মা-বাবা ভাইবোনের সাথে  কানিজ সোহানী ইসলাম
মা-বাবা ভাইবোনের সাথে কানিজ সোহানী ইসলাম

মা আমার জীবনের আদর্শ : কানিজ সোহানী ইসলাম, শিক্ষক, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মা শব্দটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, ভক্তি, বিশ্বাস, আস্থা, ভয় ও শাসনের মতো কতগুলো অনুভূতি মিলেমিশে মোচড় দিয়ে ওঠে। একজন সন্তানের কাছে মা-ই শ্রেষ্ঠ মানুষ। সন্তানদের আদর্শ নাগরিক হতে মায়ের ভূমিকাই প্রধান। আমার মমতাময়ী মায়ের নাম হোসনে আরা ইসলাম।
আমার জন্ম ১০ মহরম ভোরে। দেখতে একটু শ্যামলা, খুব ছোট্টটি হয়েছিলাম আমি। শুনেছি, প্রথম দর্শনেই মা কেন যেন মন খারাপ করেছিলেন। আমার নানা ও বাবা আমার মুখ দেখে বললেন, আমি নাকি খুব ভাগ্যবতী হবো। পরপর দুই মেয়ে তাই হয়তো মা একটু মন খারাপ করেছিলেন। তবে জন্ম পরবর্তীকালে আমি মা-ন্যাওটা নামে পরিচিত হয়েছি। কারণ, মায়ের কাছে ছাড়া আমার ভালোই লাগত না। ছোট্টবেলায় দেখতাম মা এত সুন্দর করে ঘর গোছাতেন। কুশি কাঁটা দিয়ে টেবিলকথ, সোফার ম্যাট বানাতেন। ছবি আঁকতেন আর গুনগুন করে গান করতেন। মার ছবি আঁকা দেখতে দেখতে আমিও মাত্র দুই বছর বয়সে সাদা কাগজ আঁকিবুঁকিতে ভরে দিতাম। এমনি করে মার মুখে শোনা প্রথম গানগুলো শুনতে শুনতে আমিও গান শিখে ফেলেছিলাম। আমাকে মাঝেমধ্যেই আচ্ছন্ন করে তোলে মায়ের গাওয়া সেই পুরনো গানগুলো শুনলেÑ মনটা কেমন নস্টালজিয়ায় ভরে ওঠে, ফিরে যেতে ইচ্ছে করে শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত সময়গুলো।
আমার বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। বছরান্তে এ শহর থেকে ওই শহরে বদলি হয়ে যেতেন। সুতরাং বাংলাদেশের বড় বড় জেলা শহরে আমাদের বাস করতে হয়েছে। আর আমাদের স্কুল পাল্টাতে হয়েছে প্রায় প্রতি বছর। মা আমার সব সামলে নিতেন নতুন নতুন পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে। ঢাকা, রাজশাহী নাটোর, টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, পাবনা শহরে আমরা থেকেছি। মিশেছি বিভিন্ন মানসিকতার মানুষের সাথে। মা আমার ভীষণ সংস্কৃতিকমনা, গানবাজনা, ছবি আঁকা, নাচ, আবৃত্তি সব বিষয়ে মা পারদর্শী ছিলেন। তবে তিনি সেগুলো নিজে থেকেই পারতেন, কারো কাছ থেকে শেখেননি। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিতÑ আমার নানু মারা গেলে নানা মাকে খুব অল্প বয়সে বিয়ে দেন। তাই ম্যাট্রিক পাসের পর আর তিনি পড়তে পারেননি। অল্প বয়সে মা হয়েছেন চার-চারটি ছেলেমেয়ের। আমি ভাইবোনদের মধ্যে তৃতীয়। আমার বড় ভাই মাত্র ১০ বছর বয়সে ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসায় মারা যান। তাই মা আজো তার জন্য চোখের পানি ফেলেন। আজ থেকে প্রায় চার দশক আগের কথাÑ তখন চায়নিজ খাবার এত প্রচলিত ছিল না। মা