আলোর পথে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

নাজমুল হোসেন

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু-১ এর উৎক্ষেপণ করা হয়নি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ দেখিয়ে মহাকাশে যাত্রা শুরু করার নির্ধারিত সময়ের মাত্র ৪২ সেকেন্ড আগে সেটি স্থগিত করা হয়।
শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোররাত ৩টা ৪৭ মিনিটে কৃত্রিম উপগ্রহটির যাত্রা শুরুর কথা ছিল। নতুন সময় নির্ধারণ করা
হয়েছে শনিবার মধ্য রাতে। লিখেছেন নাজমুল হোসেন
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে ৫৭তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইটের মালিক দেশগুলোর অভিজাত ক্লাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এ মুহূর্তের সাক্ষী হতে শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদসহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদল। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশী। তাদের কেউ যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী, আবার কেউ বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। শুক্রবার কেনেডি স্পেস সেন্টারের দু’টি স্থান থেকে দর্শনার্থীদের জন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সরাসরি দেখার ব্যবস্থা ছিল। একটি স্থান অ্যাপোলো বা স্যাটার্ন-৫ সেন্টার, উৎক্ষেপণস্থল থেকে যার দূরত্ব ৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার। এ ছাড়া কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল দর্শনার্থী ভবন (মেইন ভিসিটর কমপ্লেক্স) থেকেও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ দেখার ব্যবস্থা ছিল। উৎক্ষেপণস্থল থেকে এটির দূরত্ব ১২ কিলোমিটার।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু উৎক্ষেপণের ৪২ সেকেন্ড আগে সেটি স্থগিত করে দেয় কম্পিউটার। এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন, সমস্যা এখনো নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। উৎক্ষেপণের আগে মোট আট হাজার ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়। কোথাও বড় সমস্যা দেখা যায়নি। আশা করছি ‘মাইনর’ কোনো ত্রুটি হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেয়া হয় না, তাই এ রকম হওয়াটা ‘খুবই স্বাভাবিক’।
স্পেসএক্স এক টুইট বার্তায় জানিয়েছে, শেষ মিনিটে কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখা হয়েছে। রকেট ও স্যাটেলাইট ভালো অবস্থায় আছে। শনিবার নির্ধারিত সময়ে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি ফের শুরু হবে।
তবে শুক্রবার রাতেই বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য নির্ধারিত সময়ের ২ ঘণ্টা আগেই ‘অপ্রত্যাশিত ঘটনা’র আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। সব প্রস্তুতি থাকার পরও শেষ মুহূর্তে কারিগরি জটিলতার কারণে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী এলন মাস্ক সাংবাদিকদের কাছে উদ্বেগ জানিয়ে ‘শুভ কামনা’ প্রত্যাশা করেছিলেন। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাত ৩টা ৪৭ মিনিটে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটে করে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মহাকাশে পাড়ি জমানোর কথা ছিল। পরে সময় আরো ১৫ মিনিট বাড়িয়ে ৪টা ২ মিনিটে উৎক্ষেপণের কথা বলা হয়। তবে ৪টা ৭ মিনিটে উৎক্ষেপণের স্থগিতের কথা জানায় স্পেসএক্স। এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে রাত জেগে টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিলেন দেশবাসী। তবে কারিগরি জটিলতার কথা জানিয়েছে একদিন পিছিয়ে দেয় উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স।
স্পেসএক্সের যে মহাকাশযানে করে স্যাটেলাইটটি মহাকাশে যাবে, সেটি হলো ফ্যালকন ৯ ব্লক ৫। দু’টি পর্যায়ে এ উৎক্ষেপণপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম পর্যায়টি সম্পন্ন হতে সময় লাগবে ১০ দিন এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে লাগবে ২০ দিনের মতো।
মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এই কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখিস্তানের কিছু অংশ এই স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। দেশের প্রথম এ স্যাটেলাইট তৈরিতে খরচ ধরা হয় ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এক হাজার ৩১৫ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার ও বাকি এক হাজার ৬৫২ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নেয়া হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের মহাকাশ সংস্থা থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। স্যাটেলাইট তৈরি এবং উড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি গ্রাউন্ড কনট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। আর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন।
বর্তমানে মহাকাশে প্রায় ৫০টির ওপর দেশের দুই হাজারের ওপর স্যাটেলাইট বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ আবহাওয়া স্যাটেলাইট, পর্যবেক্ষক স্যাটেলাইট, ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ইত্যাদি। তবে বিএস-ওয়ান হলো যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট। টিভি চ্যানেলগুলোর স্যাটেলাইট সেবা নিশ্চিত করাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রধান কাজ। এর সাহায্যে চালু করা যাবে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস।
এ ছাড়া যেসব জায়গায় অপটিক ক্যাবল বা সাবমেরিন ক্যাবল পৌঁছায়নি সেসব জায়গায় এ স্যাটেলাইটের সাহায্যে নিশ্চিত হতে পারে ইন্টারনেট সংযোগ।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথে। এর ফুটপ্রিন্ট বা কভারেজ হবে ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত।
শক্তিশালী কেইউ ও সি ব্যান্ডের মাধ্যমে এটি সবচেয়ে ভালো কাভার করবে পুরো বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশগুলো, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া।
১৫ বছরের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে অরবিটাল স্লট কেনা হয়েছে। তবে বিএস ওয়ানের স্থায়িত্ব হতে পারে ১৮ বছর পর্যন্ত।
৩.৭ টন ওজনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির ডিজাইন এবং তৈরি করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। আর যে রকেট এটাকে মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে সেটি বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স। উৎক্ষেপণ হচ্ছে ফ্লোরিডার লঞ্চপ্যাড থেকে।
শুরুতে বাজেট ধরা হয় ২৯৬৭.৯৫ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ২৭৬৫ কোটি টাকায় এ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হলো। এর মধ্যে এক হাজার ৩১৫ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার আর বাকিটা বিদেশী অর্থায়ন। আর্থ স্টেশন থেকে ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্যাটেলাইটটির কক্ষপথে যেতে সময় লাগবে ৮-১১ দিন। আর পুরোপুরি কাজের জন্য প্রস্তুত হবে ৩ মাসের মধ্যে। এরপর প্রথম তিন বছর থ্যালাস অ্যালেনিয়ার সহায়তায় এটির দেখভাল করবে বাংলাদেশ। পরে পুরোপুরি বাংলাদেশী প্রকৌশলীদের হাতেই গাজীপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া আর্থ স্টেশন থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে এটি।
সব বাধা পেরিয়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে বাংলাদেশের নতুন ঠিকানা হোক সেই প্রত্যাশাই এখন সবার।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.