ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যঁ-লুক গদার।
ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যঁ-লুক গদার।

কানে তারকাদের মেলা

আলমগীর কবির, কান (ফ্রান্স) থেকে

এতো বড় আয়োজন এতো সুশৃঙ্খল হতে পারে সেটা কান চলচ্চিত্র উৎসব না দেখলে বিশ্বাস করাটা কঠিন হতো। চলচ্চিত্র যে সমাজের ক্রটিগুলো খুব সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারে সেটার ও প্রমাণ বলা যেতে পারে এই উৎসবকে। আর এজন্য আয়োজক কর্তৃপক্ষ বরাবরই অতীতের ভালো বিষয়গুলোকে সামনে টেনে নিয়ে এসেছে সম্মান প্রর্দশনের জন্য। সেই সূত্র ধরেই এবার কানে ফিরলেন ৮৭ বছর বয়সী প্রখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যঁ-লুক গদার।

এবারের আয়োজনের অফিসিয়াল পোস্টার সাজানো হয়েছে জ্যঁ-লুক গদারের ‘পিয়েরে দ্য ম্যাডম্যান’ (১৯৬৫) ছবির শুটিংয়ে আলোকচিত্রী জর্জেস পিয়েরের তোলা একটি স্থিরচিত্র নিয়ে। এতে দেখা যাচ্ছে, ফরাসি অভিনেতা জ্যঁ-পল বেলমন্দো ও ডেনিশ অভিনেত্রী আনা কারিনার চুম্বনদৃশ্য।

ছবিটির শুটিং চলাকালে ফরাসি অভিনেতা জ্যঁ-পল বেলমন্দো ও ডেনিশ অভিনেত্রী আনা কারিনার অন্তরঙ্গ মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন জর্জেস পিয়েরে (১৯২৭-২০০৩)। পোস্টারের জন্য তার তোলা ছবি নির্বাচন করে ফরাসি এই আলোকচিত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হলো। ১৯৬০ সালে শুরু, এরপর ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে শতাধিক ছবির শুটিংয়ে আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। শিল্পীর মর্যাদা হিসেবে আলোকচিত্রীদের স্বীকৃতি প্রাপ্তির অধিকার নিয়ে কথা বলতে গুণী মানুষটি গড়ে তোলেন অ্যাসোসিয়েশন অব ফিল্ম ফটোগ্রাফারস।

কানের অফিসিয়াল পোস্টারটি মূলত গ্রাফিক্স ডিজাইনার ফ্লো ম্যাকুইনের সাজানো। পপ সংস্কৃতিতে অনুপ্রাণিত তার এই সৃষ্টিকর্ম।  ড্রইং, পেইন্টিং ও ডিজিটাল আর্টের সাথে রঙের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন তিনি। ইউনিভার্সাল পিকচার্স, প্যারামাউন্ট চ্যানেল, ইউরোপাকর্প, ওয়াইল্ড সাইড ও আর্তে টিভির জন্য নিয়মিত পোস্টার বানিয়ে থাকেন ২৭ বছর বয়সী এই তরুণী।

প্রতি বছরই কানের অফিসিয়াল পোস্টারের জন্য অধীর আগ্রহে থাকেন চলচ্চিত্রপ্রেমীরা। এটি উন্মোচনের পর তা নিয়ে হয় ব্যবচ্ছেদ। অনেকে আবার সংগ্রহেও রাখেন। এবারেরটি নিয়েও চায়ের কাপে আড্ডা জমে উঠছে। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার গদারের ছবির দৃশ্যে অনুপ্রাণিত হলো কানের অফিসিয়াল পোস্টার। ২০১৬ সালের পোস্টারে ছিল গুণী এই নির্মাতার ‘কনটেম্পট’ ছবির দৃশ্য।

শুধু পোস্টার নয়, বাঘাবাঘা নির্মাতাদের মধ্যে পাম দ’র জয়ের লড়াইয়ে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ৮৭ বছর বয়সী প্রখ্যাত এই পরিচালকের ছবি রয়েছে। তার পরিচালিত ‘দ্য ইমেজ বুক’-এর পাঁচ অধ্যায়ে থাকছে একটাই গল্প, অনেকটা হাতের পাঁচ আঙুলের মতো। উৎসবের চতুর্থ দিন শুক্রবার বিকাল চারটায় এই ছবির প্রদর্শনী হয়েছে।

এর আগে আয়োজনের তৃতীয় দিন ফ্রান্সের সময় বিকালে রেড কার্পেট থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় দেখা মিলল বিশ্বের বাঘা বাঘা তারকাদের সাথে। এর মধ্যে ছিলেন ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট থেকে শুরু করে বলিউডের দীপিকা পড়ুকোন, কঙ্গনা রানওয়াত সহ আরো অনেক তারকার।

বৃহস্পতিবার (১০ মে) দিনের শুরুটা ভালোই হয়েছলি। পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনে নয়া দিগন্তের জন্য বরাদ্দ প্রেসবক্স থেকে দরকারি কাগজপত্র নিয়ে উঠে গেলাম চারতলায়, যেখানে তেরেস দো জার্নালিস্টস ব্যবস্থা রাখা। ছাদ থেকে বাইরে চোখ মেলে তাকালে ভূমধ্যসাগর আর সারি সারি ইয়ট— এ দুইয়ের সম্মিলনে কানের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মন ভরে যায়।

