মা মাºেলিনা রিবেরু
মা মাºেলিনা রিবেরু

মাকে মনে পড়ে... : ড. আগস্টিন ক্রুজ, শিক্ষাবিদ ও কবি

পৃথিবীর তাবৎ শব্দ ও ধ্বনির মাঝে প্রিয়তম শব্দ ‘মা’। পৃথিবীর সব সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠতম সঙ্গীত হচ্ছে আমার মায়ের আন্তরিক ও সুরেলা ধ্বনিÑ যে শব্দে মা আমাকে খোকন সোনা বলে ডাকত। আমার মায়ের ভালোবাসার পরিধি তার অন্তরের ভাব ও ভাষার স্রোত নদী, সাগর, মহাসাগরের স্রোত ধ্বনির চেয়ে বেগবান। মায়ের এই হৃদয় নিংড়ানো স্নেহের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই।
হাসি-কান্নায় মা। রোগশয্যায় মা। প্রাচুর্যে মা। দীনতায় মা। ‘মা’ আমার সব।
‘মা’-মাগো, আমি পৃথিবীর সব ঐশ্বর্যের চেয়েও বেশি তোমাকে ভালোবাসি। তার পরও ‘মা’- তুমি, সেই ছোট্টবেলায় আমাকে বোডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিলে? কলাকূপা বান্দুরা হলি ক্রশ স্কুলে আমি পড়তামÑ সেটা মিশনারি স্কুল। মা চাইতেন আমি যেন বিশ্বজোড়া মস্তবড় জ্ঞানী, গুণী একজন ভালো মানুষ হই। আমি কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি সেটার হিসাব আমি দিতে পারব না। তবে মানুষের কল্যাণে, ভালোবাসায় সারা জীবন কাজ করে গেছি। এখনো করছি। আমি ছিলাম মানুষ গড়ার কারিগর অর্থাৎ শিক্ষক। সেন্ট জুডস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ হিসেবে কেটে গেছে জীবনের প্রায় ৪০টি বছর। আমার স্টুডেন্টরা আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের প্রতিভা প্রকাশে স্ব স্ব জায়গা আলোকিত করে আছে, সেটা আমার অর্জন।
আমার স্বর্গীয় মায়ের নাম ‘মাºেলিনা রিবেরু’। তার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষাগতযোগ্যতা না থাকলেও তার ছিল অসাধারণ মেধা। যা দিয়ে তিনি আমাদের সাত ভাই-বোনকে মানুষ করেছেন। আমরা সবাই শিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমি ভাই-বোনদের মধ্যে চতুর্থ হলেও মা আমাকে যেন একটু বেশিই আদর-স্নেহ করতেন। আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী-গুণী-ধর্মপরায়ণ একজন জাত চাষি। যার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তায় আমরা বেড়ে উঠেছি। কম কথা বললেও বাবার আদর্শ মায়ের আদরে আমরা সবাই বেড়ে উঠেছি। মায়ের বুঝিয়ে বলার অসাধারণ ক্ষমতা আমাদের ভাই-বোনদের বড় হওয়ার পথে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল।
আমার জন্ম ১৯৪২ সালে ঢাকার উত্তরখান এলাকার মাউছাউদ গ্রামে। আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছেÑস্রোতস্বিণী ‘তুরাগ’ নদ। ছোট্টবেলায় নদীর জলের টলটলে স্নিগ্ধতা আমাকে মুগ্ধ করত। সবুজ শ্যামল গ্রাম, ধানক্ষেত-নীল আকাশ-পশুপাখি, সব কিছু যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। আমি মুগ্ধ হয়ে প্রকৃতির অপরূপ রূপ উপভোগ করতাম। বর্ষাকালে কদমফুলের গন্ধে পাগল হয়ে বাইরে চলে যেতাম। ঘুরে বেড়াতাম গ্রামের মেঠোপথ ধরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে। কখনো ঘরে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যেত। মা-আমার মধ্যে প্রকৃতির এই প্রেম দেখে একটু ভরকে গেলেন, ভাবলেন এভাবে চলতে থাকলে তো ছেলে আমার মূর্খ হয়ে থাকবে। তাই তিনি আমাকে মিশনরি বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিলেন। যাতে আমি বড়মাপের শিক্ষিত মানুষ হতে পারি। হ্যাঁ মা, আমি বড় হয়েছি। অনেক বড়। দর্শনে পিএইচডি করেছি। সেজর ওয়ার্ল্ড রিলিজন (টঝঅ), সাহিত্য, পুরাকীর্তি, ইতিহাস, পুষ্টিবিজ্ঞান, মনুষ্যস্বভাব, অদ্ভুত রহস্যময় ও অনিশ্চিত কার্যকরণ স্বভাব গবেষণায় দীর্ঘদিন আত্মনিয়োগ করেছি। কিন্তু তার পরও কি ‘মা’ আমি তোমার জ্ঞানের ধারে কাছে যেতে পেরেছি?
