মচকে গেলে

ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল


আমাদের শরীরে অনেক জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি রয়েছে। প্রতিটি জয়েন্টের চার পাশে থাকে একাধিক সংখ্যক লিগামেন্ট। এই লিগামেন্টের কাজ হচ্ছে জয়েন্টের হাড়গুলো যথাস্থানে রাখা ও নড়াচড়ায় সাহায্য করা। একটি নির্দিষ্ট কোণ পর্যন্ত সহজে নড়াচড়া করা যায়। তবে এর বেশি করতে গেলে ব্যথা লাগে। কোনো কারণে সীমার বাইরে নড়াচড়া হলে কিংবা জয়েন্টের লিগামেন্টগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হলে লিগামেন্টে টান পড়ে বা কিছু অংশ ছিঁড়ে যায়। একেই মচকে যাওয়া বলে।
উপসর্গ
জয়েন্টের চার পাশের লিগামেন্ট ও টিস্যুতে টান পড়লে কিংবা ছিঁড়ে গিয়ে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দেয় :
ষ জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হওয়া।
ষ আক্রান্ত জয়েন্ট নাড়াতে গেলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া।
ষ জয়েন্টের চার পাশে ফুলে যাওয়া।
ষ সচরাচর গোড়ালি বেশি আক্রান্ত হয়।
কী করবেন
ষ আঘাতপ্রাপ্ত জয়েন্টকে বিশ্রামে রাখুন এবং সাপোর্ট দিন।
ষ জয়েন্টটিকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে রাখুন অথবা জায়গাটিতে ঠাণ্ডা সেঁক দিন।
ষ জয়েন্টের চার পাশে ভেজা গজ বা ভেজা তুলা রাখুন এবং সেটিকে ব্যান্ডেজ দিয়ে সামান্য শক্ত করে বাঁধুন।
ফলোআপ
ষ তিন দিন পর ব্যান্ডেজ খুলে ফেলুন।
ষ জয়েন্ট গরম পানিতে ভেজান।
ষ গরম ব্যান্ডেজ বাঁধুন।
ষ পূর্ণ বিশ্রাম নিন।
দুই দিন পর
ষ ব্যান্ডেজ ও ড্রেসিং খুলে ফেলুন।
ষ যদি কালশিরা মিলিয়ে যেতে শুরু করে, জয়েন্ট নড়াচাড়া করা শুরু করুন।
হাঁটু মচকে গেলে
হাঁটু এমন একটি জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ জোড়া যা বসতে, দাঁড়াতে, হাঁটতে, দৌড়াতে, উপরে উঠতে এবং নামতে একান্ত প্রয়োজন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজ করতে গিয়েই হাঁটু মচকায়। শরীরের ওজন বহনকারী জোড়াগুলোর মধ্যে হাঁটু অন্যতম। এটি তিনটা হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। হাঁটুতে চারটি প্রধান লিগামেন্ট ও দু’টি মেনিসকাস থাকে।
লিগামেন্ট হলো ইলাসটিক টিস্যু, যা এক হাড়কে অন্য হাড়ের সাথে যুক্ত করে, জয়েন্টে শক্তি প্রদান করে, হাড়ের নড়াচড়ায় অংশগ্রহণ করে এবং জয়েন্টের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।
আর মেনিসকাস শরীরের ওজন সমভাবে উরুর হাড় থেকে পায়ের হাড়ে সরবরাহ করে, হাড়ের প্রয়োজনীয় নড়াচড়ায় সহায়তা করে এবং জয়েন্টের দৃঢ় অবস্থা বজায় রাখে।
হাঁটু মোচড় চেপে মচকে গেলে হাঁটুর লিগামেন্ট ও মেনিসকাস ইনজুরি হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে লিগামেন্ট বিস্তৃত হতে পারে কিংবা আংশিক বা সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যেতে পারে। মেনিসকাসের বিভিন্ন ইনজুরি হয়। মেনিসকাস আংশিক বা সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যেতে পারে। ৭০ শতাংশ মোচড়ের আঘাতে এনটেরিওর ক্রুসিয়েট লিগামেন্টের সাথে মেনিসকাস ইনজুরি থাকে।
কারণ
ষ হঠাৎ হাঁটু মোচড় খেলে।
ষ রিকশা থেকে পড়ে গেলে।
ষ গাড়ি বা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
ষ খেলাধুলা করার সময় যেমনÑ ফুটবল, বাস্কেটবল, হকি, কাবাডি খেলা।
ষ মই থেকে পড়ে গেলে।
ষ উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়লে।
ষ গর্তে পড়ে গেলে।
ষ সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় এক ধাপ ভুল করলে।
ষ হাঁটুর বাইরের দিকে সরাসরি আঘাত।
উপসর্গ
ষ প্রথমে তীব্র ব্যথা হওয়া, পরে আস্তে আস্তে ব্যথা কমে যাওয়া।
ষ ব্যথা হাঁটুর বাইরের পাশে এবং পেছনে অনুভূত হবে।
ষ হাঁটু ভাঁজ বা সোজা করতে গেলে ব্যথা বেড়ে যায়।
ষ আঘাত পাওয়ার প্রথম দশ মিনিটের মধ্যেই হাঁটু ফুলে যাওয়া।
ষ ফোলা ও ব্যথার জন্য হাঁটু নাড়াতে না পারা।
ষ দাঁড়াতে বা হাঁটতে চেষ্টা করলে হাঁটু বেঁকে যাচ্ছে মনে হওয়া।
ষ হাঁটু অস্থিতিশীল বা ঘুরে যাচ্ছে মনে হওয়া।
কী করবেন
ষ হাঁটুকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে।
ষ জায়গাটিতে ঠাণ্ডা সেঁক দেবেন।
একটি কাপড়ে বরফের টুকরা নিয়ে অথবা একটি প্লাস্টিকের ব্যাগে ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি নিয়ে ব্যথা ও ফোলার জায়গায় চেপে রাখুন, এতে ব্যথা ও ফোলা কমে যাবে।
প্রতি ঘণ্টায় ১০ মিনিট বা দুই ঘণ্টা পরপর ২০ মিনিট অনবরত লাগাবেন। তবে ঠাণ্ডা অবশ্যই সহ্যের মধ্যে রাখতে হবে। এই পদ্বতি আঘাতের ৪৮-৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত চলবে।
ষ হাঁটুতে ইলাসটো বা স্পিøন্ট ব্যবহার করলে ব্যথা ও ফোলা কমে যাবে।
ষ হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে হাঁটুকে হৃৎপিণ্ডের সমরেখা থেকে উঁচুতে রাখবেন। এতে ফোলা কমবে।
ষ রোগীকে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে।
ষ অতঃপর রোগীকে অর্থোপেডিক সার্জনের কাছে পাঠাবেন, যিনি হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরির চিকিৎসা প্রদান করতে সক্ষম।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা।
ফোন : ০১৬৭৩৪৪৯০৮৩ (রোমান)

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.