ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বাতিল : এক যুদ্ধেরই প্ররোচনা
ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বাতিল : এক যুদ্ধেরই প্ররোচনা

ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বাতিল : এক যুদ্ধেরই প্ররোচনা

জি. মুনীর

JCPOA, পুরো কথায় : Joint Comprehensive Plan of Action। সংক্ষেপে বিশ্বজুড়ে এটি ইরান পারমাণবিক চুক্তি বা ইরান চুক্তি নামে পরিচিত। এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। এ চুক্তি সম্পাদিত হয় ভিয়েনায় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাইয়ে। এর একটি পক্ষ ইরান। আর অপরপক্ষ পরিচিত P5+1 নামে। এই P5+1 হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশ- চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র + জর্মানি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেন্সিভ প্লান অব অ্যাকশন’ সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিক সমঝোতা শুরু হয় ‘জয়েন্ট প্লান অব অ্যাকশন’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ২০১৩ সালের নভেম্বরে ইরান ও P5+1 দেশগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে। পরবর্তী ২০ মাস ইরান ও P5+1 দেশগুলো মিলিতভাবে ২০১৫ সালের এপ্রিলে সম্মত হয় ইরানের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত পরমাণবিক চুক্তির কাঠামো তৈরির ব্যাপারে। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ইরান ও P5+1 ইরান ও আন্তর্জাতিক অ্যাটোমিক অ্যানার্জি অ্যাজেন্সির (আইএইএ) সাথে ‘রোডম্যাপ অ্যাগ্রিমেন্ট’ চুক্তি নিশ্চিত করে।

এই চুক্তি মতে, ইরান সম্মতি প্রকাশ করে- ইরান এর মাঝারিসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ অপসারণ করবে, নি¤œপর্যায়সমৃদ্ধও ইউরেনিয়ামের মজুদ কমিয়ে আনবে ৯৮ শতাংশ, এবং ১৩ বছরে এর গ্যাস সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনবে। পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য ইরান শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে ৩.৬৭ শতাংশ। ইরান আরো সম্মত হয়, দেশটি একই সময়ে কোনো হেভি-ওয়াটার ফ্যাসিলিটিজ নির্মাণ করবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার কর্মকাণ্ড প্রথম প্রজন্মের সেন্ট্রিফিউজেস ব্যবহার করে একটি একক ফ্যাসিলিটির মধ্যে সীমিত করা হবে ১০ বছরের জন্য। অন্যান্য ফ্যাসিলিটিগুলো রূপান্তর করা হবে প্রলিফারেশেন রিস্ক মোকাবেলার জন্য। ইরানের এ চুক্তি মেনে চলার বিষয়টি তদারকি করার জন্য আইএইএ নিয়মিত প্রবেশাধিকার পাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের জন্য। এ চুক্তির ফলে ইরান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ত্রাণ-সহায়তা পাবে এবং জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে পারমাণবিক সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে।

চলতি বছরে ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বলে- ইরান এর অতীত গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি প্রকাশ করেনি, যা প্রকাশ করার কথা ছিল ২০১৫ সালের চুক্তিতে। অথচ আইএইএ তদন্তকারীরা তিন হাজার দিন কাটিয়েছেন ইরানে, নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন ও নজরদারি ক্যামেরা থেকে ছবি সংগ্রহের কাজে, ডাটা ও দলিলপত্র সংগ্রহের কাজে। এসব সংগ্রহ করা হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণের জন্য। আইএইএ ডিরেক্টর উকিয়া আমানো চলতি বছরের মার্চে বলেছেন, তাদের সংস্থা পরীক্ষা করেছেন ইরানের বাস্তবায়িত সব কর্মসূচি এবং তারা দেখেছেন ইরান চুক্তির সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এরপরও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ৮ মে ২০১৮ তারিখে ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

