মেয়েদের হোস্টেল

বদরুন নেসা নিপা

ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য সারা দেশ থেকেই মেয়েরা আসে ঢাকায়। ঢাকায় থাকার জন্য তাদের ভরসা ছাত্রী হোস্টেল। ছাত্রী হোস্টেল নিয়ে লিখেছেন
বদরুন নেসা নিপা

পাবনার মেয়ে ইয়াসমিন। চাকরির জন্য ঢাকায় এসেছেন। ঢাকায় আত্মীয় বলতে তেমন কেউ নেই। আছেন দূর-সম্পর্কের এক ফুফু। কিন্তু ইয়াসমিন জানে মধ্যবিত্তের সংসারে বাড়তি লোকের থাকাটা সব দিক থেকেই অস্বস্তিকর। তাই নিজের থাকার জন্য ঢাকা শহরে একটি জায়গা প্রয়োজন। যেখানে নিরাপত্তার সাথে স্বস্তিও মিলবে। কিন্তু এ অচেনা শহরে এমনটি পাওয়া একজন মেয়ের জন্য খুব সহজ নয়। আজকাল লেখাপড়া বা ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছেন অজস্র মেয়ে। তাদের অনেকেরই যেমন আত্মীয়স্বজন থাকে না, তেমনি কারো কারো থাকলেও বিভিন্ন কারণে সেখানে থাকা সম্ভব হয় না। তাই এসব মেয়ের জন্য ঢাকায় বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কয়েকটি হোস্টেল। এগুলোতে বসবাস করছেন একটা বড়সংখ্যক শিক্ষিত নারীসমাজ। যারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য চার দেয়ালের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে ব্যস্ত নগরজীবনে। আগে যেখানে সমাজ পারিপার্শি¦কতার কথা চিন্তা করে বাড়ি থেকে দূরে কোথাও গিয়ে মেয়েদের কিছু করার কথা ভাবা ছিল কঠিন, সেখানে এখন আশার আলো দেখিয়েছে আবাসিক হোস্টেলগুলো। এখন ছাত্রী থেকে কর্মজীবী নারী, যে কেউ তার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজের মতো থাকতে পারেন এ ধরনের একটি হোস্টেলে। ছাত্রী বা মহিলা হোস্টেলগুলো বেশির ভাগ ঢাকার আবাসিক এলাকা যেমনÑ ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড, মিরপুর, শেওড়াপাড়া, মনিপুরিপাড়া, লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, খিলক্ষেত, কলাবাগান, জিগাতলা ও বেইলি রোডসহ বেশ কিছু এলাকায় অবস্থিত।
এসব হোস্টেলে ঢাকার বাইরের হাজার হাজার মেয়ে বাস করছে। কোনো কোনো হোস্টেল আবার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে অবস্থিত।
হোস্টেলের জীবনেও রয়েছে একটা আলাদা আনন্দ। বাবা-মা পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দূরে নিঃসঙ্গ থাকার যে কষ্ট, তা একই সাথে বসবাসকারী সমমনাদের সহানুভূতি ও আন্তরিকতা খুব সহজেই এ অভাবগুলো পুষিয়ে দেয়। কথা হয় ফার্মগেটের এক ছাত্রী হোস্টেলে তন্নির সাথে। হোস্টেল জীবন নিয়ে তিনি বলেন, এখন নিজের বাসার মতোই মনে হয়। বছরের বেশি সময় বাড়ির চেয়ে হোস্টেলেই থাকা হয়। বাবা-মা-ভাইবোনের আদর পাচ্ছি এখানকার বড় আপুদের কাছ থেকে। শরীর খারাপ করলে বড় আপুরা এবং হোস্টেল কর্তৃপক্ষ যতœ-খেয়াল রাখেন। ছুটির দিনে হোস্টেলের সবাই মিলে একসাথে খাই, গল্প করি, কখনো একসাথে ঘুরতে যাই ও কেনাকাটা করি। এটাও আমাদের একটি পরিবার।
