আমার মা সবচেয়ে ভালো : মো: আবদুস সালিম, কলামিস্ট

মে মাস এলে আমার মায়ের কথা বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই মনে পড়ে। কারণ, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমার মা নুরুন নাহার বেগম সবার মায়া ও ভালোবাসা ছিন্ন করে না-ফেরার দেশে চলে যান। সালটা ছিল ১৯৮৪-এর রমজান মাস। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমার মাকে পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অপারেশনের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ইনজেকশন দিয়ে অজ্ঞান করেছিলেন চিকিৎসকেরা। নির্দিষ্ট সময় পর চিকিৎসকদের কাছে মায়ের খবর জানতে চাইলে তারা আমাদেরকে শুধু ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করার কথা বলেন। পরে সিনিয়র চিকিৎসক এসে বললেন, ‘আপনাদের মাকে বাঁচানো গেল না।’ এ কথা শুনে আমরা সবাই কান্নায় ভেঙে পড়ি। তখন আমরা ভাবছিলাম, এমন খারাপ সংবাদ কী করে বাসায় দিই। তারপরও মায়ের মৃত্যুর খবর আমাদের বাসার মানুষ ঠিকই জেনে গেছে। সেখানেও কান্নার রোল। মা যখন মারা যান তখন আমি বেশ ছোট। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বেশ আগে থেকে মা মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। মা বলতেন, ‘আমার অসুস্থতা নিয়ে তোমরা দুশ্চিন্তা করো না, সময় হলে ঠিকই অসুখ ভালো হয়ে যাবে।’ এমন কথা শুনে আমার বাবাও একটু ভরসা পেতেন। আমার মা টিউমারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ক্রমেই তা জটিল পর্যায়ে নিয়ে যায় মাকে। কে জানত, এই টিউমারই মাকে শেষ পর্যন্ত না-ফেরার দেশে নিয়ে যাবে। তবে মা বিছানায় পড়ে থাকার মতো অসুস্থ ছিলেন না মৃত্যুর আগে। এ কারণে অনেকেই বুঝতে পারেননি আমার মা শারীরিকভাবে অসুস্থ। মৃত্যুর খবর শুনে অনেকেই বলতে থাকেন, তাকে তো অসুস্থ থাকতে দেখিনি অথচ ঠিকই মৃত্যুর খবর শুনলাম; যা ভাবতেও পারিনি। তিনি না থাকায় আমাদের মধ্যে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা কী দিয়ে পূরণ হবে আমরা জানি নাÑ এমন কথাও বলতে থাকেন আমাদের প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন।
আমার মা ঢাকার ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। যাত্রাবাড়ীর একটি সেলাই প্রশিক্ষণেরও শিক্ষক ছিলেন। টিউশনিও করতেন। এত ব্যস্ততার মধ্যে সাংসারিক কাজও করতেন। তাই ছুটির দিনেও বলতে গেলে অবসর পেতেন না। ভাই-বোনদের মধ্যে আমি সবার ছ্টো বলে মা প্রায়ই আমার জন্য মজার মজার খাবার তৈরি করতেন। আমি মজা করে ওসব খেতাম। অন্যদেরও দিতাম হাসিমুখে। মা তা দেখে খুশি হয়ে আমাকে কোলে জড়িয়ে ধরতেন। তাতে আমিও খুশি হতাম।
বেশি দুষ্টুমি করলে মা আমাকে তা না করার জন্য বলতেন। এ জন্য মাঝে মধ্যে সামান্য শাসন করতেন। তাতে আমার মন খারাপ হলে মা সাথে সাথে আমাকে কোলে তুলে নিতেন। আমার মন খুশি হয়ে যেত। তখন আমি বলে উঠতাম, আমার মা সবচেয়ে ভালো। আমার এমন কথা শুনে মা-ও খুশি হতেন। বলতেন, তোমাকে বল ও খেলনা কিনে দেবো। পরে তা কিনেও আনতেন আমার জন্য। তা পেয়ে বন্ধুদের সাথে নানা খেলায় মেতে উঠতাম। খেলা শেষে বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলে মা আমার সন্ধানে বের হতেন। আমাকে দেখলে বলে উঠতেন, ‘এই যে আমার কাজল (আমার ডাকনাম) মানিক।’
মা সবাইকে নামাজ আদায় করা, কুরআন পড়া ইত্যাদি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার পরামর্শ দিতেন। অনেককে কুরআন শরিফ, জায়নামাজ, ধর্মীয় বই ইত্যাদি উপহার দিতেন। অনেক সময় ধর্মীয় আলাপ-আলোচনায় সময় ব্যয় করতেন। কারো কোনো রকম আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যা দেখা দিলে তা থেকে মুক্তির জন্য তারা আমার মায়ের পরামর্শ নিতেন। মা যেসব পরামর্শ দিতেন, সে মোতাবেক চলে অনেকেই উপকার পেতেন। এসব কারণে সবাই মাকে বলতেন ‘মাস্টারনি আপা’। তা শুনে মা-ও খুশি হতেন। আর বলতেন, ‘আমি আপনাদের জন্য এমন কী-ই বা করি। অনেককে টাকা ধার দিতেন। অনেকের কাছ থেকে তা ফিরিয়ে নিতেন না।
সবাই আমার মায়ের রান্না করা খাবার খেয়ে বলতেন, আপনি অল্প সময়ে এত মজার মজার খাবার তৈরি করেন কিভাবে। মা-ও অনেককে নানা ধরনের খাবার তৈরি বা রান্না করার ভালো কৌশল শেখাতেন। মাঝে মধ্যেই পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, পায়েস, পিঠা ইত্যাদি তৈরি করতেন। অনেকে এসব তৈরি করার জন্য আমার মাকে তাদের বাসায় নিয়ে যেতেন। তার কিছু অংশ তারা মায়ের কাছে দিতেন আমাকে খাওয়ানোর জন্য। সেই মজাদার খাবার মা আমাকে আদর করে নিজ হাতে খাওয়াতেন। আমার মা কারো সাথে মেজাজ বা রাগ করে কথা বলতেন না। বলতেন, কোনো কারণে কারো সাথে সম্পর্ক খারাপ করা ঠিক না, তা আল্লাহ পছন্দ করেন না। আমার মা, তার কথা, আচার-ব্যবহার সবই এখন শুধু স্মৃতি। তারপরও মনে হয়, মা এখনো আমার সাথেই আছেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.