শেখ লতিফা বিনতে মুহাম্মদ আল মাকতুম
শেখ লতিফা বিনতে মুহাম্মদ আল মাকতুম

কোথায় দুবাই রাজকুমারী?

মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ

শেখ লতিফা বিনতে মুহাম্মদ আল মাকতুম। দুবাইয়ের রাজকুমারী। তবে গল্পে যেমন রাজকুমারীর কথা বলা হয়, ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো, বাগানে বাগানে ঘুরে বেড়ানো সে রকম রাজকুমারী নয়। মোটামুটি বন্দী এক রাজকুমারী। যিনি চেয়েছিলেন প্রাসাদের ঘেরাটোপ এড়িয়ে পালিয়ে যেতে, নিজের জীবন ও স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে।
পালিয়েছিলেন ঠিকই। এক বান্ধবী, যিনি ফিনল্যান্ডের নাগরিক এবং ফরাসি এক লেখকের (কেউ কেউ বলেন গোয়েন্দা) সহযোগিতায় দেশ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ছুটছিলেন এক ইয়টে করে। তার পরিকল্পনা ছিল, ভারতে পৌঁছে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তার স্বাধীন হয়ে ওড়ার স্বপ্ন ওখানেই থেমে যায়। ভারতের গোয়া উপকূলের কাছাকাছি যেতেই দেশটির নৌবাহিনীর কমান্ডোরা ইয়টটি আটক করে। তারপর ওই ইয়টে থাকা সবাইকে আটক করে দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দেয়া হয়। ভারতের গণমাধ্যমে খবরটি বের হলেও সরকারিপর্যায়ের কেউই এ বিষয়ে টুঁ শব্দটি করেননি। বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। কারণ ওয়াশিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়েছিল, নরেন্দ্র মোদি নিজে দুবাইয়ের সেই রাজকুমারীকে ধরে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার সেই অভিযানের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরও ভারত সরকারের দায়িত্বশীল কেউই এ ব্যাপারে কোনো কিছু স্বীকারও করেনি, আবার অস্বীকারও করেনি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইট ওয়াচ বলছে, ৩২ বছর বয়সী লতিফার এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ তারা পাননি। মার্চের ৪ তারিখে ওই ইয়ট থেকে যখন তাদের বন্দী করা হয়েছিল, এর পর থেকে তার আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। রাজকুমারী লতিফাকে দেশ থেকে পালিয়ে আসার কাজে সহায়তাকারী ফিনল্যান্ডের তিনা জাউহিয়াইনেন ও ফরাসি হার্ভে জিউবার্টকেও লতিফার সাথে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু গত ২২ মার্চ কূটনৈতিক চাপে পড়ে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু রাজকুমারী স্বয়ং কোথায় আছেন, কিভাবে আছেন? কোটি টাকা দামের এ প্রশ্নের জবাব মেলেনি এখনো।
লতিফার ব্যাপারে জানতে চেয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে বার্তা দেয়া হলেও তাতে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তবে আমিরাত সরকারের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, লতিফা এখন তার পরিবারের সাথে আছেন এবং ভালোই আছেন।
হিউম্যান রাইট ওয়াচ দাবি জানায়, অনতিবিলম্বে আরব আমিরাতের উচিত লতিফার অবস্থান স্পষ্ট করা। বহির্বিশে^র সাথে তাকে যোগাযোগ করতে দেয়া। যদি এ প্রক্রিয়া অবলম্বন না করা হয় তাহলে তারা বিষয়টিকে ‘গুম’ হিসেবেই গণ্য করবে। সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক সারাহ লিয়াহ হুইটসন বলেন, যদি তিনি বন্দী হন, তাহলে একজন স্বাধীন বিচারকের কাছে নেয়ার আগে তাকে বন্দীর সব অধিকার প্রদান করতে হবে।
তিনা জাউহিয়াইনেনের বরাত দিয়ে মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, ফাতিমাকে আটক করার ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করে ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যরা। ভারতের উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে থাকাবস্থাতেই তাদের ইয়টটিকে ঘিরে ফেলা হয়। আটকের দিন অর্থাৎ ৪ মার্চ সাগরে থাকাবস্থায় লতিফা হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভিডিও বার্তা দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, বন্দুকবাজেরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। কেবিনের বাইরে গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এই হয়তো তার শেষ ভিডিও।
তিনি জানান, ওই সময় রিভলবার ঠেকিয়ে লতিফাকে ইয়ট থেকে নামতে বাধ্য করা হয়। এ সময় তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে নেয়া হয়েছিল। এক লোক সে সময় ইরেজিতে চিৎকার করে বারবার বলছিল, ‘হু ইজ ফাতিমা’।