কাওলুন রেস্টুরেন্টে চায়নিজ খাবার খেয়ে তা বাসায় প্র্যাকটিস করতেন আর আমাদের খাওয়াতেন। ভীষণ মজা ছিল সেই খাবারগুলো। পরবর্তীকালে বাবা এক মহিলা রাঁধুনীর কাছে মাকে চায়নিজ রান্না শেখার জন্য পাঠান। মায়ের হাতের বিভিন্ন ধরনের পিঠা-পায়েশ, পোলাউ-কোরমা, খাসির রেজালা, শর্ষে-ইলিশ, ইলিশ-পোলাও সব যেন অমৃতের মতো লাগত। মা-এখনো মাঝে মধ্যে রাঁধেন। তবে মায়ের বিভিন্ন অসুখ যেন তাকে কাঁবু করে ফেলেছে। বাবা আমার ইহধাম ত্যাগ করেছেন আজ ২১ বছর। বাবাকে হারিয়ে আমরা যখন দিশেহারাÑ তখন মা আমাদের ভাইবোনকে আগলে রাখলেন বুকের ভেতর খুব যতেœ। আমার পড়া শেষ হলোÑ আমাকে সংসারী করলেন। ভাইকে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ পাঠালেন। আমার দুই ছেলেকে আজ ১০ বছর মা দেখেশুনে রাখছেন। মা আমার কাছাকাছি আছেন বলেই আমি নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারছি। শিক্ষকতা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে ও ইউডাতে। আর চলে যাচ্ছি বিদেশে বিভিন্ন কনফারেন্সে। মা আমার নিশ্চিন্ত জীবনযাপন। যিনি সারা জীবন আমার ছায়া হয়ে আগলে আছেন। যার ঋণ আমি জীবন দিয়েও শোধ করতে পারব না। মায়ের মুখে শোনাÑ আমার ছোটবেলার গল্প, একবার মায়ের খুব অসুখ করেছিল। আমার বয়স তখন তিন কি চার। মা মাথাব্যথায় ঘুমাতে পারছিলেন না। আমি নাকি রাতভর মায়ের মাথা টিপে ঘুম পারিয়েছিলাম। সেই থেকে মা আমাকে আরো বেশি আদর করেন। কারণ সেই রাতে সবাই অঘোরে ঘুমুচ্ছিল, শুধু আমি মার পাশে জেগেছিলাম। আমি টাঙ্গাইল কুমুদিনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি। রেজাল্ট খুব ভালো। মা চাইতেন আমি যেন মেডিক্যালে পড়াশোনা করি। অ্যাডমিশন টেস্টে আমি আর টিকতে পারলাম না। মা ভীষণ দুঃখ পেলেন। তারপর বাবা আমাকে চারুকলায় ভর্তি পরীক্ষা দিতে বললেন, আমি পরীক্ষা দিলাম যথারীতি রেজাল্ট বের হলো। আমি টিকে গেলাম প্রথমে মা মন খারাপ করলেও পরে খুব খুশিই হয়েছিলেন। বাবা একবার প্যারিসের ‘লুফ’ মিউজিয়ামে পৃথিবীর বিখ্যাত সব আর্টিস্টদের আঁকা ছবি দেখতে যান। সেই থেকে বাবার ফাইন আর্টস সম্পর্কে ধারণা পাল্টে যায়, আর তাই তিনি মেয়েকে আর্টিস্ট বানাতে মন স্থির করেন। হ্যাঁ, বাবার আশা পূরণ হয়। এখন মা-ও খুব খুশি তার মেয়ে এখন একজন আর্টিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যা তাকে অনেক বেশি গর্বিত করে।
মা, মাগোÑ আমার জ্ঞানামতে আমি কী তোমাকে কোনো কষ্ট দিয়েছি? যদি দিয়ে থাকি প্লিজ প্লিজ প্লিজ মা- তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি এখনো তোমার ছোট্ট সেই সোহানী। তোমার হাসিমাখা মুখ না দেখলে আমার দিনই শুরু হতে চায় নাÑ তাই তো তুমি বেঁচে থাক বহু বছর।

অনুলিখন : আঞ্জুমান আরা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.