নুর আল হুদা হিজাজি
নুর আল হুদা হিজাজি

স্বপ্নগুলো বিবর্ণ হচ্ছে সিরিয়ার বন্দিশিবিরে

আনিসুর রহমান এরশাদ

বাশার আল আসাদের কারাগারে বন্দী থেকে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন নুর আল হুদা হিজাজি। তিনি ছয় বর্গমিটারের একটি ছোট কক্ষে বন্দী থাকা সাত নারীর একজন। ৩০ দিনের বন্দী জীবনে তিনি প্রতিদিন নির্যাতিত হতেন, তাকে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হতো, জোরপূর্বক নগ্ন করা হতো এবং যৌন হয়রানি ও নির্যাতন করা হতো। নুরকে প্রতিদিন খাবার দেয়া হতো শক্ত ও ঠাণ্ডা আলু। কম্বল বিছিয়ে মেঝেতে ঘুমাতে হতো। স্যাঁতস্যাঁতে রুমে গাদাগাদি করে থাকায় কারো ঘুম হতো না। ২৪ ঘণ্টায় তিনবারের বেশি টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হতো না। টয়লেটে প্রতিবারে ছয় মিনিটের বেশি থাকতে দেয়া হতো না। সেনারা ঘড়ি ধরে অপেক্ষা করত। নির্ধারিত সময়ের বেশি সময় নিলেই সেনারা জোর করে দরজা খুলত এবং ঘাড়ে ধাক্কা মেরে বাইরে বের করত।
৩১ বছর বয়সী নুর আল হুদা হিজাজির জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিরিয়ার পূর্ব গৌতায়। তিনি ইউনিভার্সিটি অব দামেস্কে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেছেন। ২০১০ সালে গ্র্যাজুয়েশন করার পর তিনি অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে দামেস্কেও একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। তার জীবন ছিল বিশ্বের অন্য দেশগুলোর তরুণীদের মতোই প্রাণোচ্ছল ও গতিশীল। কিন্তু সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তার আনন্দময় জীবন বিষাদপূর্ণ হয়ে ওঠে, প্রাণচাঞ্চল্য থেমে বিরক্তিতে ভরে যায়। জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে তিনি যুদ্ধাহত সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন। আক্রমণের শিকার ও অবরুদ্ধ মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মহান কাজে ব্রতী হয়েও তাকে বাশার আসাদের সৈন্যদের অতর্কিত হামলার শিকার হতে হয়েছে। মানব সৃষ্ট দুর্যোগে-দুর্ভোগে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়ে তাকে বন্দী করা হয়েছে, স্যাঁতস্যাঁতে কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। বন্দী জীবনের কথা মনে হলেই তার চোখ দু’টি ছলছল হয়ে পড়ে, কথা বলতে গেলেও দুঃসহ সেই ভীতিকর স্মৃতিতে চেহারায় দুঃখ ফুটে উঠে। নুরের মুখের প্রতিটি কথা যুদ্ধের প্রকৃত রূপ তথা বীভৎস-ভয়াবহ অবস্থাকে অনুধাবন করতে সাহায্য করে।
সিরিয়া যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করার কারণে নুরকে বন্দী করা হয়েছিল। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন ও যোগাযোগ করছিলেন। তাদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। চোখ বাঁধা হয় এবং হাতকড়া পরানো হয়; ফলে নির্যাতনকারীদের চেহারাও দেখতে পারেনি। সেনারা তাদের শরীরে যেখানে খুশি সেখানে স্পর্শ করেছে, যৌন হয়রানি করেছে। তারা আটকদের ভিন্ন তিনটি কক্ষে নিয়ে যায়। নুরকে সহায়তা ও ত্রাণ সংগ্রহের কাজে ব্যবহারিত ফেসবুক ও স্কাইপি অ্যাড্রেস এবং পাসওয়ার্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, মানবিক সহায়তা প্রদানকারীদের কাছে পৌঁছা, ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম বন্ধ করা এবং ওষুধ ও অন্যান্য দ্রব্যাদি কোথায় আছে সেই স্থান সম্পর্কে জানা।