আগের ঘটনা
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী ও দুবাইয়ের শাসক শেখ মুহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের মেয়ে শেখ লতিফা মাকতুম। গত মার্চে ইউটিউবে ৩৯ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ১৩ মার্চ লতিফার মার্কিন আইনজীবী ওই ভিডিওটি প্রকাশ করেন। লতিফা মারা গেলে বা নিখোঁজ হলে প্রকাশ করার জন্য ভিডিও বিবৃতিটি লতিফা রেকর্ড করে রেখেছিলেন বলে ওই আইনজীবীর দাবি। সে ভিডিওতেই লতিফা তার পালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সাদামাটা একটি টি-শার্ট পরে, চুলগুলো যেনতেনভাবে পেছনে পাঠিয়ে দিয়েই তিনি বসে পড়েছিলেন ভিডিওটি তৈরি করতে। এর কারণও ছিল অবশ্য। ভিডিওচিত্রটির শুরুটা ছিল এ রকম, আমি এ ভিডিওটা তৈরি করেছি। কেননা হতে পারে এটাই আমার তৈরি শেষ ভিডিও। নিজের পরিচয় জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, দুবাইয়ের শাসক মুহাম্মদ মাকতুম ও আলজেরিয়ান মাতা হুররিয়াহ আহমদের মেয়ে তিনি। লতিফা বলেন, তিনি পালাতে চান। এর আগেও তিনি পালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তাতে সফল হননি। পালানোর কারণ হিসেবে লতিফা বলেন, তার বাবার আচরণ এবং পারিবারিক অতি রক্ষণশীল পরিবেশ তার একদমই ভালো লাগত না। তিনি দাবি করেন, পিতার সাথে তার মতবিরোধের কারণে তার (লতিফার) বড় বোন শামছা ব্রিটেনে পালিয়ে যান। এরপর আমি শামছাকে সমর্থন করলে তিন বছর আমাকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয় এবং নির্যাতন করা হয়। শামসাকেও পরে ফিরিয়ে এনে আটকে রাখা হয়েছে এবং নির্যাতন করা হচ্ছে।
ভিডিওতে তিনি বলেন, শিগগিরই আমি এখন থেকে বেরিয়ে যাবে। যদিও এই পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু তারপরও আমি ৯৯ শতাংশ আশাবাদী যে, এটা হবেই। আর শেষ পর্যন্ত যদি তা নাও হয়, তাহলে হয়তো এ ভিডিও আমাকে সাহায্য করবে।
পালানোর ব্যাপারটা সফল না হলে যে পরিণতি বেশ খারাপ হবে, সে আশঙ্কাও প্রকাশ করেন ওই ভিডিওতে। তিনি বলেন, আমার বাবার প্রধান লক্ষ্য তার মানমর্যাদা, তার সুনাম রক্ষা করা। এর জন্য তিনি যেকোনো কিছু করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পালাতে বিফল হলে হয়তো এ ভিডিওটি আমার জীবন রক্ষা করতে পারবে। ভিডিওতে লতিফা তার পালিয়ে যাওয়াকে তার জীবন, তার স্বাধীনতা বলে দাবি করেছিলেন।
গত মাসে লন্ডনভিত্তিক সংস্থা ‘ডিটেইন ইন দুবাই’ লতিফার কেসটি হাতে নেয়। গ্রুপটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্যায় বিচারে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করে থাকে। সংস্থাটি জানায়, লতিফা দুবাই থেকে ইয়টে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু ৪ মার্চ ভারতীয় উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে তিনি ধরা পড়েন। সংস্থাটি লতিফার পক্ষে একটি প্রচারণা শুরু করেছে। কিন্তু এ ব্যাপারটি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে উল্লেখ করে দুবাই কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ কাতার এ প্রচারণায় মদদ জোগাচ্ছে। নিতান্তই ঘরোয়া একটি ব্যাপারকে বড় করতে করতে তামাশার বস্তু বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। দুবাই ও দুবাইয়ের শেখের মর্যাদা ক্ষুণœ করতেই এ কাজ করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে অনেক কথাই বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিশ^াসযোগ্যভাবে জানা যায়নি আসলেই কোথায় আছেন দুবাই রাজকুমারী লতিফা মাকতুম।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.