কানে কম শোনা

ডা: সজল আশফাক

কানে কম শোনাকে বলা হয় শ্রুতিক্ষীণতা বা বধিরতা। শ্রুতিক্ষীণতা একটি রোগের উপসর্গ। কিন্তু শ্রুতিক্ষীণতার মাত্রা বেশি হলে
কোন রোগে এর উৎপত্তি তার ঊর্ধ্বে উঠে বধিরতা নিজেই একটি স্বতন্ত্র পরিচয় পায়। বধিরতা একটি শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টিকারী
মারাত্মক সমস্যা। লিখেছেন ডা: সজল আশফাক

শ্রুতিক্ষীণতাকে মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হচ্ছেÑ কনডাকটিভ, সেনসরিনিউরাল, মিক্সড ও সাইকোজেনিক। আমরা জানি কানের তিনটি অংশ আছে, যথা বহিঃকর্ণ, মধ্যকর্ণ ও অন্তঃকর্ণ। আর কানে শোনা একটি ইন্দ্রিয় অনুভূত বিষয় যা নির্ভর করে কানের সম্পূর্ণ অঙ্গ, অডিটরি নার্ভ ও মস্তিষ্কের কার্যকর ও নিরোগ অবস্থার ওপর। বহিঃকর্ণ ও মধ্যকর্ণের অসুখ সাধারণত কনডাকটিভ ডেফনেস বা পরিবহনজনিত শ্রুতিক্ষীণতা সৃষ্টি করে। অন্তঃকর্ণ, অডিটরি নার্ভ ও মস্তিষ্কের অসুখ সেনসরনিউরাল বা স্নায়ুজনিত শ্রুতিক্ষীণতা তৈরি করে। এই দুই ধরনের মিশ্রণে যে শ্রুতিক্ষীণতা হয় তাকে মিক্সড বা মিশ্র শ্রুতিক্ষীণতা বলা হয়। আর সাইকোজেনিক ডেফনেস বা মনোরোগজনিত বধিরতায় কান, অডিটরি নার্ভ ও মস্তিষ্কের কোনো আঙ্গিক ত্রুটি থাকে না।
বধিরতার কারণ
বধিরতার অনেক কারণ রয়েছে। বাংলাদেশে বধিরতার প্রধান কয়েকটি কারণ হচ্ছেÑ মধ্যকর্ণের প্রদাহ, যার মধ্যে রয়েছে কানপাকা রোগ এবং মধ্যকর্ণে ইফিউশন বা আঠালো পদার্থ জমা হওয়া; কানে খৈল, উচ্চ শব্দজনিত বধিরতা ও জন্মগত বধিরতা ইত্যাদি। জেনেটিক কারণে ও গর্ভকালীন সময় মায়ের রক্তশূন্যতা, অপুষ্টি, বিভিন্ন ভাইরাল ইনফেকশন, দীর্ঘ প্রসব সময় বা জটিলতায় শিশুর বধিরতা সৃষ্টি হতে পারে। রুবেলা, হাম, মাম্পস, জলবসন্ত, টাইফয়েড, মেনিনজাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে শ্রুতিক্ষীণতা হতে পারে। কানের পর্দায় আঘাত লাগা বা মাথায় আঘাত লেগে কানের পর্দা ফাটা, বার্ধক্যজনিত কারণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অটোসক্লেরোসিস, মেনিয়ার্স ডিজিজ, ল্যাবিরিনথাইটিস, কানের বা অডিটরি নার্ভের টিউমার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড অকার্যকারিতা বিভিন্ন ভাসকুলার রোগ ইত্যাদি কারণে বধিরতা সৃষ্টি হয়।
বধিরতার ওপরের কারণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে বধিরতা প্রতিরোধযোগ্য।
বধিরতার লক্ষণ