নুর পাসওয়ার্ড না দেয়ার কারণে তাকে মেরেছে, রক্তাক্ত করেছে। মারের মাত্রা বেড়েই চলছিল। তাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত হাত দিয়ে তল্লাশি করেছিল এবং সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সে লজ্জা ও অপমানে কাঁপছিল। মধ্যরাতে নুরসহ বিভিন্ন বয়সের সাতজনকে একটি সেলে নেয়া হয়েছিল। সেই কক্ষে ১৩ বছরের ছোট্ট বালিকাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হচ্ছিল; একসময় তার পেট ফুলতে শুরু করেছিল। রুমটিতে বন্দী থাকা পুরুষেরা নুরকে জিজ্ঞাসা করেছিল, যুদ্ধ শেষ হবে কি? বিশ্ব কি আমাদের সাহায্য করবে? নুর বলেছিল, অবশ্যই আমরা আশা করছি, তোমরা সবাই মুক্ত হবে, যুদ্ধ শেষ হবে এবং সব মুসলমান আমাদের সাহায্য করবে। তারা যাতে হতাশায় ভেঙে না পড়ে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত না হয় এবং আশার আলো দেখতে পারে সেই চেষ্টাই করেছিলেন নুর। তাদের কয়েকজন ছিলেন হাফেজ ও ইমাম। তারা যখন কুরআন তিলাওয়াত করত তখন নুর কাঁদতে থাকত।
নুরকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের সাথে যুক্তদের নাম ও তারা কোথায় থাকে জানতে চাওয়া হয়। নুর জানি না বললেই তারা তাকে বৈদ্যুতিক শক দিতে থাকে। শক দেয়া মাত্রই সে যেখানে বসা ছিল সেখান থেকে অন্যত্র লাফিয়ে পড়তে থাকে। তার করুণ অবস্থা দেখে, ব্যথায় চিৎকার শুনে সৈন্যরা খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। সাত ঘণ্টা ধরে টানা এই অসভ্যতা চলতে থাকে; কিন্তু নুর সহযোগীদের নাম প্রকাশ করেনি। আঘাতের পর আঘাত আর গালির পর গালি দিলেও নুর সহ্য করতে থাকে। একদিন সাতটি সাদা কাগজ দিয়ে বলে, ‘আমরা যা বলি তুমি লেখ।’ নুর রাজি না হলেই তাকে অন্য একটি রুমে নিয়ে যায়; যেখানে চারটি বিছানা ও সেনারা ছিল। তাকে হুমকি দেয়া হয়Ñ ‘তুমি যদি না বল, তাহলে সেনারা তোমাকে ধর্ষণ করবে।’ নুর এই নির্যাতন বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারেনি, তারা যা বলে তা কাগজে লিখে দেয়; এর কোনো বিকল্প ছিল না। তারা লিখিয়ে নেয়, নুর সেনাদের সাহায্য করেছে। সে সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে সোস্যাল মিডিয়ায় কাজ করেছে; সেনাদের পক্ষে কাজ করেছে। তারা নুরকে এসব লিখতে ও বলতে বাধ্য করে এবং ক্যামেরায় ধারণ করে। এসব চিত্র সিরিয়ান টেলিভিশনে প্রচার করে। সংবাদে সেনারা বলে, ‘তাদের আটক করা হয়েছে, কারণ তারা বিশ্বাসঘাতক; তারা ভুক্তভোগী নয়, সেনাদের সহযোগী।’