আগেই ভেবে রেখেছিলাম, বিকাল ৪টার অন্তত আধঘণ্টা আগে সাল বুনুয়েল থিয়েটারে যেভাবেই হোক যেতে হবে। তখন কানের মাস্টারক্লাসের অংশ হিসেবে আড্ডা দিতে আসবেন মার্কিন নির্মাতা রায়ান কুগলার। ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ পরিচালনা করে তামাম দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দিয়েছেন তিনি। আমেরিকান সিনেমার ইতিহাসে সর্বকালের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবির তালিকায় এটি আছে তিন নম্বরে। তাই ৩১ বছর বয়সী এই নির্মাতা এখন রীতিমতো তারকা।

ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট মডেল সাল বুনুয়েলে রায়ান কুগলারকে কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো মঞ্চে ডাকার পর তো উন্মাদনা শুরু হয়ে গেলো! শৈশব, ব্ল্যাক প্যান্থার ও সাধারণ দর্শকদের সাথে সিনেমা নিয়ে নিজের সম্পর্কসহ তাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন মার্কিন বোদ্ধা ও সাংবাদিক এলভিস মিচেল। প্রাণবন্তভাবে সব উত্তর দিয়েছেন তিনি।

সাল বুনুয়েল থেকে নেমে তিনতলার প্রেস রুমের ব্যালকনিতে কিছুক্ষণ সময় কাটলো। এই জায়গাটি পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের  মূল ফটকের ঠিক ওপরে। নিচে তাকালে রোজই একটা দৃশ্য নিয়মিত চোখে পড়ে। তরুণ-তরুণী কিংবা মধ্যবয়সীরা গ্র্যান্ড থিয়েটার  লুমিয়েরে প্রদর্শিত হবে এমন কাঙ্ক্ষিত ছবির ইনভাইটেশন চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। লালগালিচার সামনের সড়কেও ঘোরাফেরা করেন এই টিকিটপ্রত্যাশীরা।

ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট -এর ছবির প্রদর্শনীকে ঘিরে লালগালিচায় গান-বাজনা হয়েছে (১০ মে) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় । এই আয়োজন যেন নির্ঝঞ্ঝাটভাবে করা যায় সেজন্য পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবন থেকে সড়কের অনেকটা বন্ধ থাকে। এ কারণে কানবাসী কিংবা  পর্যটকদেরকে লম্বা পথ হেঁটে যেতে হয় গন্তব্যে।
অনেকের পাশাপাশি লাইন ধরে এগোতে গিয়ে দেখি, লালগালিচায় তারকাদের একনজর দেখতে হাজারও মানুষের ভিড়
সড়কজুড়ে। গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরের পাশেও বিশাল জটলা তারকারা হেঁটে সিঁড়িতে উঠে দাঁড়ালে স্পষ্ট দেখা যায় তাদেরকে।

ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট মডেল অ্যাক্রেডিটেশন প্রাপ্ত সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে পালে দো ফেস্টিভ্যাল ভবনের সর্বত্রই বিচরণ করা  যাচ্ছে। তবে প্রতিবার সেখানে ঢুকতে গেলে নিরাপত্তার আনুষ্ঠানিকতা কিঞ্চিৎ বিরক্তিকর লাগে। পকেটে যা কিছু থাকে সবই ট্রলিতে  রেখে কাঁধের ব্যাগ খুলে সব কাগজপত্র দেখাতে হয় নিরাপত্তা কর্মীদেরকে। অবশ্য সুষ্ঠুভাবে উৎসব আয়োজনে এর বিকল্পও নেই।

শুধু ভবনের ভেতরেই নয়, আশপাশের এলাকাগুলোতে সশস্ত্র হয়ে টহল দিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। উৎসবে অংশগ্রহণকারী  তারকাদের ঢোকা ও বের হওয়ার নির্ধারিত স্থানের সামনে দিয়ে তাদের একটি দলকে যেতে দেখলাম। এখানেই রায়ান কুগলারকে  আবার সামনে পেয়ে গেলাম। তার ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ ছবির ‘প্রে ফর মি’ গেয়েছেন যিনি, সেই দ্য উইকেন্ডও হনহন করে এসে চলে গেলেন।

রায়ান কুগলার ও এলভিস মিচেলের কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন ‘টোয়াইলাইট’ তারকা ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট। এবারের উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের একজন তিনি। অটোগ্রাফ দিয়ে গেলেন প্রতিযোগিতা বিভাগের আরেক বিচারক রুশ নির্মাতা আন্দ্রেই জিভিয়াজিন্তসেভ। কাগজ বাড়িয়ে দিতেই অটোগ্রাফ পেলাম তার।

এরপর চোখের সামনে দেখলাম বলিউডের দীপিকা পাড়ুকোন ও কঙ্গনা রনৌতকে। কঙ্গনার পেছনেই ছিলেন ‘গ্যাংস অব
ওয়াসেপুর’ ও ‘জলি এলএলবি টু’ তারকা হুমা কোরেশি। ডাকতেই তাকালেন ৩১ বছর বয়সী এই অভিনেত্রী। ভিক্টোরিয়া’স  সিক্রেট মডেলরাও সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.