সত্য সুরক্ষার প্রশ্নটি তাৎপর্যপূর্ণ
সত্য সুরক্ষার প্রশ্নটি তাৎপর্যপূর্ণ

সত্য সুরক্ষার প্রশ্নটি তাৎপর্যপূর্ণ

ইকতেদার আহমেদ

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এ দেশের মানুষের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি মুসলমান। মুসলমানদের ধর্ম ইসলাম এবং ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা মুসলিম নামে অভিহিত। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভাজনকালে সম্পূর্ণ ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ইন্ডিয়া নামক দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ইন্ডিয়া ভারত ও হিন্দুস্তান নামেও অভিহিত হয়। পরে জাতিগত জাতিসত্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পাকিস্তান হতে পৃথক হয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালীন ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রের চারটি মূলনীতির একটি অন্যতম নীতি ছিল। অপর তিনটি মূলনীতি হলো জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র। সামরিক ফরমানবলে প্রণীত দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮-এর মাধ্যমে সংবিধানে সংশোধনী এনে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে স্থান পায়। দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সাংবিধানিক বৈধতা প্রাপ্ত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে সংবিধানে কোনো কিছু উল্লেখ ছিল না। ১৯৮৮ সালে প্রণীত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ নম্বর ২ক সন্নিবেশনের মাধ্যমে সংবিধানে রাষ্ট্্রধর্ম অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়- প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাবে।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হলে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণীত হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীতে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ এ বাক্যটির মূল অংশ অক্ষুণœ রেখে অবশিষ্টাংশ ‘তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাবে’ এর পরিবর্তে নতুনভাবে যুক্ত বাক্যটিতে বলা হয়- ‘তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবেন’।

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে স্থান পাওয়া ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃস্থলাভিষিক্ত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সহাবস্থান সাংঘর্ষিক বিবেচিত হলেও অনেকের যুক্তি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করবেন মর্মে উল্লেখ থাকায় তা সাংঘর্ষিকতাকে অতিক্রম করেছে।

মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কুরআন। এটি একটি আসমানি কিতাব। পবিত্র কুরআন ৩০টি পারায় বিভক্ত। পবিত্র কুরআনের প্রতিটি পারায় এক বা একাধিকবার মুসলমানদের সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকতে বলা হয়েছে। সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল ব্যক্তি ঈমানদার হয়ে থাকেন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে ঈমান অন্যতম এবং একজন মুমিন মুসলমানই প্রকৃত অর্থে ঈমানদার। অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা- এ তিনটির সমষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ঈমানের বীজ।

একজন মুসলমানের জীবন সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে হয় বিধায় তার পক্ষে সত্য ও ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণের সুযোগ নেই। কিন্তু অনেক মুসলমানই স্বীয় স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও এভাবে যারা সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের ইহজগৎ ও পরজগতের পরিণতি বিষয়ে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।

আমাদের এ দেশসহ উপমহাদেশের অপর দু’টি প্রধান দেশ প্রায় ২০০ বছরকাল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকার কারণে ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী এ দেশগুলো ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিচারব্যবস্থা অনুসরণ করে আসছে। উপমহাদেশের অপর দু’টি দেশ পাকিস্তান ও ভারতে আদালত অবমাননা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। উভয় দেশের আইনে আদালত অবমাননাকে সংজ্ঞায়িত করে আদালত অবমাননার ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের এ দেশসহ উপমহাদেশের অপর দু’টি দেশ ব্রিটিশ শাসনাধীন থাকাবস্থায় ১৯২৬ সালে প্রণীত আদালত অবমাননা বিষয়ক যে আইনটি ছিল ওই আইনে আদালত অবমাননার শাস্তির বিধান উল্লেখ থাকলেও আদালত অবমাননাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। পাকিস্তান ও ভারতে ব্রিটিশ প্রণীত ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইন বাতিল করে নতুন আদালত অবমাননা আইন প্রণীত হয়। আমাদের দেশেও ব্রিটিশ প্রণীত ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইন বাতিল করে ২০১৩ সালে নতুন আদালত অবমাননা আইন প্রণীত হয়। এ আইনটির চারটি ধারা বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন করে হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা দায়ের হলে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক সম্পূর্ণ আদালত অবমাননা আইনটি বাতিল করে দেয়া হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে আদালত অবমাননাবিষয়ক কোনো আইনের অস্তিস্ত¡ নেই।