তরুণ ও যুবকদের প্রতিদিন সেলে আনা হতো। তাদেরকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো, গরম পানিতে ঝলসে দেয়া হতো। তীব্র ব্যথায় তারা চিৎকার করত। এসব আর্তনাদ-আহাজারি শুনে নুররা মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত হতেন। শুধু আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং কান্নাকাটি বন্ধ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই তাদের করার ছিল না। ১৭ দিন পর যখন বন্দী কিশোর-তরুণদেরকে সেলে নেয়া হয় তখন প্রতিদিন সবাই ভাবত আজই মুক্তি পাবে। তারা তাদের পরিবারের ফোন নম্বর অতি ক্ষুদ্র কাগজে কিংবা স্যানিটারি প্যাডে লিখে দিত এবং গোপনে অন্যদের কাপড়ে লুকিয়ে রেখে যেত। নুররাও আশা করত মুক্তির খবর পাবেন। পাঁচ দিন অপেক্ষার পরও আশার আলো মেলেনি।
২৭ দিন পর নুরদের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানো হয়। প্রথমে মোটরগাড়িতে চড়ানো হয়। ঘণ্টাখানেক পর বাসে ওঠানো হয়। আরো অনেক নারী-পুরুষসহ গোয়েন্দা বিল্ডিংয়ে নেয়া হয়। রাস্তা দেখে নুর বুঝতে পারেন তারা দামেস্কে আছেন। তাদের একটি সুড়ঙ্গে ঢোকানো হয়। নুর জানতেন আসাদ নারীদের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডে ভয়াবহ জায়গা তৈরি করেছেন, যেখান থেকে মুক্তি মিলবে না! ভয়ে জড়সড় ও কাচুমাচু নুরকে একজন সৈন্য লিফটে উঠান। পরিচ্ছন্ন ফোর দেখে ও সুগন্ধ পেয়ে নুর বুঝেন এটি মৃত্যুকূপ নয়। একটি অফিস কক্ষে দুইজন নারী ও তিনজন পুরুষ ছিল। একজন জেনারেল এসে বলেন, ‘দুইজন তুর্কিস আসবেন, তোমাদের সাথে দেখা করবেন এবং তোমাকে যাই জিজ্ঞাসা করুক, জবাব দিবে এবং বলবে সবকিছু ঠিক আছে, ভালোভাবে চলছে।’ নুর রাজি হন।
আইএইচএইচ হিউমেনেটেরিয়ান রিলিফ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ইয়ালদিরিম ও শাহীন এলেন। তারা বললেন, ‘আমরা তুরস্ক থেকে এসেছি। আশা করছি আমরা আপনাকে বন্দী জীবন থেকে মুক্ত করতে পারব।’ নুররা সেলে ফিরে গেলেন। দুই দিন পর আইএইচএইচের সহযোগিতায় ছাড়া পেলেন। তারা চাইলে পরিবারসহ তুরস্কে যেতে পারেন বলে জানানো হলো। কিন্তু নুর সিরিয়াতেই আসাদের সেনাদের নিপীড়নের শিকার মানুষের সেবা করতে নার্স হিসেবে কাজ শুরু করলেন। যুদ্ধে এতিম হওয়া ২৫০ শিশুদের নিয়ে এতিমখানা চালু করলেন। পরে সেখানে দুই হাজার এতিমের আশ্রয় মিলে।
বাবা-মাকে দেখতে বেলজিয়ামে যেতে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল নুরের। তিনি আইএইচএইচের শাহীনকে ফোন করে ধন্যবাদ জানালেন। শাহীন বললেন, ‘নুর তুমি অপেক্ষা কর। আমরা আসব এবং তোমাকে ইয়ালদিরিমের কাছে নিয়ে যাব। সাগর পথে ইউরোপ যাওয়া খুব কঠিন, তুমি মারাও যেতে পার; আমরা এটা হতে দিতে পারি না। তুমি আমাদের সাথে কাজ কর, ডকুমেন্টস প্রস্তুত কর এবং বাবার সাথে দেখা করতে বৈধপথেই যাও।’ পরে নুর আইএইচএইচের সাথে কাজ শুরু করেন এবং ইসলামিক ইকোনমিকসে মাস্টার্স পড়ার জন্য আবেদন করেন। নুর তার মাতৃভূমিকে খুবই মিস করেন। তিনি ভাবেন কেন এমন ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটল! সাজানো-গোছানো সবকিছু তছনছ হয়ে গেল, এত বেশি মানুষকে নির্মমভাবে কেন মরতে হলো! নেই কাজের সুযোগ কিংবা স্বাধীনতা, এখনো সে এখনো আশা ছাড়েনি। স্বাধীনতা হচ্ছে আশীর্বাদ, যার প্রকৃত মূল্য কেউ জানে না। মুক্ত স্বাধীন জীবনে ফিরতে নিয়মিত প্রার্থনা করেন নুর।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.