আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সেমিনার কর্ণফুলীর দূষণ রোধ করা না গেলে জীববৈচিত্র্য রা করা কঠিন হবে

চট্টগ্রাম ব্যুরো

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম বলেছেন, কর্ণফুলীকে রক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও জরুরি। বিশেষজ্ঞরা তাদের বিশ্লেষণ তুলে ধরবেন আর সেটা যদি কর্ণফুলীর সঙ্গে যারা যুক্ত তারা না বোঝেন, না জানেন তাহলে হবে না। এজন্য কর্ণফুলীকে বাঁচাতে চট্টগ্রামের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, কর্ণফুলী শুধু চট্টগ্রামের নয়, এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন। এটা দেশের ওপরের মহলে তুলে ধরতে হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে হলেও আমরা যাব। কিন্তু তার আগে কর্ণফুলী রার ব্যাপারে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, দূষণ, দখল ও ভরাট থেকে রা করতে হলে আমাদের কর্ণফুলীর জন্য ভালোবাসা দেখাতে হবে। তিনি আরো বলেন, মানুষের মধ্যেও দূষণ আছে। এ দেশে আমরা সবাই মানুষ হতে পারিনি। দূষিত ও কলুষিত মানুষদের আগে দমাতে হবে। এজন্য শিল্প কারখানার মালিক, ব্যবসায়ী নেতা, চট্টগ্রাম বন্দর, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদফতর, ওয়াসাসহ সবার সঙ্গে একত্রে বৈঠক করতে হবে। তাহলে একটা পরিপূর্ণ সিদ্ধান্তে আসা যাবে।
তিনি বলেন, কর্ণফুলীর যে পরিমাণ দূষণ হচ্ছে তার অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশ্লেষণ করা কঠিন। দূষণ ও নাব্যতা হারানোর কারণে বন্দরের ব্যয়ও একই সঙ্গে বেড়েছে। নগরীতে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ কর্ণফুলী নদী ভরাট হওয়া। হালদার কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন সঙ্কট হওয়ার কারণও কর্ণফুলীর দূষণ। এজন্য কর্ণফুলীর সঙ্গে যুক্ত অন্য নদীগুলোর সাথে সমন্বয় করে একটা পরিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ভরাট হওয়ার কারণে। এ ছাড়া ব্রিজ, স্লুইস গেট নির্মাণ ও রাবার ড্যাম নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে।
এম এ সালাম বলেন, কর্ণফুলী নদী সংযুক্ত বিভিন্ন খালে স্লুইস গেট স্থাপনের কারণে নদীতে মিঠা পানির উৎস বেড়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক উৎস স্বাভাবিক রাখতে না পারলে দেশের নদ-নদী মরে যাবে। কর্ণফুলী নদীর দখল দূষণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে বড় আয়োজনের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আইইবির কর্মকর্তাদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
গত সোমবার সন্ধ্যায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিটিউশন অব বাংলাদেশের (আইইবি) ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ইঞ্জিনিয়ার্স ডে-২০১৮ উপলে আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্র আয়োজিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব পলিউশন ইন দি রিভার কর্ণফুলী ইটস ফিডার খালস ফ্রম কালুরঘাট ব্রিজ টু ইস্টুয়ারি অব কর্ণফুলী’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এম এ সালাম।
সেমিনারে কি-নোট স্পিকার ছিলেন বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এম আলী আশরাফ। তিনি বলেন, কর্ণফুলী বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। কর্ণফুলীকে নিয়ে কাজ করতে হলে কাপ্তাই থেকে কর্ণফুলী মোহনা পর্যন্ত সার্ভে করতে হবে। আমাদের এখন চিন্তা করার সময় হয়েছে কর্ণফুলী দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা হতে যাচ্ছে কি না। কর্ণফুলীকে বাঁচানোর জন্য অবৈধ দখল ও দূষণ প্রতিরোধ করতে হবে বলে তিনি অভিমত দেন।
প্রবন্ধকার কর্ণফুলীর ২২টি পয়েন্ট থেকে নদীর পানি পরীা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এতে দেখা যায়, ভাটার সময় অধিকাংশ স্থানে ডিওর পরিমাণ গ্রহণযোগ্যতার সর্বনিম্ন মাত্রার কাছাকাছি রয়েছে। কোথাও কম রয়েছে। দূষণের পরিমাণ আরো বেড়ে গেলে ডিওর পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার অনেক নিচে নেমে যাবে এবং জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য তা অত্যন্ত তিকর হয়ে পড়বে। কর্ণফুলী নদীতে এখনো অনেক প্রজাতির মাছ দেখা যায়। দূষণ বেড়ে গেলে কর্ণফুলীতে মিঠা পানির মাছ কমে যাবে। নোনা পানির জলজ প্রাণীর আধিক্য বেড়ে যাবে। চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের প্রাণ কর্ণফুলী নদীর দখল-দূষণ অচিরেই রোধ করা না গেলে কর্ণফুলী নদী ঢাকার বুড়িগঙ্গার ভাগ্য বরণ করবে।
কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে অবস্থিত শিল্প-কারখানার বেশির ভাগেরই ইটিপি নেই। ইটিপি থাকলেও ব্যয় কমাতে তা অচল রাখা হয়। এতে পরিশোধন ছাড়াই শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়াও নগরীতে সুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় নগরীর সব ধরনের বর্জ্য খাল, ড্রেনের মাধ্যমে নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদী ও সংযুক্ত খালের দখল-দূষণ চিহ্নিত করে নদীকে রক্ষা করতে হবে।
এ সময় তিনি কর্ণফুলী কিভাবে দূষণ ও ভরাট হচ্ছে তা সচিত্র পাওয়ার প্রেজেন্টশনের মাধ্যমে তুলে ধরেন এবং বলেন, ২০১৫ সালে কালুরঘাট থেকে মোহনা পর্যন্ত ১৯টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বর্তমানে এসে পাওয়া যায় ৩২টি খাল। এর মধ্যে অনেক খালে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে আগে ৭০-৮০ হাজার টন পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করতে পারত। ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে এখন তা আর সম্ভব হচ্ছে না। বহির্নোঙর থেকে লাইটার জাহাজে বন্দরে পণ্য খালাস করতে হয়। এতে সময় ও ব্যয় অনেক গুণ বেড়ে গেছে। দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়ে যাচ্ছে।
আইইবি চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও চুয়েটের ভিসি প্রফেসর ড. প্রকৌশলী মো: রফিকুল আলমের সভাপতিত্বে এবং প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্যানেল আলোচক ছিলেন চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. প্রকৌশলী আয়েশা আক্তার। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রের ভাইস চেয়ারম্যান (একা.) প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন), ভাইস চেয়ারম্যান (অ্যাডমিন) প্রকৌশলী প্রবীর কুমার দে প্রমুখ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.