পানির জন্য যুদ্ধ
পানির জন্য যুদ্ধ

পানির জন্য যুদ্ধ

এরশাদ মজুমদার

বিশ্বব্যাপী আওয়াজ উঠেছে আগামী বিশ্বযুদ্ধ হবে পানির জন্য। পানি সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ নিজেই। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকেই। তাই পানির অপর নাম জীবন। সেই জীবন নিয়েই এখন টানাটানি চলছে। বিশ্বব্যাপী নদী আর সাগর নিয়ন্ত্রণের জন্য ক্ষমতাবান দেশগুলো উঠেপড়ে লেগেছে। পানি নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের মানসিক যুদ্ধ এখন চরমে উঠেছে। ভারত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের মরুকরণের কাজ শুরু করেছে। ভারত ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করেছিল পাকিস্তান আমলে। পাকিস্তান আপত্তি করায় সে সময়ে ভারত এ ব্যাপারে কিছুটা ধীর গতিতে চলে।

কিন্তু গোপনে নির্মাণকাজ চালু রাখে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার জন্য চাণক্যনীতি অবলম্বন করে। এ সময়ে তারা বঙ্গবন্ধুর সরলতাকে কাজে লাগায়। ভারত জানাল- তারা পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা চালু করে দেখতে চায় এবং বাংলাদেশকে বেশি পানি দেবে বলে ওয়াদা করে। একই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শঠতার পথ অবলম্বন করে বেরুবাড়ী নিয়ে নেন। বাংলাদেশের দহগ্রাম অঙ্গরপোতা দেবে বলে আর দেয়নি। বাংলাদেশের বহু জমি জোর করে দখল করে রেখেছে। এখনো পানি ও জমি নিয়ে টালবাহানা চলছে। ফলাফল হলো, বঙ্গবন্ধুকে দিল্লি ঠকিয়েছে। বঙ্গবন্ধু হয়তো ভেবেছিলেন, ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছে তাতে তাদের এটুকু বিশ্বাস করা যায়। সে বিশ্বাসের মর্যাদা ইন্দিরা গান্ধী রক্ষা করেননি। একেই বলে চাণক্যনীতি বা বুদ্ধি। রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বিশ্বাস কোনো কাজে লাগে না তা বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেই ভারতবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেটা শুরু করেছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সব ব্যাপারে ভারতের নাক গলানো এবং বাড়াবাড়ি দেখে বঙ্গবন্ধু তার নেতা মওলানা সাহেবের গোপন সমর্থন চাইলেন। মওলানা সাহেব অকাতরে সেই সমর্থন দিয়েছিলেন। মওলানা সাহেব ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিলেন। এর পরেই ভারত একটু থমকে দাঁড়িয়েছিল।

মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ও নেতৃত্বে ফারাক্কা মিছিল বা লং মার্চ শুধু পানির জন্য মিছিল ছিল না। এ মিছিল ছিল আমাদের সার্বভৌমত্বের পক্ষে প্রথম বুলন্দ আওয়াজ। দিল্লি ভালো করেই জানত ভাসানী কী ধরনের মানুষ। তিনি যেকোনোভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যেতে পারেন ভেবে দিল্লি থেকে ইন্দিরা গান্ধী মওলানা সাহেবকে আদাব আরজ পাঠিয়েছিলেন। মওলানা সাহেব ইন্দিরার দাদা মতিলাল নেহরুর সাথে রাজনীতি করেছেন। ১৯৬৯ সালের ১৮ এপ্রিল টাইম ম্যাগাজিন মওলানা সাহেবকে ‘প্রফেট অব ভায়োলেন্স’ বলে আখ্যায়িত করে কভার স্টোরি করেছিল। পশ্চিমা মিডিয়া মওলানা সাহেবকে আরো বলেছিল, ‘মাও অব ইস্ট ইন ডিজগাইজ অব অ্যা প্রিস্ট’। পাকিস্তানের মিডিয়াগুলো তাকে লাল মওলানা বলে ডাকত। কাগমারি সম্মেলনের মাধ্যমে মওলানা সাহেব পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছিলেন। পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীকে মওলানা সাহেব বারবার হুঁশিয়ার করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কানে তা যায়নি। মওলানা সাহেবই সবার আগে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের আওয়াজ তুলেছিলেন। তখন আওয়ামী লীগ বলেছিল, ৯৮ শতাংশ স্বায়ত্তশাসন পাওয়া গেছে। দেশপ্রেমের তাগিদেই মওলানা সাহেব ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া পরোক্ষভাবে মওলানা সাহেবের এ উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। মওলানা সাহেব ছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধানতম প্রতীক। দেশ যখনি কোনো বিপদের সম্মুখীন হয়েছে তখনি তিনি খামোশ বলে বুলন্দ আওয়াজ তুলতেন।

ফারাক্কা দিবস বাংলাদেশের সব সরকারেরই পালন করা উচিত। কিন্তু তা হয় না। আওয়ামী লীগ তো মনে করে এ মিছিল তাদের বিরুদ্ধে। ভারতের সাথে পরীক্ষামূলক ফারাক্কা চুক্তি করে বঙ্গবন্ধু ভুল করেছিলেন। তার সরলতার সাথে ভারত বেঈমানি করেছে। সেই পরীক্ষামূলক চুক্তি এখন স্থায়ী চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। সবার মনে রাখা দরকার ভারতের সাথে আমাদের ৫৪টি নদীর সংযোগ রয়েছে। এসব নদী থেকে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে বা করার চেষ্টা করছে। এটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। পৃথিবীর কোথাও এমনটি হয়নি। সিন্ধু নদী নিয়ে ভারত পাকিস্তানের সাথে এমন আগ্রাসী ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সিন্ধু একটি আন্তর্জাতিক নদী, তাই এর পানির হিস্যা আন্তর্জাতিক নিয়মেই বণ্টন হবে। তারবেলা ড্যাম নির্মাণ হয়েছে বিশ্বব্যাংকের অর্থে। তাই ভারত সিন্ধু নদীর পানি একতরফাভাবে নিতে পারেনি।

