অভিন্ন নদীর পানি চাই আরেক ভাসানী
অভিন্ন নদীর পানি চাই আরেক ভাসানী

অভিন্ন নদীর পানি চাই আরেক ভাসানী

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী-নালা-খাল-বিল-হাওর-বাঁওড় ইত্যাদি জালের মতো ছড়িয়ে আছে। আগে এসব নদী-নালায় সারা বছর প্রচুর পানি থাকত। দেশের মানুষ ৪০ বছর আগে পানির তেমন সমস্যা অনুভব করেনি। চাষ-বাস ও সেচের কাজে পানি পাওয়া যেত। নদীগুলো ছিল প্রায় সারা বছর নাব্য। তখন পাঁচ হাজার মাইলেরও বেশি নদীপথ ছিল। প্রচুর মাছও পাওয়া যেত। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে নদীগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

কিন্তু এখন চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। নাব্যতা হারিয়ে এখন মাত্র এক হাজার মাইলের মতো নদীপথ টিকে আছে। শুকনো মওসুমে নৌচলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার মতো বৃহৎ নদীতে অসংখ্য বালুচর শুষ্ক মওসুমে দেখা যায়। পানির অভাবে দেশের দক্ষিণ-পঞ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। চাষ-বাসে বিঘ্ন হচ্ছে পর্যাপ্ত পানির অভাবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নদীতে ভাটির স্রোতের অভাবে বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি দেশের অভ্যন্তরে উজানে ঢুকে পড়ছে। এটা নগরবাড়ী ঘাট পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলে উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যে বিরাট সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন লবণাক্ততায় বিপর্যয়ের পথে। নদীতে মাছ না থাকায় জেলেদের জীবনে নেমে আসছে বিপর্যয়। পানির অভাবে দেশের প্রথম বৃহত্তম সেচপ্রকল্প জি কে প্রজেক্ট এখন প্রায় পরিত্যক্ত। কারণ পদ্মা নদীতে পানি নেই। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ দিয়ে শুকনো মওসুমে ট্রাক-লরি ও গাড়ি পার হচ্ছে। সারা দেশের বেশির ভাগ নদীর আজ একই চিত্র।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। তার মধ্যে ৫৩টিতেই ভারত বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ভাটির বাংলাদেশের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনার প্রয়োজনই মনে করেনি। পাকিস্তান আমল থেকেই ভারত গঙ্গা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিবাদের মুখে তা আর এগোয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণে সবিশেষ তৎপর হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে মাত্র ১৫ হাজার কিউসেক পানি কলকাতা চ্যানেল প্রবাহিত করতে পারলে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা ঠিক রাখা যাবে। নদীর তলায় যে পানি জমে, তা পানির স্রোতে ধুয়ে নিয়ে যাবে। তাই ফারাক্কা বাঁধ চালু করা দরকার এবং এটি পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র ৪০ দিন চলবে, কিন্তু ভারত সে ব্যারাজ চালু করে তারপর তা আর বন্ধ করার প্রয়োজনবোধ করেনি। তারা বাঁধের সুবাদে গঙ্গার উজানে বিহার ও মধ্যপ্রদেশে সেচকাজে সে পানি ব্যবহার করছে। উজানে ইতোমধ্যে গঙ্গায় ৩০টি বাঁধ দিয়ে তারা পানি প্রত্যাহার করছে। এতে নিম্নাঞ্চলে বা ভাটির বাংলাদেশে আর তেমন পানি আসছে না। শোনা যাচ্ছে, ভারত গঙ্গায় আরো ১৬টি বাঁধ দিয়ে পানি উজানে প্রত্যাহার করে তার সেচ কাজে ও শহরে পানি সরবরাহ করবে। আওয়ামী লীগ সরকার ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে গ্যারান্টি ক্লজ ছাড়াই ৩০ বছরের একটা চুক্তি করেছে। আগে ফারাক্কা পয়েন্টে শুষ্ক মওসুমে পানি থাকত ১ লাখ ৭০ হাজার কিউসেক। এখন সেখানে পানি পাওয়া যায় মাত্র ২৫ হাজার কিউসেক। তার শতকরা ৫০ ভাগ পানি দিলে বাংলাদেশ পাবে মাত্র ১২ হাজার ৫০০ কিউসেক। অথচ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় পানি পাওয়া যেত ৮৫ হাজার কিউসেক। এখন যে পানি পাওয়া যায়, তাতে পদ্মা নদীর নাব্যতাই বজায় রাখা যায় না; বাংলাদেশের প্রয়োজন পূরণ তো দূরের কথা।

