রমজান : আল্লাহর পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপহার
রমজান : আল্লাহর পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপহার

রমজান : আল্লাহর পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপহার

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

গত বুধবার, ৯ মে ২০১৮ প্রকাশিত আমার কলামের শেষ অনুচ্ছেদে বলা ছিল যে, ১৬ মের কলামে সংবিধান ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে লিখব; কিন্তু একটি চিন্তা মাথায় এলো, ১২টি মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম মাস রমজানুল মোবারক যেহেতু আমাদের সামনে উপস্থিত, সেহেতু রমজান প্রসঙ্গে সম্মানিত পাঠকের সামনে আমার বিনীত মূল্যায়ন উপস্থাপন করলে কাজটি ভালোই হবে। তাই এই সপ্তাহের কলামটি রমজানুল মোবারক নিয়ে এবং পাঠকদের সাথে রমজানের পবিত্রতা ও শুভেচ্ছা বিনিময় করছি। আগামী সপ্তাহে ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশের সংবিধান এবং নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে লিখব।

পাঠকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন ও শুভেচ্ছা এবং কামনা এই মর্মে যে, তারা যেন রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করেন এবং এর উপকারিতা গ্রহণ করতে পারেন। একই সাথে আবেদন করছি সম্মানিত পাঠকগণের প্রতি, তারাও যেন এই কলাম লেখকের জন্য মন থেকে দোয়া করেন; যেন রমজানের উপকারিতা আমিও পাই। আমি মনে করি, পবিত্র রমজান মাস মহান আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য একটি বিশেষ উপহার। এটি এক প্রকার ওষুধ, যা রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র। এটি একটি পারাপারের জন্য ছাড়পত্র। আমি যে তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছি তথা উপহার, রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থাপত্র এবং পারাপারের ছাড়পত্র; সে তিনটি শব্দের প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা আমি আলাদা আলাদা উপস্থাপন করছি। তবে প্রথমেই সিয়াম পালন সম্পর্কে কিছু অভিমত বা অনুভূতি উপস্থাপন করছি। যারা রোজা রাখেন, তাদের অন্তত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে পড়েন বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ রোজাদার, যারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন এবং অন্যান্য প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ্যে মেনে চলেন। দ্বিতীয় ভাগে পড়েন নেককার ও সালেহিন বান্দারা। সালেহিন শব্দের অনুবাদ সৎকর্মশীল বা সৎকর্মপরায়ণ। এই দ্বিতীয় ভাগের রোজাদারদের জন্য রোজার স্তর আরো বিশদ ও উচ্চতর। প্রথম পদক্ষেপ হলো, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর সংযম বা রোজা পালন।

চোখের রোজা হলো, ওইসব দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকা, যেগুলো দেখা হারাম বা নিষেধ। কানের রোজা হলো ওইসব শব্দ বা কথা শোনা থেকে বিরত থাকা, যেগুলো শোনা হারাম বা নিষেধ। চোখের স্বভাব হলো সব কিছুর ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা, কানের স্বভাব হলো যা কিছু শোনা যায় তাই শোনা। চোখ বা কান উভয়ের তৃপ্তি মন্দ জিনিস শোনা বা দেখায়, যদিও বা ওই তৃপ্তি সাময়িক; কিন্তু আত্মা বা নফস বা চিন্তাশক্তি দ্বারা চোখ ও কানের কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

