গুম-খুন হওয়াদের স্বজনদের নিয়ে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক শিশু তার বাবার ছবি দেখাচ্ছে : নাসিম সিকদার
গুম-খুন হওয়াদের স্বজনদের নিয়ে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এক শিশু তার বাবার ছবি দেখাচ্ছে : নাসিম সিকদার

স্বজনহারাদের কান্নায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মুখ

নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বজনহারাদের কান্না থামছে না; বরং যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। বাড়ছে সন্তানের জন্য মা-বাবার কান্না, স্বামীর জন্য স্ত্রীর কান্না, ভাইয়ের জন্য বোনের কান্না, বাবার জন্য সন্তানের কান্না। অনেকে কান্নার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন। সন্তানের পথের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন। অনেকে হয়েছেন শয্যাশায়ী।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত গণশুনানিতে গুম হওয়া মানুষগুলোর পরিবারের সদস্যরা এভাবেই তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরলেন। এ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল অন্তত অর্ধশত পরিবার। তাদের হাতে ছিল নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড, অনেকের হাতে শুধুই ছবি। নিখোঁজ নুরুল আলম নুরুর ছবি দেখিয়ে তার ছোট্ট শিশু বারবার বলছিল বাবা, বাবা। নুরাজের মতো অনেকের কাছে বাবা এখন শুধু ছবির মধ্যে। পারভেজের ছোট মেয়ে হৃদিও ছবির মধ্যেই কেবল তার বাবাকে খুঁজে পায়।
গুম হওয়া মানুষের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭২৭ জন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এলেও বেশির ভাগ নিখোঁজ। তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ বার সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এখন তারা অন্তত স্বজনের লাশ ফেরত চান।
গণশুনানিতে স্বজনহারা মানুষগুলো বক্তব্য রাখেন। ভৈরব থেকে নিখোঁজ শাহিনুর আলমের ভাই মেহেদি হাসান বলেন, ‘আমার ভাইয়ের নামে কোনো মামলা ছিল না। সে কোনো রাজনীতি করত না। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল র্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পের সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। আমরা সব জায়গায় খুঁজেও তাকে পাইনি। সাত দিন পর জানতে পারি আমার ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেছে। পরে আমরা বিচারের আশায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে একটি মামলা করি। ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুন নাহার মামলা আমলে নেন। কিন্তু সেই মামলা এখনো ঝুলে আছে। কোনো শুনানি হয়নি।’
গুম হওয়া মুন্নার বাবা নিজাম উদ্দিনের শেষ আকুতি ছিল তার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে না পারলেও অন্তত কবরটি দেখিয়ে দেয়ার। নিজাম উদ্দিন বেঁচে নেই। সন্তানের অপেক্ষায় থেকে মারা গেছেন মুন্নার মা, সূত্রাপুরের পারভেজ হাসানের বাবা এবং শ্বশুর।
চট্টগ্রামের নুরুর স্ত্রীর দাবি, তার চোখের সামনেই পুলিশ পরিচয়ে তার স্বামীকে তুলে নেয়া হয়। বাসায় গিয়ে কলিংবেল চেপে পুলিশ পরিচয় দেয়ায় তিনি গেট খুলে দেন। খালি গায়েই তার স্বামীকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায় তারা। ভোর ৪টায় খবর আসে তার লাশ পাওয়া গেছে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে। তার মাথায় দুইটি গুলি করা হয়েছে। তিন মাসের শিশু রেখে গেছে সে। সেই শিশু বড় হয়ে গেছে এখন। বাবা বলে কিছু নেই তার।
ফরিদপুরের মঞ্জুরুল মওলা। মাদরাসায় পড়ালেখা করতেন তিনি। ২০১৫ সালে তাকে তুলে নেয়া হয়। এরপর দুই দিন থানায় রাখা হয়। থানা থেকে দ্বিতীয় দিন রাতে নির্জন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাথায় অস্ত্র ঠেকানো হয়। এরপর তিনি যে সেখান থেকে কিভাবে জীবিত ফেরত এসেছেন সেই কথা মনে পড়লে আজো ভয়ে থাকেন।
একইভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সিলেটের বদরুল আলমকে। ২০১৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় কয়েকটি গাড়ি তার গতি রোধ করে তুলে নিয়ে যায়। তার নামে কোনো মামলা ছিল না। তিনি বলেন, ‘আমাকে তুলে নিয়ে বলা হয়েছিল রাইফেলের বাঁট দিয়ে পা ভেঙে দেবো, তোকে মেরে ফেলবো। তাদের অত্যাচারে ২১ দিন আমি হাসপাতালে ছিলাম চিকিৎসাধীন। সেখান থেকে আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। তারপর আমার নামে ১১টি মামলা দেয়া হয়।’
রেহানা আজাদ মুন্নির ভাই পিন্টুকে সাদা পোশাকধারীরা নিয়ে যায়। ডিবি, র্যাব সব জায়গায় খোঁজ নেয়ার পরও কোথাও পিন্টুকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার মা পাগল হয়ে গেছেন। মুন্নির জিজ্ঞাসা সরকারের কাছে, ‘আপনাদের কি কোনো দায় নেই? এভাবে বেঁচে থাকা যায়?’ গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা বলেন, ‘আমার ভাইকে র্যাব-১ এর গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে ফেরত পাওয়ার আশায় আজ পর্যন্ত ২৫ বার প্রেস কনফারেন্স করেছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা পেলে আমাদের ভাইকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কোনো সংস্থা দেশের কোনেও নাগরিককে এভাবে গুম করতে পারে না। গুম করার পর তাদের কী রকম টর্চার সেলে রাখা হয় আমি জানি না। সে বেঁচে আছে নাকি তা-ও জানি না। আমার ভাইয়ের দোষ ছিল সে বিএনপি করত। পুলিশ আমাদের কোনো মামলা নেয়নি। কোর্টে রিট করেছি, কোনো অগ্রগতি নেই। যতক্ষণ তারা ফিরে না আসে আমরা রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’
২০১০ সালের ২৫ জুন রাজধানীর ইন্দিরা রোড থেকে অপহৃত হন বিএনপি নেতা ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড সাবেক কমিশনার চৌধুরী আলম। আজো তার খোঁজ নেই। এভাবে ৮-১০ বছর ধরে যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদেরও অনেক স্বজন হাজির হয়েছিলেন ‘মায়ের ডাকে’। স্বজনহারাদের এ কান্নায় যোগ হচ্ছে নিত্য নতুন মুখ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.