ভারতের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাব মোতাবেক, দেশটি প্রাকৃতিক বিভিন্ন উৎস (বৃষ্টি, জলপ্রপাত, নদী) থেকে প্রতি বছর ছয় হাজার ৫০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি পেয়ে থাকে। সারা বছরের সব কাজের জন্য মোট সর্বোচ্চ ৯০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানির প্রয়োজন তার। ভারত তার প্রাপ্য পানি দিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চালাতে পারে পূর্ণ ব্যবহার করে। অর্থাৎ, কী বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় করছে ভারত। এটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের অতি প্রয়োজনীয় পানি না দিয়ে তার দেশে অপচয় করছে আর আমাদের মারছে পানিতে। তারা অভিন্ন নদীগুলোর পানি প্রত্যাহার করছে অথচ নিজের দেশের পানিরই অনেক অপচয় করছে। যে পানি তারা পাচ্ছে, তার মাত্র ১৫ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।

জানা গেছে, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমার, ধরলা ও মহানন্দাসহ হিমালয় অঞ্চলের অভিন্ন নদী ও উপনদীতে ৫০০টি বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ভারতে ৪৫০টি ও নেপালে ৩০টি এবং ভুটানে ২০টি বাঁধ রয়েছে। এসব প্রকল্পে বাংলাদেশকে অংশীদার করার প্রস্তাব করা হয়েছিল যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে। কিন্তু ভারত তা করতে অস্বীকার করেছে। সমন্বিতভাবে এসব প্রকল্প কার্যকর করা হলে প্রচুর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত; যা দিয়ে ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল উপকৃত হতো। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে বড় কয়েকটি ড্যাম করে এক লাখ ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অথচ নেপালের জনগণ বিদ্যুতের অভাবে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। এ জন্য প্রয়োজনে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ আর্থিক সাহায্য দিতে চেয়েছে। কিন্তু ভারতের একগুঁয়েমিতে তা এখন পর্যন্ত সফলতার মুখ দেখেনি। ভারত ও পাকিস্তান সিন্ধু নদের পানি চুক্তি ওই দু’টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় করেছে। বৈরীভাবাপন্ন দু’টি দেশ যদি সিন্ধুর পানি ভাগাভাগি করে উভয়ই উপকৃত হতে পারে; তবে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান কেন তা করতে পারবে না? ভারতের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের সাথে তেমন কোনো রাজনৈতিক বৈরী ভাব নেই। তাই এটা করা আরো সহজ। একলা চলার নীতিতে বিশ্বাসী ভারত তার প্রতিবেশীদের সাথে যৌথভাবে কিভাবে কাজ করবে?

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাথাভাঙ্গা, বেতনা, সোনামুখী, ভৈরব, রায়মঙ্গল, ইচ্ছামতি নামের অভিন্ন নদী রয়েছে। এগুলোর ওপর নির্ভর করে সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদহ জেলার কৃষি ও নাব্যতা। উজানে ভৈরব নদের উৎসমুখে ভারতে জলঙ্গি নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেগুলেটর। এই বাঁধ ও রেগুলেটর দিয়ে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে পানির অভাবে ভৈরব নদ মরে যাচ্ছে। পানি পাচ্ছে না কপোতাক্ষ। ফলে এ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতাসহ মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসছে এখানকার বাসিন্দাদের ওপর।
ভারত সত্তরের দশক থেকেই বাংলাদেশকে গঙ্গার প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত করে আসছে।