হাতের কাজ হলো ধরা, সাময়িক তৃপ্তির জন্য হাত অনেক সময় অনেক কিছু ধরতে চায়, যেটা ধরা হারাম বা নিষেধ। অথবা হাতের তৃপ্তি নয়, বৃহত্তর অপরাধ সংঘটনে হাত নিজের ক্ষুদ্র ভূমিকাটি পালন করে, যথা মানুষ হত্যা, চুরি ইত্যাদি। হাতের রোজা হলো নিয়ন্ত্রিত থাকা, যেন নিষিদ্ধ কাজ না করে। হাতকে নিয়ন্ত্রণ করবে নফস বা আত্মা বা চিন্তাশক্তি। মুখের কাজ কথা বলা ও স্বাদ গ্রহণ করা বা খাওয়া। এই মুখ দিয়ে নিষিদ্ধ বা হারাম বস্তু খাওয়া যায় বা মুখের যে অংশকে ঠোঁট বলে, সেটা দিয়ে নিষিদ্ধ বা হারাম বস্তু স্পর্শ করা যায়। মুখ দিয়ে সুন্দর কথাও বলা যায়, অশ্লীল কথাও বলা যায়। মুখের কথা দিয়ে মানুষের মনে এমন কষ্ট দেয়া যায়, যেটা শারীরিক আঘাত পাওয়া থেকে বেশি। যিনি মনে আঘাত পান, তিনি হয়তো মুখে প্রকাশ করেন না এবং সে জন্যই আঘাতকারী বুঝতে পারে না নিজেই নিজের কত বড় ক্ষতি করল। এখানেও মুখের জবানকে সংযত করার প্রয়োজনীয়তা অবিসংবাদিত।

সংসার জীবনে অনেকেই অনেককে কটুকথা বলে, ঝগড়া করার জন্য উত্তপ্ত বাক্য ব্যবহার করে; অন্যের বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণা (গিবত) চালায়। রমজান মাসে করণীয় অশ্লীল জবান বন্ধ রাখা এবং ভালো কথা বলা; অন্যের করা গিবতের প্রেক্ষাপটে নিজে গিবত না করা বা অন্যের উত্তপ্ত বাক্যের বিনিময়ে নিজে সংযত থাকা। কোনো ব্যক্তির সাথে ঝগড়া লাগার আশঙ্কা দেখা দিলে, সেটি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য ওই স্থান ত্যাগ করা শুধু এটুকু বলে যে, ‘আমি রোজা আছি।’ মুখের অগ্রভাগ অর্থাৎ ঠোঁট দিয়ে নিষিদ্ধ বা হারাম স্থান স্পর্শ না করাও হচ্ছে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মুখ ও ঠোঁটকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নফস বা আত্মা বা চিন্তাশক্তির। চোখ, কান, হাত ও মুখ যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে রোজা সহজতর ও অধিকতর ফলপ্রসূ হয়। ফজরের নামাজের আগে রোজার নিয়ত করার সময় মনে মনে নিয়ত করা যায়- চোখ, কান, হাত ও মুখকে নিয়ন্ত্রণে রাখব এবং এর জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে।

অন্য সময়ের তুলনায় রমজানের সময় একজন ঈমানদার ব্যক্তির চিন্তা ও নফসের ওপর শয়তানের পক্ষ থেকে অধিকতর আক্রমণ আসে। এসব শত্রুর উদাহরণ হচ্ছে অবৈধভাবে টাকা প্রাপ্তির হাতছানি, নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্কে আকর্ষণ এমনকি অযাচিত প্রশংসা। এই আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে দু’টি কৌশল অবলম্বন করা যায়। একটি হচ্ছে আত্মরক্ষামূলক; অর্থাৎ রমজানকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আত্মরক্ষা করা। অপরটি হচ্ছে আক্রমণাত্মক। যেসব লোভ-লালসা, আনন্দ, সৌন্দর্য আত্মাকে আকর্ষণ করে; সেগুলোর দিকে বন্দুকের গুলির মতো বা কামানের গোলার মতো বিতৃষ্ণা অনীহা অপছন্দ ইত্যাদি ছুড়ে মারা। এ দু’টি কৌশল একই সাথে ব্যবহার করা যায়।

মহান আল্লাহ তায়ালা যখন প্রথম মানব-মানবীকে সৃষ্টি করলেন তখন সেই প্রথম মানব-মানবী যথাক্রমে হজরত আদম আ: এবং তার সম্মানিত জীবনসঙ্গিনী বিবি হাওয়া আ:, তাঁরা উভয়ে বেহেশতে থাকার জন্য প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছিলেন; কিন্তু পরে সময়ে শয়তান তাদেরকে এমন কুমন্ত্রণা দেয়; যার ফলে তারা শিগগিরই আল্লাহপ্রদত্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ফেলেছিলেন।

