বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘে উদ্বেগ

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ
কূটনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং আরো কয়েকটি পশ্চিমা দেশ। তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের সাথে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা এবং জনগণের সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে সার্বিকভাবে সব দেশই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা এবং শরণার্থীদের স্বেচ্ছা, নিরাপদ ও মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের সাথে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।


গতকাল জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) সংক্রান্ত কার্যকরী গ্রুপ বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।

তার সাথে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা ছিলেন।


বাংলাদেশ সরকারের প্রদত্ত জাতীয় প্রতিবেদন, জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থার স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা, আঞ্চলিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের মানবাধিকার পর্যালোচনায় রেপোর্টিয়ার (ট্রয়কা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে রুয়ান্ডা, আফগানিস্তান ও ইউক্রেন।


পর্যালোচনা বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেন, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেয়ার বাংলাদেশের ভূমিকাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধুবাদ জানায়। তবে বাংলাদেশে সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণœ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। বিরোধী দল, সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও শ্রমিকদের অধিকার সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমসহ অব্যাহতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারকে সত্যিকার অর্থে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র আহ্বান জানাচ্ছে।


মীর আহমেদ বিন কাসেম, আমান আজমিসহ যাদের এ পর্যন্ত গুম করা হয়েছে তাদের গুমের ঘটনা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জানানোর জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।


ব্রিটেনও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটি আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।


জাপান অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান, গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ স্বাক্ষর এবং মিয়ানমারের সাথে সংলাপের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।


সুইডেন বাল্যবিয়ে বন্ধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বিবেচনায় রেখে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট পর্যালোচনা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দিয়েছে।


সুইজারল্যান্ড আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।


ইতালি মৃত্যুদণ্ড রহিত করা এবং গুমের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।


আয়ারল্যান্ড বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।


নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেছে ভারত। দেশটি তথ্যপ্রযুক্তিতে আরো বিনিয়োগের মাধ্যমে তরুণদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।


দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেছে পাকিস্তান। ২০২১ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে দেশটি।


সৌদি আরব আগের ইউপিআরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য নেয়া পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দেশটি সন্ত্রাস দমনে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা এবং চরমপন্থার মূল কারণ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।


অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও রোহিঙ্গা সঙ্কট মোকাবেলা করেও মানবাধিকার উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জনকে সাধুবাদ জানিয়েছে কুয়েত।


মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে তুরস্ক।


রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে থাইল্যান্ড। মানবপাচার রোধে বাংলাদেশকে আরো সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটি।


রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, তাদের স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদার সাথে প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্বসম্প্রদায়ের ভূমিকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সাথে নিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ উদ্বাস্তুবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে সই করেনি ঠিকই, কিন্তু নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য সম্ভব সব কিছুই করছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। স্থানীয় বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, চাষাবাদযোগ্য জমি এবং কর্মসংস্থান কমে গেছে। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার এসব ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।


আইনমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অনিয়ম রোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ সেল সক্রিয় রয়েছে। তিনি বলেন, গুম যে ঘনঘন হচ্ছে তা সত্য নয়। সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করতে সব নিখোঁজের ঘটনাই গুম বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়।

বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ, যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহারকে গুম করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে তারা ফিরে এসেছে।


আনিসুল হক বলেন, সরকার ব্লগারসহ সবারই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট। কেউ নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। ২০১৬ সালের পর আর কোনো ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট চূড়ান্ত করার আগে পত্রিকার সম্পাদক, টিভি স্টেশনের মালিকসহ অংশীদারদের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে, যাতে এর মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণœ না হয়।


আইনমন্ত্রী বলেন, বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই বিশেষ ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম বয়সের নারী এবং ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষের বিয়ের সুযোগ আইনে রাখা হয়েছে। তবে এ জন্য আদালত ও অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত এ সুযোগের অপব্যবহার হয়নি।


সব পক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে ইপিআর সংক্রান্ত কার্যকরী গ্রুপ আগামী বুধবার বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদন দেবে। এটি বাংলাদেশের ওপর তৃতীয় ইউপিআর পর্যালোচনা। প্রথমটি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি এবং দ্বিতীয়টি ২০১৩ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।


ইউপিআরের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে জাতিসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এবার ৭ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত চলতি অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ১৪টি রাষ্ট্রের বিষয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.