আমিও বলতে চাই জন্ম থেকে জ্বলছি

আমি আর রুবি। যখন আমাদের বয়স সাত কি আট, সেই বয়স থেকে আমরা সুখী সংসারের দুই ভাই-বোন। বাবা চাকরি করতেন শহরের কোনো এক বড় অফিসে। প্রতি শুক্রবার নিয়ম করে বাবা শহর থেকে দুনিয়ার খানাপিনা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। দাদী আমাদের মাকে বাবার সামনে ডেকে এনে বলতেন ‘বউ, সব তুমি খাবে। কিছুই তো খাও না।’ মা কোনো কথা না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন। দাদীর এমন কর্মকাণ্ডে সেই বয়সেই আন্দোলিত হতাম সত্য, কিন্তু কিছুই করতে পারতাম না। শনিবার সকালে বাবা শহরে চলে গেলে আগের মতো শুরু হয়ে যেত আমাদের মায়ের ওপর দাদীর যত্তসব অশালীন আচরণ। নানাজান আমাদের প্রচুর সম্পদ দেখে হয়তো ভেবেছেন মেয়েকে এই বড় ঘরে বিয়ে দিলে মেয়ে তার সুখে থাকবে, কিন্তু নানাজান জানতেন না তার সোনার মতো মেয়েকে তার দজ্জাল শাশুড়ি সারা জীবন অশান্তির আগুনে জ্বালাবেন। সবই ভাগ্য। এই ভাগ্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুর্ভাগ্য। আমাদের সুন্দরী মা এই রাজকীয় সংসার করতে এসে শাশুড়ির নির্যাতনের মধ্যে সাগরে প্রতিনিয়ত ডুবতে ডুবতে বেঁচে আছেন। তার সুখ নেই। নারী হয়ে জন্মালে আজকের পৃথিবীতে সুখ কুড়িয়ে পাওয়া অনেক প্রতীক্ষার।

২.
রুবির বিয়ে হয়েছে চার মাস আগে। এই সংসারের বউ হয়ে আসা আমার মা একে একে জন্ম দিয়েছেন আমাকে আর রুবিকে। আবার এই সংসার থেকে অন্য এক অচেনা সংসারে পাঠানো হয়েছে রুবিকে। মেয়েদের শেষ আশ্রয় নাকি শ্বশুরবাড়ি!
সেই শ্বশুরবাড়িতে রুবির সুখশান্তি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রুবির একমাত্র ননদ রুমা যখন-তখন দোষ খোঁজে ভাবীর। রুমার গায়ের রঙ মিশমিশে কালো বলে সুন্দরী ভাবীর প্রতি তার তীব্র হিংসা। বেলায়-অবেলায় রুবির খুঁত খোঁজে। শুনেছি রুমার নাকি মুখের ভাষা খুবই কুরুচিপূর্ণ। রুবি আমাদের বাড়ি এলে মায়ের কাছে সব ব্যাখ্যা করে চোখের জলে। মা কাঁদেন। রুবি কাঁদে। পাশের ঘর থেকে ওদের কান্না শুনলে আমার বুকটা খাঁ খাঁ করে। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে হয় রুবিকে ওই বাড়িতে আর পাঠাব না। কিন্তু মা কড়া গলায় বলেন, ‘আজে বাজে কথা কইবি না। স্বামীর ঘরই মেয়েদের জন্য জান্নাত।’ আমি মনে মনে বলি ‘তাহলে ওই জান্নাতে রুবির শান্তি নেই কেন? নাকি রুবির সর্বোপরি মেয়েদের জন্মই হয়েছে অশান্তির জন্য?’

৩.
হাসি নামে হাসি হলেও তার মুখে কখনো হাসি নেই। তবু মুখটি বড়ই মায়াবী। হাসির সাথে আমার বিয়ের বয়স এখন দেড় মাস। হাসিকে ভাগ্যবতী বলা চলে। কারণ, আমার মায়ের কাছ থেকে সে যথাযোগ্য পুত্রবধূর মর্যাদা পাচ্ছে, যে মর্যাদা আমার মা তার শাশুড়ির কাছ থেকে কখনো পাননি।
বিয়ের পর প্রথম শ্বশুরবাড়ি গিয়ে জানলাম আমার শাশুড়ি হাসির সৎমা। সেই সৎমায়ের ঘরে খুব করুণভাবে বড় হয়েছে হাসি। মেয়েকে এত অত্যাচার করছে তার সৎমা, অথচ আমার শ্বশুর নাকি কোনো দিন এর প্রতিবাদ করেননি।
দ্বিতীয়বার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তো বিশাল কেলেঙ্কারি। কী বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শাশুড়ি আমার সামনেই হাসিকে এলোপাতাড়ি মারতে লাগলেন। এ দৃশ্য আমার সহ্য হচ্ছিল না দেখে হাসিকে নিয়ে ওই বাড়ি থেকে চলে এলাম। মেঠো পথের রিকশায় আমি আর হাসি। হাসি কাঁদছে। খুব বিষাদ মাখানো কান্না। হাসিকে বললাম, ‘আমরা আর কোনো দিন এ বাড়ি আসব না।’ হাসি বলল, ‘জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মা কোনো দিন আমাকে বুকে টেনে একটু আদর করেনি।’ মনে মনে বলি ‘তুমি যে নারী, অনাদরে বড় হওয়ার জন্য তোমাদের কারো কারো জন্ম।’

৪.
ওই পাড়ার বিউটি ভাবীকে আমার বড় আপন লাগে। রফিক ভাই খুব ভাগ্যবান এমন একজন বউ পেয়ে। অথচ দিনে দিনে জেনেছি তাদের সংসারে অশান্তি। অশান্তির সূত্রপাত রফিক ভাইয়ের দ্বিতীয় বিয়ে। এমন একজন সুন্দরী বউ থাকার পরও পরকীয়ায় জড়িয়ে রফিক ভাই নাসিমা নামে একজনকে বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন দূরের শহরে। বিশ্বাস করা স্বামীটার এমন অপকর্ম মানতে না পেরে এক সূর্যোদয়ের আগে আগে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন বিউটি ভাবী। মৃত্যুর আগে নথি ডায়েরিতে বিউটি ভাবী লিখে গেছেনÑ তার লম্বা সংসারের অন্তরালে থাকা সমস্ত যন্ত্রণার নীল বর্ণনা।
নারীর জন্মই হয়তো কোনো-না-কোনো দুঃখকষ্টের বোঝা বহন করতে। তা না হলে আমার মা, আমাদের রুবি, আমার স্ত্রী হাসি, কিংবা বিউটি ভাবীর জীবনের কোনো-না-কোনো অংশ জুড়ে কেবল এমন এত এত কষ্ট জড়িয়ে থাকবে কেন? তাদের কেউ কেউ জন্ম থেকে এভাবে জ্বলবে কেন?
জোবায়ের রাজু
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.