এই অমান্য করার ফলে তাঁদেরকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। পবিত্র কুরআনের বর্ণনা থেকে যতটুকু ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, সেখানে কেবল একটি প্রেক্ষাপট আলোচিত হয়েছে। তা হলো মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে সৃষ্টি করার পর এই মর্মে আদেশ করেছিলেন, তাঁরা যেন একটি সুনির্দিষ্ট গাছের ফল ভক্ষণ না করে এমনকি ওই গাছটির নিকটবর্তীও যেন না হয়। কিন্তু শয়তান তাঁদেরকে কুমন্ত্রণা দিয়েছিল এই বলে যে, এ গাছটির ফল ভক্ষণ না করার চেয়ে ভক্ষণ করাই উত্তম এবং এ গাছটির ফল ভক্ষণ করলে তোমরা বেহেশতে চিরজীবী হবে; সর্বোপরি তোমরা বেহেশতে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে। এতে তোমাদের কোনো ক্ষতিসাধন হবে না, তাই তোমরা নিশ্চিন্তে এই গাছের ফল খেতে পারো। অতএব, তাঁরা গাছটির ফল খেয়েছিলেন। খাওয়ার সাথে সাথে যা হওয়ার তা-ই হলো। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাদের উভয়ের মধ্যে মানবীয় স্পর্শকাতরতা প্রকাশ পেতে শুরু করল। ঠিক সেই সময় মহান আল্লাহ তায়ালা সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিতে।

যদ্দূর জেনেছি এবং পড়েছি, তা থেকে বলা যায় হজরত আদম আ: এবং মা বিবি হাওয়া আ: দুনিয়ায় এসে দু’টি ভিন্ন জায়গায় নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরা প্রায় দীর্ঘ দিন আল্লাহ তায়ালার কাছে কান্নাকাটি করেছিলেন তাঁদেরকে একত্র করার জন্য। কান্নাকাটির শেষ প্রান্তে এসে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করেছিলেন; অর্থাৎ মহান আল্লাহ তায়ালা অবশেষে তাঁদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সর্বোপরি তাঁদেরকে আরাফাতের ময়দানে মিলিত করেছেন। হজরত আদম আ:কে পৃথিবীতে ফেরত পাঠানোর পর আল্লাহ তায়ালা একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কোন ভাষায় দোয়া করতেন, আমি তার দীর্ঘ বর্ণনা এই কলামে দিচ্ছি না। তবে যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আদম আ:-এর কাছে, তা হচ্ছে- ‘রব্বানা জলামনা আনফুছানা ওয়া-ইললাম তাগফিরলানা ওতারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাছিরিন।’ যার মর্মার্থ দাঁড়ায়- ‘হে আমাদের প্রতিপালক (প্রভু), আমরা নিজেরাই নিজেদের নফসের ওপর জুলুম করেছি, অত্যাচার করেছি, এখন আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন, আর আমাদের প্রতি রহমত না করেন, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যাবো।’ এটি কুরআন মজিদের সপ্তম সূরা আল-আরাফের ২৩ নাম্বার আয়াত।