আজিমপুরের হোস্টেলের বাসিন্দা মলি। ছাত্রীজীবন কলেজের হোস্টেলে কেটেছে। এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। এক বছরেরও বেশি সময় কেটেছে এ হোস্টেলে। তিনি বলেনÑ এক সাথে অনেকগুলো মেয়ে থাকায় এবং হোস্টেলগুলো আবাসিক এলাকার ভেতরে হওয়ায় বাসাভাড়া করে থাকার চেয়ে হোস্টেলে থাকা অনেকটা নিরাপদ। তা ছাড়া একা মেয়েদের বাড়িভাড়া পাওয়াটাও দুষ্কর। তারপর বাড়িওয়ালাদের চাহিদামতো ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানারকম শর্ত। সে ক্ষেত্রে হোস্টেলে থাকাটা নির্ঝঞ্ঝাট। খাবার প্রসঙ্গে বলেন, হোস্টেলে খাবার খুব উন্নত মানের না হলেও খারাপ না। হোস্টেলে থাকা অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিদিন হোস্টেলে ফিরতে হবে এবং অডিটিং বুকে সাইন করতে হবে, অন্যথায় হোস্টেল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারবে। নিজেদের স্বার্থেই এসব নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুললেই একা শহরে জীবনযাপন করা অনেকটাই নিরাপদ ও স্বস্তির হবে বলে তিনি মনে করেন। হোস্টেলগুলোতে সাধারণত এক থেকে ছয় সিটবিশিষ্ট রুম থাকে। সিট অনুযায়ী প্রতি রুমের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত সিট ভাড়ার সাথে খাবার খরচও অন্তর্ভুক্ত। রুমগুলোতে থাকে খাট, ডেস্ক টেবিল, চেয়ার, বুকসেলফ ও আলমারি। বিনোদনের জন্য থাকে টিভি, বই ও ইনডোর গেমস। এ ছাড়া ফিল্টার পানি, গরম পানি, ফোন প্রভৃতির ব্যবস্থা। থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার ব্যবস্থা। হোস্টেলে ভর্তির সময় ফরম পূরণ করতে হয়। নির্দিষ্ট ফি ও সিকিউরিটি মানি (জামানতের টাকা) দিতে হবে। ছবি, পরিচয়পত্র, আইডি কার্ড, অভিভাবকদের পরিচয় ও ছবি দিতে হয়। নির্দিষ্ট চার্জের বিনিময়ে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হয়। প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে মাসিক ফি পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। হোস্টল ত্যাগের এক মাস আগে হোস্টেল সুপারকে অবহিত করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে প্রতিদিন হোস্টেলে ফিরতে হবে। অন্যথায় কর্তৃপক্ষ যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে।’ বললেন লালমাটিয়ার হোস্টেল সুপার।
হোস্টেলের একজন ছাত্রী সুমি। এত দিন ঢাকায় ছিলেন কম্পিউটারে ডিপ্লোমা কোর্স করার জন্য। হোস্টেল ছাড়ার কথা মনে করতেই খুব কষ্ট হয়, কান্না পায়। হোস্টেলের সবার প্রতি সুমি খুব কৃতজ্ঞ। নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে ওকে সর্বক্ষণ সহযোগিতা করেন হোস্টেলের বন্ধুরা। হোস্টেলে সবার সাথে থাকার মানসিকতা সৃষ্টি হয় বলেই নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে ওকে সর্বক্ষণ সহযোগিতা করেন হোস্টেলের বন্ধুরা। হোস্টেলে সবার সাথে থাকার মানসিকতা সৃষ্টি হয় বলেই সহযোগিতা-সহমর্মিতা, সহানুভূতির মতো মানসিক গুণগুলো যেন সবার মধ্যে এমনিতেই সৃষ্টি হয়।
কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং অথবা চাকরি যেকোনো কারণেই হোক না কেন, স্বস্তিতে বসবাসের জন্য আজকাল মেয়েরা হোস্টেলে উঠছেন। এটি এক দিকে নারী প্রগতির স্মারক, অন্য দিকে, নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতিচ্ছবি। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও একটি মেয়ের একা থেকে কোনো কিছু করাকে কোনোভাবেই সাপোর্ট করা হতো না। নিরাপত্তার প্রশ্নটা ছিল ব্যাপক। হোস্টেলগুলোর আশানুরূপ সেবার ফলে সে সমস্যা দূরীভূত হয়েছে। নারীরা আজ তার লক্ষ্য পরিপূর্ণ করার জন্য এখন আর পিছিয়ে থাকছে না। সরকারকে আরো উদ্যোগী হতে হবে নারীদের আবাসন সুবিধা সৃষ্টিতে। স্বল্প খরচে উন্নত সুযোগ সুবিধা ও নিরাপদ আবাস যাতে পায় নারীরাÑ এটাই কাম্য।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.