গভীর উদ্বেগে মিয়ানমার, ফেঁসে যাওয়ার শঙ্কা
গভীর উদ্বেগে মিয়ানমার, ফেঁসে যাওয়ার শঙ্কা

গভীর উদ্বেগে মিয়ানমার, ফেঁসে যাওয়ার শঙ্কা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার এখতিয়ার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) করা আবেদনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মিয়ানমার। প্রসিকিউটর বানসুদা আইসিসির রুল চেয়ে এই আবেদন করেছেন।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার আইসিসি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। সনদের কোথাও বলা নেই স্বাক্ষর করেনি এমন কোনো দেশের ওপর আইসিসির এখতিয়ার রয়েছে। জাতিসঙ্ঘের ১৯৬৯ সালের ভিয়েনা সনদে বলা হয়েছে অনুস্বাক্ষর করেনি এমন কোনো দেশের ওপর আন্তর্জাতিক চুক্তি চাপিয়ে দেয়া যাবে না। সনদের অংশীদার নয় এমন কোনো পক্ষের ওপর এখতিয়ার সম্প্রসারণ করা হলে তা অন্যান্য দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমার কাউকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য করেনি। বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিজ ঘরে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের সাথে মিয়ানমার কাজ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সাথে বেশ কয়েকটি চুক্তি সই হয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে বাস্তুচ্যুত মানুষদের সাথে কথা বলেছেন। তিনি প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসঙ্ঘ

রোহিঙ্গাদের ওপর যৌন সহিংসতা চালানোর দায়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসঙ্ঘ। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘সমষ্টিগতভাবে শাস্তি’ দেয়ার কৌশলের অংশ হিসেবে যৌননিপীড়ন চালানো হয় বলে মন্তব্য করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। আজ সোমবার নিরাপত্তা পরিষদে সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় যৌন সহিংসতারোধ বিষয়ক বৈঠকে এ প্রতিবেদন তুলে ধরা হবে।

নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের প্রতিবেদন আগাম হাতে পাওয়ার দাবি করে এ খবর দিয়েছে মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)। জাতিসঙ্ঘের কালো তালিকায় আওতায় আনা হয়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার, বিদ্রোহী ও চরমপন্থী ৫১টি গ্রুপকে। এতে সঙ্ঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো প্রতিবেদনে অ্যান্তোনিও গুতেরেজ বলেছেন, আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকর্মীরা বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে অনেকের ওপর শারীরিক ও নৃশংস যৌন নির্যাতনের মানসিক ভীতি বহনের ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। মিয়ানমারের সশস্ত্রবাহিনী স্থানীয় মিলিশিয়াদের সাথে নিয়ে এ নিপীড়ন চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের অক্টোবর ও ২০১৭ সালের আগস্টে সামরিক বাহিনীর ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের সময় এসব নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।

গুতেরেজ বলেন, এসব কর্মকাণ্ড রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিপীড়ন, ভয় দেখানো আর সমষ্টিগতভাবে শাস্তি দেয়ার কৌশলের অংশ ছিল। পরিকল্পিত নিপীড়নের মাধ্যমে নিজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করে রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ বন্ধ করা হয়েছে।
মহাসচিব বলেন, যৌন সহিংসতার শিকার বেশির ভাগই ছিলেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নারী ও কিশোরী। দূরবর্তী ও গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করা এসব ভিকটিমের সাহায্য পাওয়ার কোনো সুযোগও ছিল না। নিপীড়নের হাত থেকে গর্ভবতী নারীরাও রেহায় পায়নি। রোহিঙ্গাদের উচ্চহারে গর্ভধারণের প্রবণতা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের কালো তালিকার আওতায় এসেছে কঙ্গোর সশস্ত্র বাহিনী ও জাতীয় পুলিশসহ ১৭টি, সিরিয়ার সশস্ত্রবাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগসহ সাতটি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও দক্ষিণ সুদানের ছয়টি, মালির পাঁচটি, সোমালিয়ার চারটি, সুদানের তিনটি এবং ইরাক ও মিয়ানমারের একটি গ্রুপ। মিয়ানমারে কেবল সশস্ত্রবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরে তালিকায় রয়েছে বোকো হারাম, যারা একাধিক দেশে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

গুতেরেজ বলেন, গণধর্ষণের বেশির ভাগ ঘটনায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসলামি স্টেট (আইএস) বা বোকো হারামের একজন সদস্যকেও আজ পর্যন্ত বিচারের আওতায় আনা যায়নি।
এর আগে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা চালানোর অভিযোগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তা।

গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংস অভিযান চালায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। নিরাপত্তা চৌকিতে বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) হামলাকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলে জানায় দেশটির সেনাবাহিনী।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানায়, সামরিক বাহিনী প্রচারণার মাধ্যমে সেখানকার সমাজকে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী করে তুলেছে। আর সমাজের অভ্যন্তরে ছড়িয়েপড়া সেই বিদ্বেষই রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের কারণ। জাতিসঙ্ঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সব পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিত সেনা অভিযান শুরু হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে পোড়ামাটি নীতিতে চালানো এ অভিযানকে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু মিয়ানমারে মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয়া হয় না। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়, তারা বাংলাদেশ থেকে এসে অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব না থাকায় তারা রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.