জিন্নাহ না সাভারকার দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক

আহমেদ বায়েজীদ

পাকিস্তান সফরে গিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ভারতীয় রাজনীতিক ও কংগ্রেসের বহিষ্কৃত নেতা মণিশঙ্কর আয়ার। লাহোরে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে সপ্তাহের শুরুতে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। জিন্নাহকে ‘কায়েদে আজম’ বলেও সম্বোধন করেছেন মণিশঙ্কর, যাতে ক্ষুব্ধ হয়েছে ভারতীয়রা। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন সাভারকার, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নয়। তিনি বলেন, বীর সাভারকার হিসেবে পরিচিত বিনায়ক দামোদর সাভারকার ‘হিন্দুত্ববাদ’ শব্দটি প্রচলনের মাধ্যমে দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা প্রথম উপস্থাপন করেছিলেন। মণিশঙ্কর বলেন, ‘১৯২৩ সালে সাভারকার হিন্দুত্ববাদ শব্দটি প্রচলন করেন, যা আগে কোনো ধর্মীয় অভিধানে ছিল না। কাজেই ভারতের এখন যারা ক্ষমতায় তাদের আদর্শিক গুরুই দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবর্তক’।
একই দিন আরেক বক্তৃতায় সাবেক ভারতীয় এই মন্ত্রী মোহাম্মদ আল জিন্নাহকে ‘কায়েদে আজম’ হিসেবে অভিহিত করেন, যে উপাধিটি পাকিস্তানে জিন্নাহর প্রতি সম্মান জানিয়ে ব্যবহৃত হয়। এ বিষয়টিও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে অনেক ভারতীয়র মধ্যে। মণিশঙ্কর নিজের কথার স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নামের আগে যেরকম মহাত্মা শব্দটি ব্যবহৃত হয়, কায়েদে আজম শব্দটিও একই রকম সর্বজনগৃহীত। তিনি বলেন, আমি জিন্নাহকে কায়েদে আজম হিসেবে অভিহিত করেছি, হিস্টিরিয়াগ্রস্থ ভারতীয় টিভি উপস্থাপকরা প্রশ্ন তুলেছেন কিভাবে একজন ভারতীয় নাগরিক পাকিস্তান গিয়ে একথা বলতে পারেন। আমি এমন অনেক পাকিস্তানিকে জানি যারা এমকে গান্ধীকে ‘মহাত্মা গান্ধী’ বলে সম্বোধন করে। এতে কি তাদের দেশপ্রেম কমে যায়?’
সম্প্রতি ভারতের উত্তর প্রদেশের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের অফিসে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি নিয়ে আপত্তি তোলেন বিজেপির এমপি সতীশ গৌতম। সেই ঘটনার রেশ ধরেই মণিশঙ্কর আয়ার এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্খলন। ৭০ শতাংশ ভারতীয় গত নির্বাচনে মোদিকে চায়নি। কিন্তু অন্য দলগুলো পরাজিত হয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে। আমার আশা এই ৭০ শতাংশের বেশির ভাগই আবার ঐক্যবদ্ধ হবে এবং এই ভোগান্তির অবসান ঘটাবে।
মণিশঙ্করের এমন বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিজেপি প্রেসিডেন্ট অমিত শাহ। টুইটারে তিনি লিখেছেন, কংগ্রেস ও পাকিস্তানের মধ্যে আশ্চর্য এক চিন্তার সংযোগ রয়েছে। তিনি টুইটারে লিখেছেন, পাকিস্তান সরকার টিপু সুলতানকে স্মরণ করেছে, কংগ্রেসও যার জয়ন্তী উৎসবের সাথে পালন করে। আর আজ আয়ার জিন্নাহর প্রশংসা করলেন। গুজরাট হোক কিংবা কর্নাটকের নির্বাচন হোক, আমি বুঝি না কংগ্রেস কেন পাকিস্তানকে টেনে আনে। এ ছাড়া ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকাকে তিনি বলেন, প্রতিটি নির্বাচনের আগে কংগ্রেস সমাজের মধ্যে বিভক্তি ছড়াতে আয়ারকে ব্যবহার করে। কিন্তু তাদের পদক্ষেপ প্রতিবারই ব্যর্থ হয়।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতেও মণিশঙ্কর আয়ারের একটি মন্তব্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানে তিনি অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন, আর ভারতে পাচ্ছেন ঘৃণা। আরো বলেছিলেন, সীমান্তের ওপারে যখন মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে, সেখানে ভারত অনেকটাই ১৯৪৭ সালের পরিস্থিতিতে পড়ে আছে।
মণিশঙ্করের এই বক্তৃতায় আপত্তি করেছিলেন সিনিয়র কংগ্রেস নেতারা। অনেকেই দলের প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীর কাছে চিঠি লিখেছিলেন মণিশঙ্করকে বহিষ্কার করার দাবি জানিয়ে। কংগ্রেস নেতা হেমন্ত রাও বলেছেন, এত শিক্ষিত একজন লোক হয়েও তিনি অসার মন্তব্য করছেন। তার জন্য এই প্রজন্ম ভোগান্তিতে পড়ছে। তার এসব বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করা উচিত; কারণ এতে কংগ্রেসের কর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তবে সে দফায় বহিষ্কার না হলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘নীচ’ বলে মন্তব্য করার পর কংগ্রেস দলের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তার ওই বক্তব্যের প্রভাব গুজরাটের নির্বাচনে পড়েছিল বলে মনে করে কংগ্রেস।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.