ট্রাম্পের এই জেসিপিওএ তথা ইরান পারমাণবিক চুক্তিভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এটিকে ট্রাম্পের একটি বড় ধরনর পাগলামি ছাড়া আর কিছুই বিবেচনা করা যায় না। এটি একটি কৌশলী যুদ্ধের প্ররোচনার সূচনা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই চুক্তিভঙ্গ কোনোমতেই কোনো ধরনের যুক্তির ধারেকাছেও যায় না। আমরা অনেকেই জানি, দীর্ঘ ৯ বছরের কূটনৈতিক তৎপরতার পর এ চুক্তিট সম্পন্ন করা হয়েছিল। এ কূটনৈতিক তৎপরতার সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশ ও সেই সাথে জার্মানি এবং অবশ্যই ইরান। এরপরই কেবল সম্ভব হয়েছিল এ চুক্তিটি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাইয়ে ভিয়েনায় স্বাক্ষর করা।

আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে থাকাই তবে দেখতে পাব, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই এ চুক্তিটির বিরুদ্ধে জোরালো প্রচারণা চালান। তিনি বরাবর বলে আসছেন, এটি একটি খারাপ চুক্তি। সবচেয়ে এই খারাপ কাজ করেছে ওবামা প্রশাসন। তিনি এ কথাটি একবার নয়, বহুবার বলেছেন। তবে তিনি কখনো বলেননি, এ চুক্তির খারপ দিকটি কী।
মনে হয়Ñ ট্রাম্প তখনো জানতেন না এবং এখনো জানেন না, এ চুক্তির খারাপ দিকটি কী। কোনো চুক্তি যদি একটি দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত করে, তবে নিশ্চিতভাবে এই চুক্তিটি যায় শান্তির পক্ষে। সোজা কথায়, তখন চুক্তিটি করা হয় শান্তির জন্য। অতএব এ চুক্তিকে ভালো চুক্তিই বলতে হবে, যদি আমরা সেখানে যুদ্ধের লাভক্ষতির হিসাবটা সামনে না আনি। সম্প্রতি এ চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার সময় একটি কারণের কথা অবশ্য ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তিনি বলেছেন, ইরানকে বিশ্বাস করা যায় না। ইরান একটি সন্ত্রাসী দেশ। এটি সহায়তা করছে আলকায়দা ও অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে। ইরানের ব্যালাস্টিক মিসাইল সিস্টেম এবং এমনি আরো অনেক কিছু নিয়ে ট্রাম্পের অভিযোগ কোনো যুক্তির মধ্যে পড়ে না। এসব অভিযোগ মিথ্যা, পরস্পরবিরোধী এবং আলোচ্য চুক্তিটির এসব ব্যাপারে কিছুই করার নেই। আসলে ট্রাম্প চান ইরানকে পুরোপুরি তার কব্জায় রাখতে।

আসল কথা হচ্ছে, ট্রাম্প ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বাইরে কিছুই করতে চান না। এ ছাড়া ট্রাম্প তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেতানিয়াহু অখুশি হন এমন কিছু করতে তিনি নারাজ। তা ছাড়া তার জামাতা জ্যারেড কুশনারের দীর্ঘ দিনের কায়েমি ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে ইসরাইলের সাথে। অধিকন্তু, কুশনারেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে নেতানিয়াহুর সাথে। এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমগুলোরও এসব তথ্য অজানা নয়। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশনীতি প্রণীত হয় নেতানিয়াহুর পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করে। ট্রাম্প জানেন, রাজনৈতিক কিংবা অন্য যেকোনোভাবে ট্রাম্পের টিকে থাকাটা নির্ভর করে কতটুকু যথাযথভাবে তিনি তাদের আদেশ অনুযায়ী কাজ করেন তার ওপর। তা ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে ইসরাইলের ইহুদি বলয়ের প্রভাব থাকার কথাটি সুবিধিত।