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কানে তালা লাগা, দম ধরে থাকা, ধাপা ধরা, কান বন্ধ হয়ে থাকা বা সরাসরি কানে কম শোনার কথা বলে থাকেন। বয়স্ক শিশুরা কানে কম শুনলে সাধারণত নিজ থেকে অভিযোগ করে থাকে। প্রাথমিক শ্রেণীর ছাত্র বা কম বয়সী শিশু কানে কম শোনার কথা ঠিকমতো বলতে পারে না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, পিতামাতা, নিকটজন শিশুর বধিরতা সন্দেহ করে। দেখা যায়, শিশুর ক্লাসে বা বাড়িতে বড়দের আদেশ অনুসরণ করতে কষ্ট হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। শিশু রেডিও বা টেলিভিশনের আওয়াজ-ভলিউম বড় করে শুনতে চায়। একজন বধির শিশু তার সাথে কথা বলার সময়, যে কথা বলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে চেষ্টা করে লিপ রিডিংয়ের জন্য। আবার একেবারে ছোট শিশুর বধিরতার লক্ষণ হতে পারে এই রকমÑ যদি শিশু আশপাশে বড় আওয়াজ বা শব্দে চমকে না ওঠে, যদি ছয় মাস বয়সে শব্দের উৎসের দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চেষ্টা না করে, যদি এক বছর বয়সেও কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ না বলে, যদি দুই বছর বয়সের মধ্যে দু’টি শব্দের বাক্য না বলে।
বধিরতা সন্দেহ হলে কী করবেন
প্রথমেই নিকটস্থ হাসপাতালের ইএনটি বিভাগে রোগী দেখাতে হবে অথবা একজন নাক কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তার সাহেব বধিরতা কখন কিভাবে আরম্ভ হয়েছে তার ইতিহাস নেবেন, সাথে কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ, মাথা ঘোরা আছে কিনা তার খোঁজ নেবেন। পূর্ণ নাক কান গলা পরীক্ষা এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাঁচ-সাত বছরের ঊর্ধ্বের বয়সী রোগীর টিউনিং ফর্ক টেস্ট করবেন, প্রয়োজনে অডিওলজিক্যাল টেস্ট করাবেন। কোন রোগে বধিরতা হচ্ছে সেটা নির্ণয়ের প্রয়োজনে আরও দু-একটি টেস্ট লাগতে পারে। নিউরোলজিস্ট, সাইকোলজিস্টসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ লাগতে পারে। এখানে উল্লেখ্য, শিশুদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের বধিরতা ব্যবস্থাপনায় বেশ পার্থক্য হতে পারে।
অডিওলজিক্যাল পরীক্ষা কী
কানে কম শোনা নিশ্চিত করা এবং তার পরিমাণ বের করার জন্য বিভিন্ন হিয়ারিং টেস্টকে সাধারণভাবে অডিওলজিক্যাল পরীক্ষা বলে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরকার হয় কেই বা পিওর টোন অডিওমেট্রি এবং ইমপিডেন্স অডিওমেন্ট্রি। পিওর টোন অডিওমেট্রি একটি সাবজেকটিভ টেস্ট যেখানে রোগীকে অংশগ্রহণ করতে হয়। তাই এই টেস্টটি চার-পাঁচ বছরের কম বয়সে করা যায় না। ছোট শিশুর টেস্টের জন্য রয়েছে বিহেভিয়ার অবজারভেশন অডিওমেট্রি ও প্লে অডিওমেট্রি। এ ছাড়াও রয়েছে ব্রেইনস্টেম ইভোক রেসপনস অডিওমেট্রি ও অটো একাউস্টিক ইমিশন।
চিকিৎসা
বধিরতার চিকিৎসা নির্ভর করে কোন কারণে বধিরতা সৃষ্টি হয়েছে সেই রোগের চিকিৎসা করা বা কারণ দূর করার ওপর। যেমন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বধিরতা হলে ওষুধ বদলে বা বন্ধ করে দিতে হবে। একইভাবে শব্দ দূষণের জন্য বধিরতা হলে ওই ব্যক্তিকে তীব্র শব্দ থেকে দূরে থাকতে হবে।