সেই থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসীগণ এই আয়াত পড়ে তাদের প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম সম্প্রদায় এই আয়াত পড়ে দোয়া করেন, কিন্তু কোটি কোটির মধ্যে সম্ভবত অধিক সংখ্যকই মর্মার্থটি সম্পর্কে অবহিত নন। এই সন্দেহ পোষণ করার জন্য কোনো পাঠক যেন মনঃক্ষুণ্ন না হন, তার জন্য অনুরোধ করছি। এটি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত আর পবিত্র কুরআন হলো আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য উপহার। এটা মানবজাতির হেদায়াতের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি কিতাব। আর এই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছিল রমজান মাসে। তাই আমি বলেছি, পবিত্র রমজান মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি উপহার।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মহান আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে বিশ্বমুসলিমকে আদেশ করেছেন রোজা পালনের জন্য এবং তার বিনিময়ে তিনি কী পুরস্কার দেবেন, সেটি কোথাও বর্ণিত হয়নি। তিনি কেবল বলেছেন, রোজা রাখা হয় আমার জন্য আর এর বিনিময়-উপহার আমি আমার নিজ হাতে বণ্টন করব। তবে এটা একটা পদ্ধতি; রমজানের উছিলায় প্রত্যেক আন্তরিক রোজা পালনকারী কোনো-না-কোনো পুরস্কার পাবেন, এ গ্যারান্টিটুকু আন্তরিক রোজা পালনকারী পেলেন সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে। তাই আমি এটিকে বলছি একটি উপহার।

তৃতীয় ও সর্বশেষ কারণ আমি মনে করি রমজান মানবজাতির জন্য অতি পবিত্র, সেটি হলো রমজানুল মোবারকের কারণে মুসলমানদের মধ্যে যারা আন্তরিকভাবে রোজা রাখেন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখেন তাদের মধ্যে একে অপরের সাথে বাধ্যতামূলক প্রতি রাতে তারাবির নামাজ পড়ার সময় সাক্ষাৎ হয়। বাধ্যতামূলকভাবে সাক্ষাৎ হয় যদি কেউ রাত জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ জামাতে পড়তে যায় এবং জুমার নামাজগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ে, এমনকি ইফতার খাওয়ার সময়। সবিশেষ দেখা মেলে সমবেতভাবে ঈদের নামাজ শেষে খুশির ময়দানে। আর এ জন্যই রমজান একটি বিশেষ উপহার।

দ্বিতীয় যে শব্দটি আমি ব্যবহার করেছি রমজান একটি ব্যবস্থাপত্র, সেটি বলার কারণ হলো, তার আগে ছোট একটি প্রাসঙ্গিক কথা বলে নিই। যেহেতু ওপরের অনুচ্ছেদে লিখলাম বাধ্যতামূলকভাবে সাক্ষাৎ হবে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে গেলে। বিষয়টি শুনে পাঠকগণ হয়তো অবাক হতে পারেন, তাই তাদের উদ্দেশে বলছি, আমাদের সাধারণ ধারণায় তাহাজ্জুদ নামাজ একান্তই রাত্রিকালীন গোপনীয় ইবাদত, যা ব্যক্তি এবং তার প্রভুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। যদিও তাহাজ্জুদ নামাজ জামাতে পড়ার বিষয়টি আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয়, কিন্তু পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীতে তাহাজ্জুদের নামাজ রমজান মাসে জামাতে আদায় করা হয়। সেখানে যে পরিভাষায় তাকে পরিচিতি দেয়া হয়েছে, সেটি হচ্ছে ‘কিয়ামুল লাইল’। অর্থাৎ রাত্রিকালীন দণ্ডায়মান থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার মাধ্যম বা প্রচেষ্টা। সেই পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীতে যথাক্রমে কাবা শরিফ এবং মসজিদে নববীতে তাহাজ্জুদের নামাজ জামাতে আদায় করা হয় এবং ধারাবাহিক তাহাজ্জুদের নামাজে পবিত্র কুরআন শরিফ খতম করা হয়। সেখানে অতি সুন্দর কণ্ঠে সুন্দর মনোরম হৃদয়গ্রাহী পরিবেশে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা হয়। এই নামাজ সুনির্দিষ্ট সময়ে জামাতের সাথে আদায় করার ফলে যে ঘটনাটির সৃষ্টি হয়, তা হচ্ছে কোনো একজন আগ্রহী মুসলমান রোজার মাসে প্রায় সারা রাত জেগে থাকেন।