বাস্তবতায় যদি ফিরে আসি, তবে দেখা যাবে- প্রথমত, ভিয়েনায় আণবিক শক্তি কমিশন সর্বশেষ সময় পর্যন্ত এটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছিল যে, ইরানের কোনো ইচ্ছা নেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। এ চুক্তিটির পরবর্তী সময়ে আণবিক শক্তি কমিশন আটবার এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দ্বিতীয়ত, ইউরাপীয় মিত্ররা এখন পর্যন্ত জোরালোভাবে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতাই করেছে- বিশেষ করে জোরালো বিরোধিতা করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। কিন্তু তাদের কথায় কোনো আমল দেননি ট্রাম্প। তাদের এ বিরোধিতার কারণটি আদর্শভিত্তিক হওয়ার পরিবর্তে বরং অর্থনৈতিক স্বার্থভিত্তিক। কারণ, এসব দেশ এরই মধ্যে শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্য ও প্রযুক্তি চুক্তি সই করেছে ইরানের সাথে। তৃতীয়ত, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকতর উদার ও কূটনৈতিক যোগ্যতার অধিকারী হিসেবে পরিচিত মহিলা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফেদেরিকা মোঘেরিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এ চুক্তি বাতিল করার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই এবং ইউরোপীয় ইউয়িন এই চুক্তি মেনে চলবে। তা সত্ত্বেও, অতীত ইতিহাস বলে- ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতীতে মেরুদণ্ডহীনতারই প্রমাণ বহন করে। এখন ব্যবসায়ের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার ওপর অটল থেকে কি প্রমাণ করতে পারবে যে, এ ইউনিয়নের মেরুদণ্ড শক্ত আছে? যদি তা পারে, তবে তা হবে একটি ভালো কাজ। আর না পারলে তা হবে নিছক একটি স্বপ্ন। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে একটি প্রশ্ন উঠেছে- ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি পারবে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত ঠেকাতে?

অবশ্য, রাশিয়া-চীন এ চুক্তির প্রতি অটল থাকবে। মোটের ওপর একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিকে বিবেচনা করতে হয় আন্তর্জাতিক চুক্তি হিসেবেই। শুধু বিশ্বের একটি বদমায়েশ বা দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র কিংবা নিজ-মনোনীত একটি রাষ্ট্রই এ থেকে ভিন্ন কিছু চিন্তা করতে পারে, একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে পারে। কোনো সভ্যরাষ্ট্র তা পারে না। সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের এককভাবে এ চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার মধ্যে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেয়ার ফলে ইরান এখনই এর নিজস্ব পরমাণু কর্মসূচি শুরু করে দিতে পারে। আর দেশটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অথবা অচিরেই হয়ে উঠতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ একটি দেশ।

কিন্তু ইরান একটি স্মার্ট ও সিভিলাইজড ন্যাশন। এরা স্বাক্ষর করেছে নন-প্রলিপারেশন প্যাক্ট। আর অন্তপক্ষে এখন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছেন, ইরান আলোচ্য চুক্তির প্রতি অটল থাকবে। তবে, ইরানের এ সিদ্ধান্ত অবশ্য পরিবর্তন হতে পারে। আর তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ সিদ্ধান্ত প্রশ্নে কেমন আচরণ করে তার ওপর। এখন দেখার বিষয়- ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে, না এরা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন ইউনিয়ন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সে সক্ষমতা আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাইলে স্বাধীনভাবে যে দেশের সাথে চায় তার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যেকোনো দেশের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর ব্যবসায়-বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে। অবশ্য সময়ই বলে দেবে, এটি কি নিছক একটি স্বপ্নই হয়ে থাকবে, না তা বাস্তবে রূপ নেবে।
এরপর আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে- ট্রাম্প ও তার সঙ্গী-সাথীরা অবৈধ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এ আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে গিয়ে উদ্যোগ নিতে পারে ইরানে সরকার পরিবর্তনের। তবে, তা হবে একটি কঠিন কাজ। তাদের জানা দরকার, এই কূটনীতিবহির্ভূত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রুহানিকে হার্ডলাইনার ক্যাম্পের দিকে ঠেলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের একটি বড় অংশ শুরু থেকেই এই চুক্তির বিরুদ্ধে ছিল।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ইরানের আটলান্টিস্ট বা ‘ফিফথ কলামে’র প্রতিও বড় ধরনের একটি আঘাত। এরা ইরানে খুবই শক্তিশালী। এরা নিজেদের মনে করে, এরা পাশ্চাত্যের কাছে পরিত্যক্ত। এখন এটি স্পষ্ট, ইরান এ সময়টায় এর গতি ত্বরান্বিত করবে, যেমনটি এর আগে শুরু করা হয়েছিল। ইরানকে এখন ইউরোপিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের সদস্য হয়ে এবং একই সাথে সাংহাই কো-অপারেশন অরগানাইজেশনের (এসসিও) নিয়মিত সদস্য হয়ে নজর দিতে হবে প্রাচ্যের দিকে। এ দুই সংস্থারই প্রধান হচ্ছে রাশিয়া ও চীন।

