বাংলাদেশে গুম-খুন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে

যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার প্রতিবেদন
কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, বেআইনি আটক ও নির্যাতনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। এখানে কথা বলার অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং এনজিওদের তৎপরতার সুযোগ সীমিত। এ দেশে জবাবদিহিতার অভাবে দুর্নীতি, সহিংসতা, লিঙ্গ বৈষম্যের ব্যাপকতা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে মানবপাচার, শ্রম অধিকার ও শিশু শ্রমের গুরুতর সমস্যা।
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে ২০১৭ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়াসহ বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের ওপর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর নিয়মিতভাবে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এসব প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, বিচারহীনতার কারণে নিরাপত্তা বাহিনী ক্ষমতার অপব্যবহার করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার বা হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকার খুব কমই তদন্ত করছে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনছে। অপরাধ সংঘটিত হলেও আস্থাহীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে জনগণ সহায়তার জন্য পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকে।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গুম ও অপহরণ অব্যাহত রয়েছে, যার সাথে নিরাপত্তা বাহিনীও জড়িত। গুমের পর নিরাপত্তা বাহিনী কাউকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দিয়েছে, কাউকে গ্রেফতার করেছে, কাউকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, আবার কারো খোঁজ একেবারেই পাওয়া যায়নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর ৬০ জন মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত তিন ব্যক্তির তিন ছেলেকে ২০১৬ সালের আগস্টে আটক করা হয়। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী তারা তাদের বাবাদের ফাঁসি বানচালের ষড়যন্ত্র করছিলেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কখনোই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি। আটকের সাত মাস পর হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে মীর আহমেদ বিন কাশেম ও আমান আজমী নিখোঁজ রয়ে যান। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয় থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে ৪০ জন গুমের শিকার হয়েছেন বলে জানানো হয়। জাতিসঙ্ঘের গুমবিষয়ক কার্যকর গ্রুপ বাংলাদেশ সফর করতে চাইলেও সরকার সাড়া দেয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, বাংলাদেশের সংবিধানে নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক শাস্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও পুলিশ এ ধরনের নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও মিডিয়ায় অভিযোগ করা হয়েছে। অধিকারের মতে, গত বছর ১২ ব্যক্তি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে মারা গেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধান শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু সরকার এই দুই অধিকারের ওপরেই বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চারজনের অধিক মানুষের সমাবেশ নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে আইনের মাধ্যমে সরকারের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। ঢাকায় সমাবেশ-মিছিলের আগে পুলিশের কাছ থেকে আগে থেকে অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে। বিরোধী দলের সমাবেশ কর্মসূচিতে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে এটিকে ব্যবহার করা হয়। প্রতিবাদ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অথবা ক্ষমতাসীন দল মাঝে মধ্যে শক্তি প্রয়োগ করে।
এতে বলা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ সংবিধানে বাকস্বাধীনতার অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকার অনেক সময় এই অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ব্যর্থ হয়। বাকস্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এখানে উল্লেখযোগ্য। অনেক সাংবাদিক হয়রানি ও রোষানলের ভয়ে সরকারের সমালোচনার ক্ষেত্রে স্বআরোপিত সেন্সরশিপ আরোপ করছেন। অনেক মুক্ত সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চাপে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করা হয়েছে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোকেও বিজ্ঞাপন প্রত্যাহার করতে এসব সংস্থা থেকে চাপ দেয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর নিয়ন্ত্রণে সরকার বিজ্ঞাপনকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে রাজনৈতিক পক্ষপাত ও স্বআরোপিত সেন্সরশিপ এখনো একটি সমস্যা।
এতে বলা হয়, যেসব মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করেছে তারা চাপের মুখে পড়েছে। মাঝে মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, হয়রানি ও ভীতি প্রদর্শন করে। গত অক্টোবরে একটি অনলাইন নিউজ আউটলেটের সাংবাদিক উৎপল দাস নিখোঁজ হন। ডিসেম্বরে তাকে ফিরে পাওয়া যায়। ফিরে আসার পর উৎপল দাস যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের অভিযোগ, ভীতি প্রদর্শনের পদ্ধতি অনুসরণ করে তাকে জোর করে গুম করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সামাজিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুবাশ্বের হাসান গত বছর ৪৪ দিন নিখোঁজ ছিলেন। দ্য ওয়্যার নামে একটি সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট অভিযোগ করে যে, একটি বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা তার এই নিখোঁজের জন্য দায়ী। পরে দ্য ওয়্যার ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয় সরকার। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের মতে, ১৭ মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশে বাংলাদেশ দূতবাসগুলোয় একটি চিঠি পাঠানো হয়। বাংলাদেশী কোনো সাংবাদিক বিদেশ সফরে গেলে তাদের ওপর নজরদারি করতে এতে মিশনগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে এমন বক্তব্যকে আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু ঘৃণামূলক বক্তব্যের সংজ্ঞা কী তা আইনে পরিষ্কার করে বর্ণনা করা হয়নি। এর ফলে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সরকার শক্তি প্রয়োগের সুযোগ পায়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যায়, বিদেশী বন্ধুপ্রতীম দেশের বিরুদ্ধে যায়, আইনশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যায়, নৈতিকতার বিরুদ্ধে যায়, আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে, মানহানি হয় অথবা অপরাধকে উসকে দেয়- এমন সব অভিযোগে যে কারো বক্তব্য সীমিত করতে পারে সরকার।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংস আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। দৃশ্যত তা আন্তর্জাতিক সহিংস চরমপন্থা দ্বারা অনুপ্রাণিত। এছাড়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। গত ১১ নভেম্বর ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে দেয়া ফেসবুক পোস্টের গুজবে রংপুরে স্থানীয় মুসলমানরা ৩০টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর ও জ্বালিয়ে দেয়। এনজিওদের মতে, বাংলাদেশে বর্ণ ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। অনেক দলিত (নিম্ন বর্ণের হিন্দু) ভূমি, পর্যাপ্ত আবাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুবিধাবঞ্চিত।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.