আমাদের সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টকে ‘কোর্ট অব রেকর্ড’ হিসেবে এর অবমাননার জন্য তদন্তের আদেশ দান বা দণ্ডাদেশ দানের ক্ষমতা দেয়া হলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের উপস্থিতির বিষয় উল্লেখ রয়েছে। স্পষ্টত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৩ সালের আদালত অবমাননা আইন বাতিলকালীন ১৯২৬ সালে প্রণীত আদালত অবমাননা আইন অকার্যকর ও অস্তিত্বহীন থাকায় তা পুনর্বহালের সুযোগ আইনগতভাবে অনুপস্থিত। এমতাবস্থায় দণ্ডবিধির ধারা নম্বর ২২৮-এ উল্লিখিত আদালতের সম্মুখে সংঘটিত আদালত অবমাননা ব্যতীত আদালতবহির্ভূত স্থানে আদালত অবমাননাকে আকৃষ্ট করে এমন কিছু সংঘটিত হলে আদালত অবমাননাবিষয়ক আইনের অনুপস্থিতিতে বিচার, তদন্ত ও দণ্ডাদেশের সুযোগ আছে কি না এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আমাদের উচ্চাদালতে আদালত অবমাননাবিষয়ক কার্যক্রম বা মামলার শুনানিকালে আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি তার কথিত আদালত অবমাননাবিষয়ক উক্তি সত্য মর্মে সুরক্ষা দাবি করলে কোনো কোনো বিচারকের পক্ষ থেকে বলা হয় আদালত অবমাননা মামলায় সত্য সুরক্ষা নয়।

ধর্মবিশ্বাস হলো নিজের জীবনকে ঐশ্বরিক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ। ইসলামসহ পৃথিবীতে অপর যে সব ধর্ম ঐশ্বরিক হিসেবে স্বীকৃত সেসব ধর্মেও সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকার কথা বলা হয়েছে।

আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা যেমন ধর্মীয় অনুশাসনভিত্তিক নয়, অনুরূপ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর বিচারব্যবস্থাও ধর্মীয় অনুশাসনভিত্তিক নয়। কিন্তু পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সাথে আদালত অবমাননা বিষয়ে আমাদের পার্থক্য হলো, সেসব দেশে আদালত অবমাননাকে সংজ্ঞায়িত করে এর ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে দেয়ায় সত্য সুরক্ষা নয় এ ধরনের যুক্তি কখনো গ্রহণীয় নয়।

যেকোনো আইনের সাথে নীতি, নৈতিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টি সম্পর্কিত। ধর্মবিশ্বাস একজন মানুষকে নীতি, নৈতিকতা, নিজ অধিকার ও অপরের অধিকার বিষয়ে শিক্ষা দেয়। ধর্মবিশ্বাস একজন মানুষকে শিশু অবস্থায় পারিবারিক অঙ্গনে নীতি ও নৈতিকতার দিকে আকৃষ্ট করে নীতিবান, সত্যবাদী ও ন্যায়ের প্রতি একনিষ্ঠ থাকার প্রেরণা জোগায়।

পৃথিবীর কোনো দেশের আইন সে দেশের নাগরিকদের সত্য ও ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থানের কথা ব্যক্ত করে না। আমাদের দেশেও এমন কোনো আইন নেই যা একজন ব্যক্তিকে সত্য ও ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণে উৎসাহিত করে।

আদালতে মিথ্যা বলা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া আমাদের দেশের মূল দণ্ড আইন দণ্ডবিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান। সংবিধানে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য।

ইসলাম ধর্মে সত্য ও ন্যায়ের যে অবস্থান তা থেকে আমাদের সংবিধান ও দেশের অপরাপর আইন বিচ্যুত নয়। আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার সময় একজন ব্যক্তিকে শপথবাক্য পাঠপূর্বক বলতে হয় তিনি আদালতে যা বলবেন তা সত্য বলবেন ও কোনো কিছু গোপন করবেন না এবং মিথ্যা বলবেন না। আদালতে মামলা দায়েরকালীন বাদিকে হলফনামা দাখিলপূর্বক বলতে হয় তিনি মামলার আরজি বা দরখাস্তে যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন তা তার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য। আদালতে বিবাদি যখন তার জবাব দাখিল করে তাকেও জবাবের সাথে হলফনামা প্রদানপূর্বক বলতে হয় তার দাখিলি জবাব তার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য।

আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মবিশ্বাস এবং আমাদের সংবিধানসহ অপরাপর আইনের অবস্থান সত্য ও ন্যায়ের সপক্ষে হওয়ায় আদালত অবমাননা মামলায় কোনো কোনো বিচারকের পক্ষ থেকে সত্য সুরক্ষা নয়- এমন অবস্থান গ্রহণ করা হলে তা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মগ্রন্থ, ধর্মবিশ্বাস, দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান ও অপরাপর আইনকে অবমাননা করে।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতিবিশ্লেষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.