অধিকন্তু, ভুললে চলবে না- প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্টতা থাকবে নতুন সিল্করোডের অথবা বিআরআই-বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সাথে, যেটি হচ্ছে একটি আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক এন্টারপ্রাইজ। এটি প্রাধান্য বিস্তার করবে পরবর্তী কয়েক শত মাইলে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামোসংশ্লিষ্ট বিনিয়োগে। চীনের এ রোড ইনিশিয়েটিভ সংযোগ গড়ে তুলবে প্রাচ্যের সাথে ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের এবং এমনকি দক্ষিণ আমেরিকার সাথে। এ বিআরআই (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ) এমনকি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে চীনা সংবিধানেও।

চীনের বড় মাপের এ প্রোগ্রাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের মূলধারার গণমাধ্যমে খুই কমই উল্লেখ করা হয়। এর পেছনেও একটি ভালো কারণ রয়েছে। এসব মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে করপোরেট অলিগার্ক তথা গোষ্ঠীতান্ত্রিকেরা। এরা বিশ্বকে জানতে দিতে চায় না- পাশ্চাত্যের প্রতারণাপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে উঠেছে ঋণের ওপর এবং মনিটরিং সিস্টেমের একটি পিরামিড ক্রমেই পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সবাইকে পরিত্যক্ত করে দিয়ে ও দুর্ভোগে নিপতিত করে।

চীনের শান্তিপূর্ণ ‘তাও ঐতিহ্য’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিন বিশ্বের জাতিগুলোর সামনে প্রস্তাব রাখছে এ আর্থসামাজিক প্রকল্পে যোগ দিতে- কোনো চাপ ছাড়াই এ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অনেক দেশই ইতোমধ্যেই এ প্রস্তাব গ্রহণও করে নিয়েছে- এর মধ্যে আছে ইরান, ভারত, তুরস্ক, গ্রিস... এবং বড় মাপের এই প্রকল্প সম্পর্কে প্রবল সন্তুষ্টি ক্রমেই বাড়ছে। বিআরআই এখন একটি চলমান ট্রেন।
যুক্তরাষ্ট্র-পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে পাশ্চাত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করলে ইরানের কী হতে পারে? তা ছাড়া, ইরান আরো যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক ও মুদ্রাব্যবস্থা থেকে, তবে ইরানের কী হতে পারে? ইরানের কিছুই হবে না। যেমনটি প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেছেন, ইরানের ওপর আঘাত আসবে একটি স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু আমরা তা কাটিয়ে উঠে ভালো কিছু পাবো। প্রেসিডেন্ট রুহানি যে পথ অবলম্বন করে আসছিলেন, তা হলো- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝখানে ঝুলে থাকা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে কেউ বলতে পারেন ট্রাম্প নিজেই নিজের পায়ে গুলিটা ছুড়লেন।

এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র হারাল এর সামরিক বাজার। এখন যুক্তরাষ্ট্রে এর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে প্রয়োজন একটা যুদ্ধ। তা ছাড়া যুদ্ধ বাঁচিয়ে রাখবে ওয়ালস্ট্রিটকেও। তাই বলা যায়Ñ যুক্তরাষ্ট্রের আলোচ্য চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার অপর নাম একটি যুদ্ধেরই প্ররোচনা জোগানো। আর ট্রাম্প এ অযৌক্তি ঘোষণার মাধ্যমে সেই প্ররোচনাই কার্যত দিলেন। তবে তাদের জানা উচিতÑ বাঙ্কারের জীবন কখনোই কারো জন্যই সুখকর জীবন নয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.