বাংলাদেশের নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ সর্বজন শ্রদ্ধেয় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দেশের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে উদাত্ত আহ্বান জানান গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশকে দেয়ার জন্য। ইন্দিরা আশ্বাস দিলেও তা কার্যকর করেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মওলানা ভাসানী গণ-আন্দোলনের ডাক দিলেন। তিনি ঘোষণা দিলেন, ভারত হিস্যার পানি না দিলে লংমার্চ করে ফারাক্কায় পৌঁছবেন। তখন তিনি বৃদ্ধ বয়সের কারণে নানা জটিল রোগে ভুগছিলেন। কিন্তু নিজের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করে দেশের স্বার্থে তিনি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সারা দেশে গণজাগরণ এলো। বার্ধক্যের কারণে তাকে অনেকে এ আন্দোলন থেকে বিরত থাকতে বললেও কিন্তু দেশের বাঁচা-মরার কথা চিন্তা করে তিনি পিছপা হলেন না। সারা দেশ থেকে শিক্ষক-ছাত্র-কৃষক-মজুর-সমাজকর্মী, কর্মচারীসহ সর্বস্তরের মানুষ রাজশাহী গিয়ে জমায়েত হয়েছিল। সেখানে এক মহাসমাবেশ করে আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে তিনি আবার ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ জানালেন এবং সময় বেঁধে দিলেন ৬ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে হবে। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি ১৫ মে ১৯৭৬ সালের সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত নেন লংমার্চ এগিয়ে যাবে।

ভাসানী সেই বিশাল জনসমুদ্র নিয়ে হেঁটে লংমার্চ শুরু করেন। সে লংমার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি ৯৬ বছর বয়সে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাত যাপন করে ১৬ মে সকালে জনসমুদ্র নিয়ে কানসাটের দিকে রওনা হন। সে দিন জনসমুদ্র মুহুর্মুহু স্লোগান দিয়েছে- ‘ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও,’ ‘পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে হবে, দিতে হবে।’ আকাশে বাতাসে সে মহাধ্বনি চার দিকে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে লোক লংমার্চে অংশ নিয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধী মওলানা ভাসানীকে খুবই ভয় করতেন। তাই আমাদের ’৭১-এ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ইন্দিরা তাকে নজরবন্দী করে রাখেন। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ভারতের সাথে একটি চুক্তি করে, যা ছিল স্বাধীন দেশের জন্য অবমাননাকর। ভাসানী কলকাতায় বসেই এ চুক্তির প্রতিবাদে হুঙ্কার ছাড়েন।
মওলানা ভাসানীর লংমার্চে ভারত এত ভীত হয়ে পড়ে যে, বর্ডারে সেনাবাহিনী ও এবিএসএফ মোতায়েন ছিল। ভয় ছিল মওলানা ভাসানী জনসমুদ্র নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েন কি না। স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে পদ্মার ওপর নৌকা সাজিয়ে ব্রিজ তৈরি করে দেন, যাতে জনগণ তা পার হয়ে ভারতের দিকে যেতে পারে। কিন্তু জননেতা ভাসানীর পরিমিতি বোধ ছিল প্রখর। পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে জনসমুদ্রের সামনে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশে বললেনÑ ‘গঙ্গার পানি আমাদের বাঁচা-মরার প্রশ্ন। এই পানি থেকে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না। তিন মাসের মধ্যে আমরা এর একটা বিহিত চাই। অন্যথায় ভারতের জন্য আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এবার ইন্দিরাকে একটা মেসেজ দিলাম। এর পর হবে ডাইরেক্ট অ্যাকশন। আমরা জান দেবো, তবু পানির হিস্যা আদায় করে ছাড়ব, ইনশাআল্লাহ।’ ইন্দিরা বাধ্য হয়ে গঙ্গা নদীর পানির হিস্যা নির্ধারণে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করলেন। অল্প দিনের মধ্যে ভারত জিয়াউর রমানের সরকারের সাথে পানিচুক্তি করতে বাধ্য হলো। অনেকে বলেন, মওলানা ভাসানীর লংমার্চের মূল পরামর্শদাতা ছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এই চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লোজসহ সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ফারাক্কা পয়েন্টের নি¤œাংশে পানি থাকবে নি¤œতম ৪৫ হাজার কিউসেক।

