ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট

মামুন আল করিম

প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের বসবাস এখন ঢাকায়। এই শহরে বিশুদ্ধ পানি পাওয়াটা দুষ্কর হয়ে পড়ছে। যদিও রাজধানীতে পানির সঙ্কট নতুন কোনো বিষয় না। ওয়াসার দাবি পানি উৎপাদনে ঘাটতি নেই, তবুও পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। আর যেসব এলাকায় পানির সঙ্কট নেই, সেখানকার পানিও ময়লা-দুর্গন্ধের কারণে খাবারের অযোগ্য, এমনটাই হানিয়েছেন রাজধানীর নাগরিকেরা। লিখেছেন মামুন আল করিম
ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা প্রতিদিন ২৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করতে সক্ষম। আর বর্তমানে ২৪০ রকাটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে রাজধানীতে। চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনও হচ্ছে। ফলে রাজধানীতে পানি সঙ্কট থাকার কথা না; কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পানির সঙ্কট নেই বলে ঢাকা ওয়াসা দাবি করলেও অনেক এলাকার গ্রাহক পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছেন না। বেশ কিছু এলাকায় পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধজনিত সঙ্কট চলছে। এসব এলাকার গ্রাহকেরা বাড়ির পানির বিল পরিশোধ করার পরও ওয়াসার পাম্পস্টেশন থেকে পানি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সব মিলিয়েই ঢাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশন, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার বাসাবো, মুগদা, মাণ্ডা, দোলাইরপাড়, দনিয়া, গোপীবাগ এলাকায় পানির সঙ্কট রয়েছে। একই সাথে রয়েছে দুর্গন্ধের সমস্যা। ঢাকা ওয়াসার দেয়া তথ্য মতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়াসার প্রায় পৌনে ৪ লাখেরও বেশি গ্রাহক সংযোগ রয়েছে। তবে একটি বাড়িতে একটি সংযোগ থাকলেও সেখানে একাধিক পরিবার বাস করছে। ফলে বাস্তবে গ্রাহকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এছাড়া প্রচুর অবৈধ সংযোগ রয়েছে
বাসাবোর কদমতলী সংসদ পানির পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, চার পাশের এলাকাবাসী পানি সংগ্রহে ব্যস্ত। এলাকায় টানা এক মাসের বেশি বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট চলছে। এলাকাবসাী জানিয়েছে যাদের বাসায় পানি যায় তার অধিকাংশই দুর্গন্ধযুক্ত পানি। ফলে বাধ্য হয়ে পাম্প থেকে পানি নিতে হয়। এখানে কার্ড ব্যবহার করে পানি কিনতে হয়। প্রতি লিটার ৪০ পয়সা দরে।
মুগদা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওয়াসার ২ নম্বর পানির পাম্পে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহে মানুষের ভিড়। দক্ষিণ মুগদার বাসিন্দারা জানান, বাসার কলে যে পানি আসে তা কালো, ফোটালে ফেনা বের হয়।
মাণ্ডা এলাকায় পানি কম আসে বলে ওয়াসার একশ্রেণীর কর্মীর সহায়তায় অনেক বাড়িওয়ালা আলাদা লাইন নিয়েছেন। যারা নিতে পারেননি, তারা পানি পান না। বালুর মাঠ এলাকায় ওয়াসার পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ২৫-৩০ জন লোক পানির জন্য লাইন দিয়েছেন। এলাকাবাসী জানান, বাসার লাইনে পানি কম আসে। গন্ধও থাকে। পাম্পের অপারেটর জানান, দিনে-রাতে এক হাজারের বেশি মানুষ পানি নিতে আসে।
মিরপুরের ১১ নম্বর সেকশনের বি-ব্লক এলাকার ১২ নম্বর সড়কে পানির তীব্র সঙ্কট। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, এলাকায় কমপক্ষে ২০০ ভবনে পানি প্রায় আসে না। মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আশপাশের এলাকায়ও পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। সেনপাড়া-পর্বতা এলাকার ওয়াসার পাম্পস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পানির সমস্যা জানাতে এসেছেন এলাকাবাসী। কয়েকজন গ্রাহক এই প্রতিবেদককে বলেন, গরম এলেই পানির সঙ্কট অনেক বেড়ে যায়।
ঢাকা ওয়াসার পরিচালক শহীদ উদ্দিন বলেন, পানির সঙ্কট না বলে কিছু এলাকায় পানির সমস্যা বলা ভালো। বিশুদ্ধ পানির অভাব কি সঙ্কট নয় এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, অনেক এলাকায় ৫০ বছর আগের পাইপে পানি সরবরাহ হচ্ছে। পাইপ ফুটো হয়ে যাওয়ার কারণে ময়লা ঢুকে পানি দুর্গন্ধ হয়। যত দিন পানির পাইপ বদলানো সম্ভব না হবে, তত দিন এ ধরনের সঙ্কট থাকবে। এ বিষয়ে উদ্যোগও চলছে বলে জানান তিনি।
ওয়াসার হিসাবে সায়েদাবাদ, চাঁদনী চক, নারায়ণগঞ্জ পানি শোধনাগার এবং ৮২৩টি গভীর নলকূপের সাহায্যে প্রতিদিন পানির উৎপাদন ২৪৫ কোটি লিটার। পানির চাহিদা ২৪০ কোটি লিটার। বাস্তবে উৎপাদন কম হচ্ছে। পাম্পের উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া, পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎবিভ্রাটজনিত কারণে পানির উৎপাদন অনেক কম।
ঢাকা শহরে পানি সঙ্কট রয়েছে, এ কথা অস্বীকার করেছেন ওয়াসার কর্মকর্তারা। অবশ্য তারা পানিতে ময়লা-দুর্গন্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, ওয়াসার পানির অনেক চোরাই সংযোগ রয়েছে, অবৈধ সংযোগ করতে গিয়ে লাইনে ছিদ্র হয়ে যায়, সেই ছিদ্র দিয়েই পানিতে ময়লা ঢুকে গন্ধ ছড়াতে পারে। এ ছাড়া নদীর পানিতে খুব বেশি পরিমাণ ময়লা আবর্জনা থাকে, সেই পানি রিফাইনিং করে বিশুদ্ধ করতে প্রচুর কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয়। এ কারণেও দুর্গন্ধ হতে পারে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.