মা, মাগো খুব মিস করি তোমাকে। তোমার হাতের পুলিপিঠা, কুলিপিঠা, বিবিখানা, পায়েশের স্বাদ যেন আজো জিবে লেগে আছে। ইলিশ আর পুঁটিমাছের পাতুরি তো ছিল অমৃতের মতো সুস্বাদু। তোমার হাতে লাগানো আম, জাম-কাঁঠাল, লিচু, ফুল বাগানের স্মৃতি আমাকে আজো হাতছানি দিয়ে ডাকে। তোমার স্নেহ-মমতা মাখা ভালোবাসার পরশ পেয়ে ছোট্টবেলা থেকেই আমার কবি মন জেগে উঠেছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে লিখতাম। ঈশ্বরের বন্দনা, ফুল পাখি, আকাশ-বাতাস, প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টির রহস্য নিয়ে আমার যে আবার তৃষ্ণা ছিল সে ভাবটুকু কবিতার ছোট ছোট পঙক্তিতে লিখে আজ আমি কবি হয়েছি। আমার সৃষ্ট ৩৬টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ২৮টি বাংলা ভাষায় আর আটটি ইংরেজি ভাষায়। এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে চারটি কাব্যগ্রন্থ। আধ্যাত্মিক জীবনদর্শন ও প্রকৃতি ছাড়াও ঈশ্বরের সৃষ্টি নিয়ে আমার যেহেতু কৌতূহল বেশি, তাই এ বিষয়টাও আমার কাব্যগ্রন্থগুলোতে স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে দেশ-বিদেশ থেকে পেয়েছি চারটি সম্মাননা।
১৯৯৭ সালে আমাদের সাত ভাই-বোনকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে তুমি যেদিন চলে গেলে, সেদিন আমার বুকটা পাথর হয়ে গেল। আমি একটু কাঁদতে পারিনি। কোনোভাবেই মাগো তোমার চলে যাওয়া আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। তোমাকে ঈশ্বরের কাছে শঁপে দিয়ে এসে আমার দু’চোখ বেয়ে শুধু তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের ঝর্ণা ধারার মতো। সারা জীবনেও ‘মা’ তোমাকে এতটুকু বসে থাকতে দেখিনি। ঘর গেরস্থালি সামলাতে সামলাতে তোমার রাত-দিন একাকার ছিল। অসুখ-বিসুখে-পীড়িত হতে তোমাকে দেখিনি কোনো দিন। হঠাৎ কী এক অশুভ বার্তায় মাত্র ১০-১২ দিনের ব্যবধানে তুমি এই মায়ার পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে। মাগো, খুব কষ্ট হয়েছিল তখন আমার। বোর্ডিং স্কুলে পড়তাম বলে ছোট্ট বেলাটায় তোমার স্নেহ-মমতা থেকে আমি অনেক বঞ্চিত হয়েছি। তোমাকে দেখার সাধ যেন আমার আর ফুরায় না। তাইতো তোমাকে শুধু একবার মা, শুধু একবার তোমার অমর সুন্দর স্নিগ্ধ মায়াময় মুখটি দেখতে চাই।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.