কিছু রোগ যেমন কান পাকা রোগে টিম্প্যানোপ্লাস্টি, মধ্যকর্ণে আঠালো পদার্থ জমলে মাইরিংগোটমি ও গ্রোমেট টিউব লাগানো এবং অটোসক্লেরোসিস হলে স্টেপিডেকটমি শৈল্য চিকিৎসা করে বধিরতা নিরাময় করা যায়। কানে খৈল জমার কারণে বর্ধিরতা হলে খৈল পরিষ্কার করে নিতে হবে। তবে তা কখনই রাস্তার হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে নয়। কারণ তাতে কানে আঘাত লাগা বা ইনফেকশনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মনে রাখুন, আপনার কান একটি অতি স্পর্শকাতর অঙ্গ এবং এর ক্ষতি মানে বধিরতাকে আমন্ত্রণ করা। অনেক বধিরতা চিকিৎসা করে ভালো করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেরি করা বা বধিরতা স্থায়ী হয়ে গেলে নিরাময়ের সুযোগ থাকে না। জন্মগত কারণে যে সব বধিরতা হয় যেমন জেনেটিক রোগ। এগুলো নিরাময় করা কঠিন ব্যাপার। এ ছাড়াও সাধারণভাবে যখন কোনো বধিরতা ওষুধে চিকিৎসা বা শৈল্য চিকিৎসার আওতায় পড়ে না তখন হিয়ারিং এইডের ব্যবহার করে ছোট আওয়াজ বড় করে শোনাতে হয়।
অডিটরি পুনর্বাসন
বধিরতার পুনর্বাসনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে হিয়ারিং এইড বা শ্রুতি যন্ত্রের ব্যবহার। শ্রুতিযন্ত্র তিন ধরনের হয়ে থাকে যথা ‘বডিওর্ন’, ‘বিহাইন্ড দি ইয়ার’ এবং ‘ইন দি ক্যানাল’। বডিওর্ন টাইপে তার দেখা যায় বলে অনেকে লজ্জা পায় তবে এই টাইপের দাম কম। ‘বিহাইন্ড দি ইয়ার’ কানের পেছনে ঝুলে থাকে এবং লম্বা চুলের মধ্যে লুকিয়ে রাখা যায় ও মোটামুটি ভালো মানের এইড ৫ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। ‘ইন দি ক্যানেল’ শ্রুতিযন্ত্র কানের নালিপথে ঢুকানো থাকে এবং বাইরে থেকে সাধারণত দেখা যায় না। ঢাকার বিভিন্ন অডিওলজি সেন্টারে এর নি¤œমূল্য ৩০ হাজার টাকার মতো। শ্রুতিযন্ত্রের মূল্য কোম্পানি ও মান অনুযায়ী ওঠানামা করে। শিশুর ক্ষেত্রে বধিরতা নির্ণয় হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয় কারণ কানে শোনার ওপর তার কথা বলার ক্ষমতা অর্জন করা নির্ভর করে। প্রয়োজনে উপযুক্ত হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে শিশুর শোনা ও ভাষা আহরণে সাহায্য করা দরকার এবং পরে বধিরদের জন্য বিশেষ স্কুলে লেখাপড়া করানো প্রয়োজন হয়।
মারাত্মক বা সম্পূর্ণ বধির যাদের হিয়ারিং এইড দিয়েও কানে শোনানো যায় না তাদের ‘কক্লিয়ার ইমপ্লাস্ট’ সার্জারি করে শব্দ শ্রবণ ও শব্দ বিশ্লেষণে সাহায্য করা যায়। কক্লিয়ার ইমপ্লাস্ট একটি ব্যয়বহুল সার্জারি। এখানে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্র কানের মাসটয়েড হাড়ের মধ্যে বসানো হয় যা কিনা কানের শ্রবণকোষকে উত্তেজিত করে। দেশে এখনো কক্লিয়ার ইমপ্লাস্ট সার্জারির সুযোগ সৃষ্টি না হলেও উন্নত বিশ্বে এটি একটি জনপ্রিয় সার্জারি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.