কিভাবে প্রায় সারা রাত জেগে থাকেন, তার ব্যাখ্যায় বলতে হচ্ছে- সারা দিন রোজা শেষে ইফতার করার পর তিনি আর বিশ্রাম নিতে বিছানায় যান না। সাধারণ কথাবার্তায় ব্যস্ত থাকেন বা অন্য কোনো ইবাদত করেন কিংবা অন্য কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন অথবা রাত্রিকালীন খাবার খান। অতঃপর তিনি এশা ও তারাবির নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে যান। এশা ও তারাবির নামাজ শেষে দুই-আড়াই ঘণ্টা বাকি থাকে, সে সময় তিনি যদি আগে খেয়ে না থাকেন তবে খেতে বসেন বা কোনো ইবাদত করেন কিংবা সাংসারিক কোনো কাজ করেন। তারপর মধ্যরাতে তিনি মসজিদে চলে যান তাহাজ্জুদের নামাজ (কিয়ামুল লাইল) আদায় করতে। সেই তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে ফিরে আসার পর সেহরির সময় শেষ হতে অল্প সময় বাকি থাকে। অতঃপর সেহরি খাওয়ার সময় হয়ে গেলে তিনি সেহরি খেতে বসেন। সেহরি খাওয়ার কিছু সময় পরে ফজরের নামাজের আজান দেয়া হয়। তাহলে আমরা দেখছি, সূর্যাস্ত থেকে যে রমজানের রাত শুরু হয়েছিল, ফজরের নামাজের আজানের সাথে সাথে সেই রজনী ওই আগ্রহী ব্যক্তির জন্য শেষ হচ্ছে। তার আগে তিনি তার বিছানায় পিঠ লাগাননি। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্তম ইবাদত বলে জ্ঞানী-মনীষীগণ বলেছেন।

বাংলাদেশের বেশ কিছু জায়গাতেই তাহাজ্জুদের নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য বন্দোবস্ত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে আমি একটি মসজিদের কথা বলছি, যাদের দ্বারা সম্ভব সেসব নামাজিকে দাওয়াত দিচ্ছি সেখানে এসে পবিত্র রমজান মাসের তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার জন্য। স্থানটি হচ্ছে ঢাকা মহানগরীর গুলশান এক নাম্বার থেকে পশ্চিম দিকে মহাখালীতে অবস্থিত অতি বড় সুন্দর মনোরম পরিবেশে লাল রঙের মসজিদ, নাম- গাউছুল আজম মসজিদ। সেখানে রাত সোয়া ১২টায় তাহাজ্জুদ নামাজের জামাত শুরু হয় এবং আড়াইটা থেকে রাত ৩টার মধ্যে কোনো একসময় জামাত শেষ হয়। অভিজ্ঞ হাফেজগণের তেলাওয়াতের মাধ্যমে তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমেই কুরআন খতম করা হয়। অসংখ্য লোক সেই জামাতে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা মহানগরে আরো বেশ কিছু মসজিদে এবং চট্টগ্রাম মহানগরে কয়েকটি মসজিদে এই অভ্যাস সীমিতভাবে চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ রমজান মাসের প্রত্যেক রাতে না করে, শেষের ৯ বা ১০ দিনের জন্য কিয়ামুল লাইলের অভ্যাসটিকে নিবন্ধিত করা হয়েছে।

শাবান মাস এলে সাহাবিরা দোয়া করতেন, যেন রমজান পর্যন্ত তারা পৌঁছতে পারেন এবং অফুরন্ত সওয়াব পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন। একসময় মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে রাসূল সা: তিনবার ‘আমিন’ বলেছিলেন। এর মধ্যে একবার বলেছিলেন এ কারণে যে, যার সামনে রমজান মাস এলো অথচ সে তার গুনাহ ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না, সে ধ্বংস হোক। রাহমাতাল্লিল আলামিন বা সারা বিশ্বজাহানের রহমতের প্রতীক মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর এই বদ দোয়ার আওতায় আমরা যেন না পড়ি, সাহাবিদের সেই দোয়ার গুরুত্ব যেন আমরা অনুধাবন করি এবং সে অনুযায়ী আমল করি- এই প্রার্থনা করছি। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.