়নের রোল মডেলে, তখন স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হিসেবে চতুর্থ নম্বরে বাংলাদেশের নাম থাকাটা খুবই লজ্জাজনক বলে সুশীলসমাজের অনেকেই মনে করেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ার আলোচনায় দেখা যায়, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশেও এটা পরিলক্ষিত হয় বলে অনেকে মনে করেন।
লেখক : উন্নয়নকর্মী, সম্পাদক ও প্রকাশক, অর্থনীতির ৩০ দিন

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.