মৃত্যুর আগে সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল আমিন আহমদ চৌধুরী ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের ওপর একটি নিবন্ধ লিখেছেন যা নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে। তার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের চলমান অবস্থার জন্য উভয় দেশের আমলাদের মাইন্ডসেট বা মনোজগৎ দায়ী। আলোচনার সময় উভয় দেশই মানসিক সমস্যায় থাকে। এটা হলো আমিন আহমদ চৌধুরীর অনুধাবন। তিনি আমার একজন সম্মানিত বন্ধু ছিলেন। তাকে আমি খুবই পছন্দ করি। বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের ব্যাপারে তার পর্যবেক্ষণের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি। আমি মনে করি, ভারত নিজের স্বার্থ রক্ষায় এক শ’ ভাগ ঠিক পথে চলছে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ রক্ষায় দুর্বল। আমলারা রাজনৈতিক সরকারের চিন্তাধারাকে বাস্তবায়ন করেন। আমাদের নেতাদের মনোজগতে সব সময় একটা অবস্থান স্থায়ী হয়ে আছে, তা হলো ভারত আমাদের স্বাধীনতায় বিরাট অবদান রেখেছে। এমন বন্ধুর সাথে কেন দরকষাকষি করি। এই তো কয়েক মাস আগে সিনিয়র আমলা মশিউর রহমান বলেছেন, বন্ধুর কাছে টাকাপয়সা চাওয়া বেমানান। বন্ধু বন্ধুর দেশের ওপর দিয়ে নিজ দেশে যাবে এতে শুল্কের কথা আসে কেন। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত তা আজ পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। এ ব্যাপারে আমাদের নেতাদের বুক দুরু করে। ভারত বড় দেশ, ক্ষমতা বেশি, আমাদের সীমান্ত ভারতবেষ্টিত হয়ে আছে। ভারতের মনে কষ্ট লাগে এমন কথা বলতে আমাদের রাজনীতিক ও আমলারা চান না।

শ্রীলঙ্কা ভারত সম্পর্কের প্রশ্নে বহু বছর পর শ্রীলঙ্কা কোমর শক্ত করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ভারতের সমর্থনপুষ্ট তামিল গেরিলাদের সাথে বহু বছরের গৃহযুদ্ধে শ্রীলঙ্কা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। শক্তিশালী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রেসিডেন্ট রাজা পাকশে তামিল বিদ্রোহীদের বিতাড়িত করেছেন। এখন ভারত ও জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারের কথা বলে কান্নাকাটি করছে। এ ব্যাপারে শ্রীলঙ্কা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার টিমকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের বিদেশনীতি হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোকে দুর্বল করে তার শক্তিশালী প্রভাবে রাখা এবং নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য করা। প্রতিবেশী একটি দেশের সাথেও ভারতের সুসম্পর্ক নেই। এর প্রধান কারণ, ভারতের অ্যাটিচিউড বা চলমান বিদেশনীতি। এই বিদেশনীতির মূলমন্ত্র হলো গায়ের জোর। কথা না শুনলে শক্তি প্রয়োগ করো। কথা শুনতে বাধ্য করো। আর তা না হলে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে দাও।

প্রেসিডেন্ট জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের একজন স্বাধীন নেতা। যিনি বুঝতেন বাংলাদেশের স্বার্থ কিভাবে রক্ষা করতে হবে। তিনিই প্রথম সমতা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে দিল্লির সাথে কথা বলতে শুরু করেছিলেন। তিনি আরব ও মুসলিম বিশ্বের সাথে বন্ধুত্ব বাড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের অবস্থানকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিষ্কার করার জন্য। এ কারণেই জিয়া সাহেব বেশি দিন বাঁচতে পারেননি। একইভাবে ভারত নেপালে নিজেদের পথ পরিষ্কার করেছে। আজ নেপাল একটি অশান্ত দেশে পরিণত হয়েছে। মালদ্বীপেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

ভারতের প্রতিবেশী সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে ভালো এবং সুদৃঢ়। শুধু প্রয়োজন দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতীয় ঐকমত্য ও শক্তিশালী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের নেই। ভারতের স্বার্থ দেখা ও রক্ষার জন্য বাংলাদেশে বহু রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, আমলা, অর্থনীতিবিদ, কবি, শিল্পী ও সাংবাদিক রয়েছেন। যারা টিভি টকশোতে বলেন বাংলাদেশের সামরিক শক্তির কোনো প্রয়োজন নেই। অনেকেই বলেন, ভারতের সাথে যুদ্ধ করে বাংলাদেশের জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। আবার অনেকেই বলেন, ভারতের সংস্কৃতি আর আমাদের সংস্কৃতি একই। তাই সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের নাকি একই ইতিহাস ও একই ঐতিহ্য। জাতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের দ্বিমত দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ভারত তাই বাংলাদেশের কোনো কথাই শোনে না। তাই ফারাক্কা দিবসে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর কথা বারবার মনে পড়ছে। আমাদের সার্বভৌমত্বের পক্ষে বুলন্দ আওয়াজ তোলার এখনই সময়। কিন্তু কে এই আওয়াজ তুলবে। আর কত দিন এই আওয়াজ তুলতে লাগবে?
লেখক : কবি ও সাংবাদিক
ershadmz@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.