কিন্তু আওয়ামী সরকারের পানি চুক্তির বদৌলতে শুষ্ক মওসুমে ১০ হাজার কিউসেক পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আমাদের কৃষিতে করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকরা অধিক উৎপাদনের আশায় ইরি ও বোরো ধান চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু এতে সেচের প্রচুর পানির প্রয়োজন। বহু আবাদি জমির ধান শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। লাখ লাখ গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। পানির অভাবে বহু ইরি-বোরো ধানক্ষেত শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তিস্তা ব্যারাজ তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২.৫ লাখ হেক্টর জমি পানিসেচের আওতায় আনা হবে। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ৭০ মাইল উজানে গজলডোবায় বিরাট বাঁধ দিয়ে ভারত বলতে গেলে তিস্তার সব পানিই প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তিস্তা বাঁধ এলাকায় এখন ৫০০ কিউসেক পানিও পাওয়া যায় না, যা দিয়ে সেচ দূরে থাক, নদীর নাব্যতাও রক্ষা করা যাচ্ছে না। এতে করে রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, বগুড়া, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলা পানিশূন্য হয়ে মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

অন্য দিকে, দেশের উত্তর-পূর্বাংশে টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে আমাদের জন্য আরেক মারণফাঁদ সৃষ্টি করছে ভারত। বৃহত্তর সিলেটের উজানে সুরমা-কুশিয়ারা বরাক নদীর সাথে মিশেছে। সেই বরাক নদীর ১০০ কিলোমিটার উজানে মনিপুরের টিপাইমুখ নামক স্থানে এক বিরাট ব্যারাজ ভারত নির্মাণ করতে শুরু করেছে। ভারতের মুখের কথা, এ বাঁধে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবে না। এ আপ্তবাক্য তারা ফারাক্কা, তিস্তার গজলডোবার বাঁধের ব্যাপারেও বলেছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার উল্টো চিত্র দেখতে পাই। তারা বলছেন, টিপাইমুখ ড্যাম শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য করা হচ্ছে। অথচ ইতোমধ্যেই টিপাইমুখ ড্যাম থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে আরেকটি বাঁধ দিয়ে বরাক নদীর পানি নিয়ে জলসেচ করার পরিকল্পনা করছে। তারা উজানে পানি প্রত্যাহার করলে বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারায় পানি পাওয়া যাবে কি?

এতে সুরমা-কুশিয়ারাসহ মেঘনা অববাহিকা পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। ফলে বৃহত্তর সিলেট, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, হাওর অঞ্চল বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। কৃষি, নৌচলাচল, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে যাবে। অধিকন্তু ওই ড্যামটি দু’টি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ স্থানে অবস্থিত, যা অত্যন্ত ভঙ্গুর। যেকোনো সময় মারাত্মক ভূমিকম্প হতে পারে। সত্যিই যদি সে ভূমিকম্প হয়, তাহলে টিপাইমুখ ড্যাম ভেসে যাবে। ফলে বরাক নদীতে যে প্রচুর পরিমাণ পানি আবদ্ধ থাকবে, তা একসাথে প্রবাহিত হয়ে নদীর পাড় ভেঙে মানুষের বসতবাড়িগুলো ভাসিয়ে নেবে এবং পানির উচ্চতা ২৫ থেকে ৩০ ফুট হতে পারে।

ভারতের আন্তর্জাতিক নদীর রীতিনীতিবিরোধী কাজকে ঠেকিয়ে রাখতে চাই ভাসানীর মতো সাহসী নেতা। মানুষের দুঃখ-বেদনা দূর করতে আমাদের মধ্যে সৎ রাজনীতির চর্চা করতে হবে। মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করলে দেশের উন্নতি দ্রুত হতে পারে।
লেখক : পানি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.